মঠবাড়িয়ার ভীমনলীর সম্মূখ যুদ্ধ উপেক্ষিত এক মুক্তি সংগ্রাম


মঠবাড়িয়ার ভীমনলীর সম্মূখ যুদ্ধ  উপেক্ষিত এক মুক্তি সংগ্রাম


দেবদাস মজুমদার :

স্বাধীনতা বিরোধিরা সশস্ত্র। ওরা সংখ্যায় অর্ধ সহস্রাধিক। আর মুক্তিকামী দুই শতাধিক সংগ্রামী। তাঁরা নিরস্ত্র হিন্দু বাঙালী। ওদের অস্ত্র কেবল লেজা,সড়কি,বল্লম আর শক্রর আঘাত ঠেকানোর ঢাল। এ দিয়েই স্বাধীনতা বিরোধিদের সশস্ত্র আক্রমন প্রতিহত করেছিল ওরা। এ যুদ্ধ একজন রাজাকার নিহত হলেও ওই যুদ্ধে ১৫জন বীর বাঙালী শহীদ হলেন। রাজাকার বাহিনী হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামটির ঘর বাড়ি পালাক্রমে লুটপাট আর আাগুন দিয়ে পুড়িয়ে গৃহহীন করল ৮০ টি পরিবারকে। স্বাধীনতা বিরোধি সংগঠিত রাজাকার বাহিনীকে প্রতিরোধে মুক্তিকামী বাঙালীর প্রতিরোধের এমন একটি গৌরবোজ্জল লড়াই ইতিহাসে আজও তার স্বীকৃতি মেলেনি। মুক্তিসংগ্রামের ৪১ বছর পরেও ওই সকল বীর শহীদ পরিবার গুলোকে রাষ্ট্র যেমন স্বীকৃতি দেয়নি। তেমনি এ মুক্তিসংগ্রামের বীরত্ব গাঁথাও ইতিহাসে এক অজানা অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ,মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দান আর নিরাশ্রয় বাঙালীদের আশ্রয়দানের অপরাধে রাজাকারদের হামলা প্রতিহত করতে সেদিন মুক্তিকামী বাঙালী সম্মূখ লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার সাপলেজা ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত ভীমনলী গ্রামের এক নিভৃত জনপদের মুক্তিকামী এ বাঙালীর বীরত্বের ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় ধরে যেন এক জনশ্রুতি হিসেবেই টিকে আছে। তাই অযতেœ অবহেলায় পড়ে আছে ১৫ শহীদের গণ সমাধিস্থল। রাষ্ট্র কিংবা সমাজ কেউ তাঁদের কখনও খোঁজ নেয়নি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়ও এসকল বীরের নামও লিপিবদ্ধ হয়নি।
মঠবাড়িয়ার সাপলেজা ইউনিয়নের নলীভীম গ্রামটি হিন্দু অুধ্যষিত এক জনপদ। ওই গ্রামের নলী খালের পাড়ে ওয়াপদা বেড়ি বাঁধ লাগোয়া ৮০টি হিন্দু পরিবরের বসবাস। গ্রামের সম্ভ্রান্ত বাড়ই বংশের পরিবারগুলো ছিল এলাকার ধনাঢ্য। মঠবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দুরের ওই গ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল বিপর্যস্ত। মুক্তিযুদ্ধ সমকালীন সময়ে আশ্রয়ের জন্য একটি নিভৃত জনপদ ছিল এ ভীমনলী গ্রাম। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের সেখানে যাতায়াত গড়ে ওঠে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন গ্রাম থেকে বিতাড়িত হিন্দু বাঙালীরাও সেখানে প্রাণ ভয়ে আশ্রয় নেয়। এ কারনে স্থানীয় স্বাধীনতা বিরোধি রাজাকারদে কাছে গ্রামটি টার্গেটে পরিনত হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সত্তোরোর্ধ এক মুক্তিযোদ্ধা জানান, ১৯৭১ সালে সাবেক জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের নেতৃত্বে গড়ে উপকুলীয় মঠবাড়িয়া অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল বিশাল এক রাজাকার বাহিনী। সাপলেজা ইউনিয়নের ক্ষেতাছিড়ায় তার গ্রামের বাড়ি। তার নির্দেশে সাপলেজার তৎকালীন ইইপ চেয়ারম্যান নূর হোসে জমাদ্দার,শাহাদাৎ হোসেন,ইউপি সদস্য চাঁন মিয়া দর্জি,রুহুল আমীন মৃধা,আজিজ মল্লিক,আব্দুল হক,ইউপি সদস্য কাঞ্চন আলী,লালু খাঁ ও খলিল মাওলানা ওরফে হরিণ মাওলানা মিলে সংগঠিত অর্ধ সহস্রাাধিক রাজাকার সদস্য এলাকায় আলবদর ও রাজাকার বাহিনী গড়ে তোলে। এলাকায় হিন্দুদের ঘর বাড়ি লুটতরাজ,গণ হত্যা ও নারী নির্যাতন চালায়।
এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের যাতায়াত ও হিন্দুদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ভীমনলী গ্রামের বাড়ই বাড়ি রাজাকারদের বিশেষ টার্গেটে পরিনত হয়। রাজাকারকারা পরিকল্পিতভাবে ১৯৭১ সালের মে মাসে বাড়ই বাড়িতে আক্রমন চালায়। মুক্তিযোদ্ধারও সেদিন রাজাকারদের পাল্টা আক্রমন করে তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে। সেদিনের সেই সম্মূখ যুদ্ধে রাজাকার লালু খাঁ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হন। আর রাজাকারদের গুলিতে শহীদ হন ১৫ জন মুক্তিকামী বীর বাঙালী।
ওই যুদ্ধে সেদিন দুই হাটু আর কোমড়ে গুলি বিদ্ধ হয়ে সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন সাপলেজা মডেল হাইস্কুলের শিক্ষক রমেশ চন্দ্র মিস্ত্রী(৫৮)। তবে তাঁর বড় ভাই গণেশ চন্দ্র মিস্ত্রী সেদিনের সেই যুদ্ধে শহীদ হন।
স্বজন হারানো দুঃখ আর ক্ষোভ নিয়ে শহীদ পরিবারের সদস্যরা জানান,সেদিনের সেই সম্মূখ যুদ্ধ ছিল সশস্ত্র রাজাকারদের সাথে স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র বাঙালীর। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়,মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ আর আশ্রয়হীন বাঙালীকে আশ্রয় দেওয়াই ছিল আমাদের অপরাধ। আমাদের দুর্ভাগ্য এই বীরত্বগাঁথা আর ১৫ বাঙালীর এ জীবন দান আজও স্বীকৃতি পেলনা।
যুদ্ধের সেই মূহুর্ত ঃ
১৯৭১ সাল। ২২ মে। বাংলা ৭ জ্যৈষ্ঠ। রবিবার। সকাল দশটা কি সাড়ে দশটা । সূর্যের তেজ বাড়ছে। ভীমনলী নিভৃত গ্রামে। যেন শুন শান নিরাবতা। মাঠে ঘাটে মানুষের কোন চলাচল নেই। তবে সকল নিরাবতা ছাপিয়ে হঠাৎ ঠা ঠা গুলির আওয়াজ থেমে থেমে ভেসে আসছে । গ্রামের হিন্দু পাড়ার মানুষ আতংকে সতর্ক হতে থাকে। সকলে গ্রামের সম্ভ্রান্ত বাড়ই বাড়িতে এসে জড়ো হতে থাকেন। সংখ্যায় দুই শতাধিক মানুষ। আর বাড়ই বাড়ির পিছনের বাগানের ফাঁক ফোকর দিয়ে পশ্চিম দিকের মাঠে অর্ধ সহস্্রাধিক মানুষের জটলা। তারা একদল স্বাধীনতা বিরোধী। তাদের হাক ডাকের আওয়াজ ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে। বুঝতে একটুও সময় লাগেনা বাড়ই বাড়ির স্বাধীনতাকামী মানুষদের। লাঠি,ল্যাজা,বল্লম ও ঢাল নিয়ে তৈরী হয় দুই শতাধিক বাঙালী। নলী খালের খেয়াঘাটের পাশে বেড়িবাঁধে তাঁরা দৃঢ় অবস্থান নেয়। ততক্ষণে রাজাকারের দল দুইশত মিটারের মধ্যে এসে গেছে।
মুহুর্তেই শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধারা লেজা,সড়কি,বল্লম দিয়ে সশস্ত্র রাজাকারদের প্রতিহতের চেষ্টা করে। রাজাকাররা পাল্টা গুলি চালায়। দুই ঘন্টা ধরে চলে এই পাল্টা আক্রমনের যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনে লালু খাঁ নামে এক রাজাকার নিহত হয়। আর রাজাকারদের গুলিতে ভীমনলী গ্রামের মাঠে শহীদ হন ১৫জন বীর বাঙালী। টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে। তারপর রাজাকাররা ওই ১৫ শহীদের লাশ টেনে হিচড়ে নলী খালের চরে ফেলে দেয়। রক্তের লাল স্্েরাতধারা বেড়িবাঁধ উপচে পাশ্ববর্তী নলী খালের লোনা পানি রঞ্জিত করে।
