গার্মেন্টস শ্রমিকরা কী ‘দাগী অপরাধী’! কিন্তু কেন?


গার্মেন্টস শ্রমিকরা কী ‘দাগী অপরাধী’! কিন্তু কেন?


মঞ্জুরুল হক।। ৫৯টি গার্মেন্ট কারখানা ৫ দিন বন্ধ রাখার পর আজ ২৭ তারিখ খুলে দেয়া হয়েছে। সকাল থেকেই টিভি চ্যানেলগুলো ঈদের মত উৎসবমুখর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই খবর পরিবেশন করছে! যার শিরোনাম-‘আবারও কর্মচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে সাভার উপজেলার আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল। পোশাক কারখানাগুলোতে আবার কাজ শুরু হওয়ায় মন্ত্রিসভা সন্তোষ প্রকাশ করেছে।‘

“ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো, নানা অজুহাতে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, নিয়ম অনুযায়ী ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের প্রাপ্য পরিশোধ ও ছুটিকালীন বেতন বহাল রাখাসহ ১৫ দফা দাবিতে ১১ ডিসেম্বর থেকে আশুলিয়ার কিছু পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করেন। এ কর্মসূচির একপর্যায়ে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করলে আরো বিরূপ পরিস্থিতির আশঙ্কায় ২০ ডিসেম্বর ৫৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারা প্রয়োগ করে মালিকপক্ষ। টানা পাঁচদিন বন্ধ থাকার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত রোববার বন্ধ কারখানা খুলে দেয়ার ঘোষণা দেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)। এ ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল এসব কারখানা খুলে দেয়া হয়।“

২।

চটজলদি খবর হলো সরকার তার গোয়েন্দা দিয়ে আবিষ্কার করেছেন ১৭৪ জন ব্যক্তি গার্মেন্ট শিল্পকে অস্থির করার নেপথ্যে। সেই ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে, বাকিরা গ্রেপ্তারের অপেক্ষায়। এই ১৭৪ জনের মধ্যে আছে শ্রমিক নেতা-নেত্রী, বামপন্থী নেতা-কর্মী, বিএনপির নেতা এবং গণমাধ্যম কর্মী! সরকার এদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে। ইতিমধ্যে ৩শ’ জনের বেশি শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও কয়েক হাজার শ্রমিকের নামে মামলা দেয়া হয়েছে। কারখানা খোলার সঙ্গে সঙ্গে দেড় হাজার শ্রমকিকে ছাটাই করা হয়েছে। আরও কয়েক হাজার ছাটাই করা হবে। গোটা আশুলিয়া অঞ্চলে শিল্প পুলিশ, র‌্যাব, সাধারণ পুলিশ, বিজিবি, এসবি, ডিবি মোতায়েন রয়েছে, এবং পুলিশের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন-‘পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আমাদের নিয়ন্ত্রণে’। ‘আমাদের নিয়ন্ত্রণে’ মানে কি? এখানে কি শ্রমিকদের সঙ্গে সরকার আর মালিকপক্ষের যুদ্ধ চলছে? এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায় প্রশাসন শ্রমিকদের কোন দৃষ্টিতে দেখে!

এই পুরো দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে কোনো দেশের সরকার পতনের লক্ষ্যে ক্যু হয়েছিল, এবং সেই ক্যু ব্যর্থ হওয়ার পর রাষ্ট্র ক্যুদেতাকারীদের বিরুদ্ধে সরকার ‘প্রতিশোধমূলক’ ব্যবস্থা নিচ্ছে!
আরও মনে হতে পারে সরকারের বিরোধীতা করার জন্য বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি-জামাতের মত আরেকটি ‘দল’-গার্মেন্ট শ্রমিক! তাদের ‘সরকারবিরোধী আন্দোলন’ ব্যর্থ হওয়ার পর ‘রেগুলেশন মেজার’ হিসেবে সরকার ‘ব্যবস্থা’ নিচ্ছে।

