বানভাসীদের দিন


বানভাসীদের দিন


সৌমিত্র শীল চন্দন, রাজবাড়ী ॥ গত তিন দিনে রাজবাড়ীতে পদ্মা নদীর পানি কমেছে। তবে দুর্ভোগ কমেনি মানুষের। বন্যার পানিতে বাড়ি ঘর ডুবে যাওয়ায় অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন পদ্মা তীরবর্তী বেরি বাঁধ, স্কুল ও মাদ্রাসায়। যাদের জীবনে নেই কোনো ঈদের আনন্দ। গবাদি পশু হাঁস মুরগী নিয়ে তারা আছে নিদারুন কষ্টে। সুপেয় পানির অভাব আর ল্যাট্রিনের কষ্ট তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে তাদের দুঃখ দুর্দশাময় জীবনযাপন। রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের চর বরাট ও গোয়ালন্দ উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়নের চরদেলন্দি গ্রামের বন্যা কবলিত শতাধিক পরিবার গবাদি পশু হাঁস মুরগী নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে অন্তারমোড় সংলগ্ন বেরি বাঁধের দুপাশে। দুই থেকে আড়াই গজ প্রশস্ত স্থানে টিন, পলিথিন, পাটখড়ির বেড়া দিয়ে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছে তারা। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে ঘরের মেঝে স্যাঁতসেতে হয়ে গেছে। ঘরে থাকার মত অবস্থাও নেই। তাই ঘরের বাইরে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছে সবাই। রাস্তার উপরেই বেঁধে রাখা হয়েছে গরু ছাগল। মানুষে গরুতে একসাথে বসবাস। কেউ কেউ রাস্তার একপাশে উনুন জ্বালিয়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। বৃষ্টি এলেই বন্ধ হয়ে যাবে রান্না। শুরু হবে দুর্ভোগ।
বেরিবাঁধে আশ্রয় নেয়া বিল্লাল মন্ডল জানান, তিনি পেশায় একজন কৃষক। বাড়িতে তার বুক সমান পানি। সেখানে আর থাকার মত অবস্থা নেই। গরু ছাগল রাখার জায়গাও নেই। তাই পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বেরি বাঁধের উপর। দিনে যেমন তেমন। রাতে ভয় আরও বাড়ে। কখন যেন ট্রলারে করে ডাকাতরা গরু ছাগল নিয়ে যায়। এখনও পর্যন্ত তারা কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাাননি বলে জানান।
আফু মন্ডল জানান, ঘরে রান্নার জায়গা নেই। গবাদি পশুগুলো রেখেছেন রাস্তায়। এর চেয়ে বড় দুর্ভোগ ল্যাট্রিনের। মেয়েছেলেদের জন্য এটা আরও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শফিক নামে একজন জানালেন, দুদিন আগে তাদের এখানে তিনটি অস্থায়ী নলকূপ আর তিনটি পায়খানার চার স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু শতাধিক পরিবারের জন্য তা খুবই অপর্যাপ্ত।
সাংবাদিক দেখে ছুটে আসা খোদেজা বেগম, রমজান আলী, রোকসানা, ময়না, রতন শেখসহ অনেকের আকুতি একটু ভালো কইরে লেইখেন। যাতে আমরা একটু সাহায্য সহযোগিতা পাই। এই দুর্দশা থেকে যেন একটু মুক্তি পাই।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের আকিরননেছা ইসলামিয়া আলিম মাদরাসায় আশ্রয় নিয়েছে শতাধিক পরিবার। এখানে আশ্রয় নেয়া রাশিদা, ফাতেমা, মমতাজসহ অনেকেই জানালেন, বানের পানিতে ডুবে গেছে ঘরবাড়ি। সহায় সম্বল বলতে কিছু নাই। তাই ঈদের আনন্দও নাই।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বানভাসি মানুষের দুর্দশার চিত্র। একেকটি কক্ষে পাঁচ থেকে সাতটি পরিবার বাস করছে। ঘরে জায়গা নেই। বাইরে কাঠফাটা রোদে রান্না করছে নারীরা। পুরুষদের কাজ নেই। তাই বাইরে ঘোরাফেরা করছে। গবাদি পশু হাঁস মুরগী রাখার জায়গাও নেই। বরাট ইউনিয়য়নের কাচরন্দপুর গ্রামটির বেশির ভাগ অংশ এখন বন্যা কবলিত। এখানেও রয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও টয়লেটের সমস্যাও। সরকারি একটু সাহায্যের আশায় চাতক পাখির মত বসে থাকেন তারা।
মাদরাসায় আশ্রয় নেয়া লাল মিয়া, রফিক মন্ডল, মাজেদ মন্ডল, নিয়ামত মন্ডলসহ অনেকেই জানান, ২০ দিন ধরে তারা আশ্রয় নিয়েছেন এ মাদ্রাসায়। মাদরাসার একেকটি কক্ষে পাঁচ থেকে সাতটি পরিবার বাস করছে গাদাগাদি করে। নারী ও পুরুষরা থাকেন আলাদা আলাদা জায়গায়। কক্ষের ভেতরে জায়গা না হওয়ায় রাত কাটান বারান্দায়। মশার কামড়ে ঘুম আসে না। গবাদি পশু হাঁস মুরগী বাইরে থাকায় চোর ডাকাতের ভয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকেন। কারো কাছে একটা কানা কড়িও নেই। কোনো মতে ধার কর্য্য করে চাল ডাল কিনে দুবেলা আহার তুলে দিচ্ছেন ছেলেমেয়েদের মুখে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউপি চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান জানান, তার ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম বন্যা কবলিত। প্রায় দুই হাজার পরিবার রয়েছে পানিবন্দী অবস্থায়। এপর্যন্ত সাত টন চাল, ৮০ জনের জন্য শুকনা খাবার ও ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তিনি আরও চাহিদা দিয়েছেন।
রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম বলেন, বন্যার কারণে উপদ্রুত এলাকার কাছাকাছি সকল স্কুল ও মাদ্রাসায় বন্যার্তরা আশ্রয় নিতে পারে। এপর্যন্ত সরকারি হিসেবে তিনটি আশ্রয় কেন্দ্রে বন্যার্তরা আশ্রয় নিয়েছে। বন্যা কবলিত সকল মানুষের জন্য ত্রাণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে দেয়া হয়েছে ভিজিএফ চাল। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কোনো মানুষই ত্রাণের বাইরে থাকবেনা।



>