তারপর রাজাকার বাহিনী ভীমনলী গ্রামের ৮০টি হিন্দু বাড়িতে পালাক্রমে তান্ডব চালায়। ব্যাপক লুটতরাজ চালিয়ে ওরা ঘর বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। রাজাকাররা চলে গেলে সূর্য ডুবে সন্ধ্যা নামতে থাকে ভীমনলী গ্রামে। তারপর স্বজন হারানো বেদনায় ভারাক্রান্ত সর্বস্বহারা মানুষগুলো সেই সন্ধ্যা হাতড়ে ১৫ শহীদের নিথর দেহ মাথায় তুলে আনে নলী খালের চর থেকে। খেয়াঘাটের পাশে বেড়িবাধের পশ্চিমপাড়ে গণসমাধিতে ঠাঁই হয় তাঁদের।
মুক্তিযুদ্ধের পরে সংঘঠিত সেই সকল রাজাকার বাহিনীর লোকজন সমাজ ও রাজনীতিতে পূনর্বাসিত হয়েছে। তবে রাষ্ট্র কিংবা সমাজ কেউ আর এই সংগ্রামের বীরত্বগাঁথা মনে রাখেনি। তাই অযতেœ পড়ে আছে গণ সমাধি। সেদিন যে বীর শহীদ হলেন তাঁদের আজও স্বীকৃতি মেলেনি। আর যাঁরা যুদ্ধে গিয়েছিলেন তাঁদের মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় নামও ওঠেনি।
সেদিন যাঁরা শহীদ হলেন….
জীতেন বাড়ই, সুরেন্দ্র নাথ বাড়ই আর উপেন্দ্র নাথ বাড়ই তিন আপন ভাই। নিশিকান্ত কান্ত বাড়ই ও তাঁর বড় ছেলে ধীরেন্দ্র নাথ বাড়ই। জগদীশ চন্দ্র বাড়ই,গণেশ চন্দ্র মিস্ত্রী,ভূপাল মিস্ত্রী,বলরাম মিস্ত্রী,ষষ্ঠী হাওলাদার,বসন্ত মিস্ত্রী,সখানাথ খরাতি,ঠাকুর চাঁদ মিস্ত্রী,নেপাল চন্দ্র মিস্ত্রী ও বিনোদ চন্দ্র বিশ্বাস।
স্বাধীনতার ৪০ বছরেও এই ১৫জন শহীদ তালিকায় অন্তভূক্ত হয়নি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই সংগ্রাম ও সংগ্রামী মানুষের অবদান আজও উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে সাপলেজা ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমা-ের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা বীরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন,মুক্তিযুদ্ধের সময় মঠবাড়িয়া অঞ্চলের যতগুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে তার মধ্যে ভীমনলী গ্রামের বাড়–ই বাড়ি যুদ্ধ অন্যতম। রাজাকারদের সাথে সম্মূখ ওই যুদ্ধে ১৫জন সেদিন শহীদ হন। তাঁদের শহীদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করতে বহুবার শহীদ পরিবারের পক্ষ হতে আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আজও এটি বাস্তবায়ন হয়নি।
মঠবাড়িয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমা-ার মো. বাচ্চু মিয়া আকন বলেন,মুক্তিযুদ্ধে উপকুলীয় মঠবাড়িয়ায় স্বাধীনতা বিরোধিদের সাথে যতগুলো সম্মূখ যুদ্ধ হয়েছে তার মধ্যে নলী গ্রামের বাড়ই বাড়ির সম্মূখ যুদ্ধ অন্যতম। ইতিহাসে এই বীরত্ব আজও অস্বীকৃত রয়ে গেছে। ফলে শহীদের স্বীকৃতি আজও হয়নি। শহীদ পরিবার ও সংগ্রামের ইতিহাস তাই উপেক্ষিত হয়ে আছে। সকল মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের পক্ষ হতে রাষ্ট্রের কাছে বাড়ই বাড়ির শহীদদের যথাযথ স্বীকৃতির দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি শহীদের ওই গণ সমাধিস্থলে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মণের দাবি করছি।

মামলা গায়েব আর বাদির জীবন বলিঃ