৩।

যার যার আমলনামা তার তার কপালে লেখা না থাকলেও গার্মেন্ট মালিক, মিডিয়া মালিক, সরকার এবং দোহার গাওয়া গায়েনদের আমলনামা দেখেই বোঝা যায় কার কি অভিসন্ধী! এরা সকাল থেকেই ফলাও করে শ্রমিকদের কর্মমুখরতার চিত্র দেখিয়ে যাচ্ছে। কোথাও শ্রমিকদেরকে দিয়ে বলানো হচ্ছে-“আমরা কাজ করতে চাই, কাজ না করলে খামু কি? আমরা আন্দোলন চাই না, আমরা কারখানা ধ্বংস চাই না, কারখানা খুলে দেয়ায় আমরা খুব খুশি….” এই শিখিয়ে দেয়া কথাগুলো না বলালেও চ্যানেলগুলো চলত, পত্রিকাগুলো বিক্রি হতো। তার পরও এরা ওই মিথ্যে বয়ান প্রচার করছে নিজ নিজ শ্রেণি স্বার্থেই, কেননা প্রায় প্রতিটি শিল্প গোষ্ঠিরই টিভি চ্যানেল, পত্রিকা এবং গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আছে।

৪।

“ওনার্স গ্রুপের মালিক এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, শ্রমিকদের কর্মবিরতি কর্মসূচির ওপর প্রথম থেকেই নজর রাখছিলেন ক্রেতারা। কর্মসূচির তৃতীয় দিন থেকে রফতানি আদেশে চুক্তিবদ্ধ দর কমাতে শুরু করেন তারা। কর্মসূচির প্রথম দিনে ১০ সেন্ট, দ্বিতীয় দিন ২০ সেন্ট- এভাবে ধাপে ধাপে পোশাকের ইউনিটপ্রতি দর কমিয়েছেন অনেক ক্রেতা। একপর্যায়ে রফতানি আদেশই বাতিল করেছেন কিছু ক্রেতা। তিনি বলেন, সময় বাড়িয়ে পণ্য পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছেন যেসব উদ্যোক্তা, তাদের এখন সমুদ্রপথের পরিবর্তে লাখ লাখ ডলার ব্যয়ে আকাশপথে ক্রেতাদের শোরুমে পণ্য পৌঁছাতে হবে।

আকাশপথে পাঠাতে হলে বিমান ভাড়াসহ বিদেশে ক্রেতার ওয়্যারহাউসে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত সব দায়িত্ব এবং ব্যয় কারখানা মালিকদের বহন করতে হয়। ফলে মুনাফা দূরে থাক, আর্থিক ক্ষতি মেনে নিয়েই ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হয়।”

এটা মালিকদের বক্তব্য। এই বক্তব্য খন্ডন করতে খুব বেশি শব্দ খচ্চা করতে হয় না। “আপনাদের একটি কারখানা দিয়ে তিন-চারটি কারখানা বানানোতে সমস্যা হয়না, কারখানার প্রায় ৯৫ ভাগ খরচ সরকারের কাছ থেকে নিয়ে সেই টাকা থেকে একটা মোটা অংকের টাকা অন্য খাতে সরিয়ে দিতেও সমস্যা হয়না, কারখানা থেকে আসা আয় দিয়ে আমেরিকা-কানাডা-লন্ডনের অভিজাত এলাকায় কটেজ কিনতে সমস্যা হয়না, বিশ্বের নামকরা অগ্নিমূল্য বিলাসবহুল গাড়ি কিনতে সমস্যা হয়না, বউ-ছেলে-মেয়ে-আত্মিয়-স্বজন মিলে বাদশাহী চালে বসবাসে সমস্যা হয়না, সরকারের পাওনা বিভিন্ন শুল্ক করাদি মেরে দিতেও বিবেকে বাধে না, বিভিন্ন পাওনাদারের টাকা মেরে দিতেও সামান্যতম কুন্ঠা হয়না…. শুধু মাত্র শ্রমিকদের নায্য মজুরি দিতে গেলেই দেশ-জাতি রসাতলে যায়! সারা দেশে হাহাকার পড়ে যায়! দেশের সকল সম্পদ এবং টাকশাল খালি হয়ে যায়!

