শুটকি শিল্পের মৌসুমী সংসার


শুটকি শিল্পের মৌসুমী সংসার


মোঃ সাইফুল ইসলাম : কথা বলার কিংবা সোনার সময় নেই ওদের। ১০-১২টি নৌকা এইমাত্র নোঙর করেছে। কুড়েঘর থেকে এক খন্ড লাঠি নিয়ে উদোম গায়ে দৌর শুরু করেছেন কয়েকজন যুবক। নৌকা থেকে ঝাপিভর্তি ছোট বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নামছে চরের হাটুজল পানিতে। রশি লাগানো ঝাপি দুই প্রান্তে দু’জন বয়ে চলেছেন তীরে। মাছগুলো চাটাইয়ে রোদে দেয়া হবে। কিন্তু এর আগে আবর্জনা ও বাছাই করে একদল নারী শিশু এ কাজটির জন্য প্রস্তুত। চাটাইয়ে ঢালতেই নারী ও শিশুরা লেগে পরলেন বাছাইয়ের কাজে। পাশেই অপর একটি চাতালে পাঁচ-ছয় বছরের জীর্নশির্ন শিশু কোলে মাঝবয়সী মহিলা । তিনিও ব্যস্ত আধাশুকানো শুটকি উল্টানোর কাজে । আরতের শ্রমিকদের ব্যস্ততার শেষ নেই। কারণ লাল প্রজাতীর চিংড়ী( স্থানীয়দের ভাষায় টাইগার চিংড়ী)গুলো বরফ দিয়ে প্রকৃয়াজাত করে চালান করে দিতে হবে। ঘাটে মহাজনের ট্রলার অপেক্ষায় আছে লাল চিংড়ী নেয়ার জন্য।

দৃশ্যটি বরগুনার তালতলী উপজেলার সোনার চর শুটকি পল্লীর। জেলার সোনারচর ও লালদিয়া নামক দুটি চরে বছরের ৬মাস ধরে চলে শুটকি আহরন ও প্রকৃয়াজাতকরন। শুটকিকে কেন্দ্র করে উপকূলীয় হাজার হাজার জেলে ও মৎসজীবীদের আনাগোনায় মুখরিত এ দুটি চর। ছোটছোট কুড়েঘর নির্মান করে এসব জেলে পরিবারগুলো ৬মাসের জন্য মৌসুমী সংসার গড়ে তোলে। বালির চরে সারিসারি কুড়েঘরগুলো দেখে আচমকাই মনে হবে আরবদেশের বেদুঈন এরা।

অক্টোবর-নভেম্বর মাসে সাতক্ষিরা, খুলনা, বাগেরহাট, মংলা ও বামনা উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জেলেরা নৌকাসহ স্ব-পরিবারে এ চরে এসে কুড়েঘর নির্মান করে অবস্থান নেয়। প্রায় দুই শতাধিক পরিবার। জীবন-জীবিকার তাগিদে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে বাড়ি থেকে পাড়ি জমায় এ চরে। জেলেরা সাগর ও নদী থেকে ভোল কোড়াল, রুপসা, বাইন, ছুরি, লইটকা, পোঁয়া, ফ্যাসা, তপসী, বৈরাগী, ফাইলসা, মধু ফাইলসা, সাইট্টাসহ আরো অনেক নাম না জানা মাছ শিকার করে প্রাকৃৃতিক উপায় শুঁটকিতে রূপান্তরিত করে। মৌসুম শেষে যে আয় হয় তা দিয়েই টেনেটুনে চলে বছরের বাদবাকী দিনগুলো। তবে নিরপদে বাড়ি ফেরা নিয়েও রয়েছে এদের সংশয়।

শুঁটকি শিল্পের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত আঃ রব বলেন’ মোগো আসলে এহন আর শান্তি নাই, হারা বচ্ছর কোনো কাম কাইজ করিনা। এই ছয়মাস এইহানেই কাডাইতাছি ১৫ বছর ধরর্ই্যা। এহন এহানে চাদা দেওন লাগে। ট্রলারের টোকেন না থাকলে ডাহাইতে ধইর্যা লইয়া যায়। এই কাম এহন আর ভালো লাগেনা।’