সম্মূখ যুদ্ধ,১৫জন শহীদ,লুটপাট আর অগ্নি সংযোগের পর গ্রাম ছেড়ে হিন্দু পরিবারের অনেকেই পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন সেদিন। দেশ স্বাধীনের পর বিপন্ন মানুষ আবার ফিরে আসেন বিধ্বস্ত ভিটায়। কিন্তু সেদিনের সেই নৃশংসতা কিছ্ইু তারা ভুলতে পারেনি। স্বাধীন দেশে বিচার দাবি করেন এই নির্মমমতার। সেদিনের সেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন যজ্ঞেশ্বর বাড়ই নামে একজন বাঙালী। সাহসী আর দেশ প্রেমিক এই মানুষটি এই নৃশংসতার বিচার দাবি করে সংশ্লিষ্ট রাজাকারদের বিরদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন। ১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার পিরোজপুর সাব ডিভিশন আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। ওই মামলায় স্থানীয় জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধকালীন স্থানীয় থানা শান্তি কমিটির নেতা আব্দুল জব্বার ইঞ্জিনিয়ার কে প্রধান আসামী করে ২৫৯ জন স্থানীয় রাজাকারকে আসামী করা হয়। মামলায় অভিযুক্ত এসব স্বাধীনতা বিরোধিরা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে পূণর্বাসিত হয়ে ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠায় মামলাটি আর আলোর মুখ দেখতে পারেনি। তাদের তৎপরতায় মামলাটি গায়েব হয়ে যায়। উপরন্তু ওই মামলা দায়েরের অপরাধে মামলার বাদি যজ্ঞেশ্বর বাড়ইকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যার শিকার হতে হয়।
অনুসন্ধানে জনাগেেেছ,ওই মামলাটি দায়েরের ছয় মাস পর ভরা পূর্ণিমার রাতে একদল দুর্বৃত্ত তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তারপর দুর্বৃত্তরা নলী গ্রামের স্কুলের পাশে খালের সাকোর কাছে যজ্ঞেশ্বর বাড়ইর লাশ ফেলে রেখে যায়। এছাড়া বাড়ই বাড়ির সম্মূখ যুদ্ধে অংশ নেওয়া একজন বিনোদ বিহারী বাড়ইকে মুক্যিুদ্ধের একবছর পরে একরাতে গলায় গামছা পেচিয়ে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে একদল দুর্বৃত্ত। মঠবাড়িয়া শহরের দক্ষিণ বন্দর সেতুর কাছে খালের চরে তার লাশ পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের পর এই দুই নৃশংস হত্যাকা-ের বিচার আজও হয়নি। প্রাণ ভয়ে সেদিন পরিবারের কেউ মামলাও করতে পারেনি।
এদিকে ৭২ সালে রাজাকারদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ওই মামলাটি বহু অনুসন্ধান চালিয়েও আদালত কিংবা স্থানীয় থানায় কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় এক মুক্তিযোদ্ধা ৩৯ বছর ধরে ওই মামলার একটি কপি সযতনে সংরক্ষণ করে চলেছেন। ২৫ পয়সা মূল্যমানের ৩৫টি স্ট্যাম্পে এ মামলাটি দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ১১টি স্ট্যাম্পে ইংরেজী টাইপ করা ও ২৪টি স্ট্যাম্পে বাংলায় হাতের লেখা। সেদিনের সম্মূখ যুদ্ধের বিশদ বর্ণনা দিয়ে সংগঠিত ২৫৯জন রাজাকারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই মুক্তিযোদ্ধা জানান,দায়ের করা মামলাটি গায়েব করা হয়। এমনকি মামলার বাদিকেও পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। ৩৯বছর ধরে মামলাটির কপি সংরক্ষিত আছে। যদি কোনদিন কাজে লাগে।
তিনি আরো বলেন,বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই মামলাটি পূরুজ্জীবিত করতে তিনি উদ্যোগ নিয়ে ছিলেন। কিন্তু যারা সেদিন এ নৃশংসতা ঘটিয়েছিলেন তারা আজ বিত্তশালী ও প্রভাবশালী। তাই নিরাপত্তাহীনতার কারনে এখন আর এসব নিয়ে ভাবতে পারছেন কেউ।
বিধবা সুরবালা আজও কাঁদেন……………..