৫।

তিন বছর আগে মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা করা হয়। বর্তমান বাজারে এই মজুরিতে বাসাভাড়া দেওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনা, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা কিংবা যাতায়াত কোনো কিছুর জন্যই উপযোগী নয়, এটা বাস্তবতা, অথচ মালিক পক্ষ এবং সরকার মনে করেন এই টাকাতেই তাদের সংসার গড়গড়িয়ে চলে যায়! শ্রম আইনানুযায়ী তিন বছরের মধ্যে মজুরি মূল্যায়ন করা এবং ১৪০-এর ‘ক‘ ধারা মতে সরকার যেকোনো অবস্থায় নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করতে পারে, অথচ তা করা হয়নি।
দেশের প্রায় ২৩ লাখ সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সরকারের সকলেরই বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যাদের অফুরন্ত আয় তাদেরও বেতন দ্বিগুণ হয়েছে।

মালিকপক্ষ ও শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ২০১৩ সালে সরকারের গঠিত মজুরি বোর্ড পোশাক কারখানার শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে। কিন্তু এরপর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ায় বাজারদর ও জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে জানিয়ে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ১৬ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন সংগঠন। অবশ্য ওই দাবি নাকচ করে বিজিএমইএ বলেছে, বর্তমান মজুরি কাঠামোর অধীনে প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দিয়ে যাচ্ছেন মালিকরা। অভ্যন্তরীণ ও চলমান বিশ্ব বাণিজ্য পরিস্থিতিতে ‘পোশাক শিল্পের অবস্থা ভালো নয়’ দাবি করে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, এই মুহূর্তে মজুরি বাড়ানো সম্ভব নয়।

মালিকদের সঙ্গে সুরে সুর মিলিয়ে শ্রমমন্ত্রি বলেছেন-‘আগামী দুবছরের মধ্যে মজুরি বাড়ানোর সম্ভবনা নেই’!

মালিকদের নানা অজুহাতে মজুরি নরা বাড়ানোর ইতিহাস যেমন পুরোনো তেমনি একের পর এক নতুন নতুন অজুহাত সৃষ্টি করে মজুরি কম দিয়ে নিজেদের লাভের অংক বাড়িয়ে নেয়া এবং সরকারকে কখনো চাপে ফেলে কখনো ব্ল্যাকমেইল করে কখনোবা অনুরোধ করে বিভিন্ন রকম ইনসেন্টিভ বাগিয়ে নেয়ার ইতিহাসও পুরোনো। এটা গেল মালিক প্রসঙ্গ, যারা সরাসরি ইনভেস্টমেন্ট এবং প্রফিটের সঙ্গে জড়িত, কিন্তু সরকার? সরকার তো ইনভেস্ট করেনি, এবং তার প্রফিটেরও প্রশ্ন ওঠে না, এবং সরকার ব্যবসা করে না! তাহলে সরকার কেন মালিক পক্ষের সুরে কথা বলবে? সরকার কেন নিপীড়িত শ্রমকিদের বিপক্ষে যাবে? সরকার কেন মালিকদের হয়ে শ্রমিক শোষণ করবে? সরকার কেন তার বৃহত্তর নাগরিকের ভালো-মন্দ দেখবে না? সরকার কেন তার জাতীয় আয়ের অন্যতম কারিগরদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করবে? কেন সরকার শ্রমিকদের প্রতিপক্ষ ভাববে? আর যদি তা না-ই হবে তাহলে সরকারের কাছে শ্রমিকদের অবলম্বন নেই কেন? কেন মালিক, সরকার, সরকারের বিভিন্ন বাহিনী, সুশীল সমাজ, ধনিক শ্রেণি, ধামাধরা শ্রেণি, তল্পিবাহক শ্রেণি এবং মধ্যপন্থী লেজুররা একাট্টা হয়ে শ্রমিকদের বিপক্ষে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ করেছে? শ্রমিকরা কি সরকার পতনের আন্দোলন করছিল?

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো এই সকল স্টেকহোল্ডার এবং নন স্টেকহোল্ডার সকলেই যখন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন তখন এদের সবার বক্তব্যেই যে সুর ফুটে ওঠে তা নির্মম প্রতিশোধমূলক এবং প্রতিহিংসামূলক! কিন্তু কেন?

২৭ ডিসেম্বর, ২০১৬



>