দশ বছর ধরে সাতক্ষীরার জেলে কালাম মিয়ার নেতৃত্বে ১২টি পরিবার আশারচরে শুটকী আহরণের কাজ করছেন। কালাম মিয়া জানালেন, প্রতিবছরই স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী তাদের কাছে চাঁদা দাবী করেন। না দিলে নানা রকমের হুমকী দিতে থাকেন। এছাড়া মাঝে মধ্যে চরে এসে পছন্দের মাছ নিয়ে যান। তাছাড়া জলদস্যুদের উৎপাত অসহনীয়। এইতো গতবছর আশারচর থেকে চারজন জেলেকে মুিক্তপনের দাবীতে অপরহরণ করেছিল । পরে আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের ফেরৎ আনতে হয়েছে।

ঘরকন্নার কাজ ফেলে শুটকি প্রকৃয়াজাতকরণের কাজে সহায়তার জন্য স্বামীর সঙ্গে এসেছেন আসাম আক্তার। তার অবশ্য কোন সন্তান নেই। তবে গোটচর জুড়ে প্রায় অর্ধশতাধিক নগ্ন-অর্ধনগ্ন শিশুদের খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। বাবা-মা’র সাথে এ চরে এসেছে সাত বছর বয়সী রফিকুল। ‘ আব্বায় স্কুলে ভর্তি করায় নাই এহনো’। এমনটাই জবাব এদের।

শুটকী ব্যবসায়ী দুলাল আহম্মেদ ফরায়েজী জানান, বছরের কার্তিক থেকে চৈত্র- এ ৬ মাস জেলেরা নদী এবং সাগর থেকে নানা প্রজাতির মৎস্য আহরণ করে। প্রাকৃতিক উপায় (মাচা) বাঁশ দিয়ে খুঁটি ও আড়া তৈরি করে দিনের পর দিন লবণযুক্ত মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। এ কাজে এলাকার জেলেদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি সুবিধা। এমনকি সঠিকভাবে শুঁটকি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নেই কোনো হিমাগার এবং গুদামজাতকরণ ব্যবস্থাও। ফলে কিছুদিন মজুদ রাখার পরই গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় জেলেরা পানির দরে দেশের শুঁটকি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। এ কারণে প্রতি বছরই শ্রমের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি তারা লোকসানের মুখে পড়ে।

তালতলী এলাকার শুটকি ব্যবসায়ী ইউনুস ফরায়েজী জানান, ফিস প্রসেসিং সিস্টেম ও হিমাগার না থাকায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের মৎস্য ব্যবসায়ীদের কাছে খুব কম মূল্যে আহরণকৃত মাছ বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন তারা। এ কারণে জেলেরাও মাছের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেনা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুসারে বর্তমানে দেশে মোট ১৬টি শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি কক্সবাজার এবং ১টি সুন্দরবন এলাকার দুবলার চরে অবস্থিত। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্রে আরো জানা যায়, ১৯৮৯ সালে দেশে শুঁটকি উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু বিগত ২০ বছরে তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়েছে।

দুবলারচর ফিসারম্যান গ্রুপের ব্যবস্থাপক মেজর নজরুল ইসলাম লাল বলেন‘ দেশের প্রায় সর্বক্ষেত্রেই লেগেছে দিন বদলের হাওয়া। শুধুমাত্র শুঁটকি শিল্পই চলছে সেই প্রাচীন পদ্ধতিতে। তাছাড়া উন্নত সড়ক যোগাযোগ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে শুঁটকি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে। দক্ষিণাঞ্চলের শুঁটকি উৎপাদনকারী বিভিন্ন চরাঞ্চলের সঙ্গে জেলা ও উপজেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ নেই বললেই চলে। এসব এলাকা থেকে শুধুমাত্র নৌপথেই শুঁটকি আহরণ সম্ভব। এ কারণে শুঁটকি পরিবহন খরচ সড়ক পথের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। সমুদ্রোপকূলীয় জেলা বরগুনায় নেই কোন সরকারী বা বেসরকারী হিমাগার। ফলে একদিকে যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থা খাড়াপ অপরদিকে হিমাগারের অভাবে দিনে দিনে হাড়িয়ে যেতে বসেছে দক্ষিনাঞ্চলীয় শুটকী শিল্প।



>