পচানব্বই বছরের বিধবা সুরবালা বাড়ই্। বয়সের ভারে এখন চলা ফেরা করতে পারেন না। সেদিনের সেই যুদ্ধে স্বজন হারিয়ে বুকের পাঁজর ভেঙ্গেছিল এই বৃদ্ধার। স্বামী নিশিকান্ত বাড়ই আর বড় ছেলে ধীরেন বাড়ই ওই সম্মূখ যুদ্ধে রাজাকারদের গুলিতে শহীদ হন। সেই সঙ্গে ঘর গেরস্থালী পুড়ে যায় হায়েনার আগুনে। তবু দেশ ছেড়ে পালানি সুরবালা। স্বজন হারা এই বৃদ্ধা বিধ্বস্ত ভিটা আগলে বয়সের ভারে এখন শেষ বেলার জীবনে। সম্প্রতি এক সকালে বৃদ্ধার বাড়িতে গিয়ে দেখাগেছে একটি ভাঙ্গাচোরা চেয়ারে তিনি জবুথবু হয়ে বসে আছেন। ডান হাতে জপমালা টিপে আপন মনে সৃষ্টিকর্তাকে ডেকে চলেছেন এ ক্রান্তিকালের মানুষ। যেন মহা এক মৃত্যুর জন্য প্রার্থনারত এক অসহায় মানুষের মুখ। কিছু না বলেই ক্যামেরায় কয়েকটা ছবি ধারন করতেই বৃদ্ধা সুরবালার সরল প্রশ্ন- তুমি কেডা (কে)?
পরিচয় দেই, সেই যুদ্ধ দিনের বিবরণ জানতে চাই তাঁর কাছে। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। তখন আবছা দৃষ্টির কষ্টের দুই চোখে যেন নলী খালের নোনা জল গড়িয়ে পড়ে। ৪২ বছর ধরে বেদনা আর উপেক্ষার প্রহরে কাটছে জীবন। কান্নায় জড়িয়ে আসে কণ্ঠ। বোঝা যায়না, তবে অনুমান করি সে কণ্ঠে অন্তহীন কষ্টের ধ্বনী। অব্যক্ত সেই বেদনার কিছুই আর ব্যক্ত হয়না। কেবল এক হাহাকার শুনতে পাই……….এই জনমে,এই রহম অন্যায়ের কোন বিচার পাইলাম না…………। কেউ কোনদিন আমাগো খোঁজও নিলনা!
শেষকথা……….
পিরোজপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক ও লেখক হুমায়ূন রহমান এবছর আগস্ট মাসে উপকুলীয় পিরোজপুর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। ১৯৯৬ সাল থেকে মাঠ পর্যায়ে গবেষণালব্ধ ৪৪৮ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের ১৪৯ নম্বর পৃষ্ঠায় বাড়ই বাড়ি গণহত্যার বর্ণনা খ-িত আকারে তুলে ধরেছেন।
এ ব্যাপারে লেখক হুমায়ূন রহমান বলেন,মুক্তিযুদ্ধের সময় মঠবাড়িয়ার সাপলেজার নলী গ্রামের বাড়ই বাড়িতে যে যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছিল তার সঠিক ইতিহাস ও শহীদের স্বীকৃতি রাষ্ট্র আজও দিতে পারেনি। এমন দুর্ভাগ্য কিছুতেই মেনে নেওয়া যায়না। ১৫ শহীদের স্বীকৃতি আর তাঁদের গণ সমাধিস্থলে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।
সম্প্রতি এক দুপুরে মঠবাড়িয়া সদর হতে ১৮ কিলোমিটার দুরে সাপলেজা ইউনিয়নের ভীমনলী গ্রামের খেয়াঘাটের(বর্তমানে পাকা সেতু)পাশে শহীদ সমাধিতে গিয়ে দেখা গেছে,বেরিবাধের পশ্চিম পাশে এক চিলতে একটি মাটির উচু ভিত্তি। এবরো থেবরো মাটির ভিত্তি দেখে বোঝা যায় অনাদর আর উপক্ষোয় পড়ে আছে ১৫ বীর বাঙালীর গণসমাধি। সমাধির পাশে ছোট একটি আমগাছ। ওই আমগাছে ছেড়া খোড়া একটি তিনফুট সাইজের সাইনবোর্ড ঝুলে আছে। সাইনবোর্ডের মরিচায় ঢাকা পড়েছে লেখা হরফগুলো। লেখা হরফ গুলোর কয়েকটি কিছুটা বড় বলে পড়া যায়। এ শহীদ সমাধির পশ্চিম পাশে দুইটি বিপন্ন লাল জবা ফুলের গাছ। একটি গাছে একটা ফুল ফুটে আছে। তবে তা খুব বিবর্ণ লাল রঙের ফুল। যেমন বিবর্ণ ও বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে আছে ১৫ শহীদের এই গণ সমাধিস্থল।



>