ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতে আরএমটিপি’র যাত্রা শুরু


ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতে আরএমটিপি’র  যাত্রা শুরু


গণবার্তা প্রতিবেদক : ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতের অধিকতর বিকাশের লক্ষ্যে রুরাল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্ট (আরএমটিপি) নামে নতুন একটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু করেছে দেশের শীর্ষ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। সম্প্রতি পিকেএসএফ, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) ও ড্যানিশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িতব্য ছয় বছর মেয়াদী এই প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়।

ভার্চুয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মোঃ আসাদুল ইসলাম এবং সভাপতিত্ব করেন পিকেএসএফ-এর চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। পিকেএসএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন। প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে উপস্থাপনা প্রদান করেন মোঃ ফজলুল কাদের, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পিকেএসএফ। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশে ড্যানিশ দূতাবাসের সম্মানিত রাষ্ট্রদূত মিস উইনি এস্ত্রাপ পেটারসেন এবং ইফাদের কান্ট্রি ডিরেক্টর জনাব ওমার জাফর। এছাড়া, পিকেএসএফ-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ, পিকেএসএফ ও এর সহযোগী সংস্থাসমূহের কর্মকর্তাবৃন্দ এই অনুষ্ঠানে মতবিনিময় করেন। সভায় ক্ষুদ্র-উদ্যোগ খাতের বিকাশে প্রকল্পটির যথাযথ বাস্তবায়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

আরএমটিপি প্রকল্পকে একটি সময়োপযোগী প্রকল্প হিসেবে আখ্যায়িত করে সিনিয়র সচিব মোঃ আসাদুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতের উন্নয়ন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরী। প্রান্তিক পর্যায়ের উৎপাদক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য যথাযথ অর্থায়ন নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রকল্পের অর্থায়নসহ অন্যান্য উপাদান সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ প্রকল্পটির আওতাধীন অন্তর্ভূক্তিমূলক অর্থায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের বিষয়টি সরকারের গৃহীত কৌশলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। প্রকল্পটিতে উদ্ভাবনীমূলক প্রযুক্তি বিশেষত আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)-এর মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে পিকেএসএফ-কে বাংলাদেশের আইকোনিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থাসমূহের এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার পিকেএসএফ-কে সার্বিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। পিকেএসএফ এবং এর সহযোগী সংস্থাদের মাধ্যমে আরএমটিপি প্রকল্প প্রান্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগসমূহের টেকশই বিকাশে সহায়তা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ডেনমার্কের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ড্যানিশ রাষ্ট্রদূত মিস উইনি এস্ত্রাপ পেটারসেন বলেন, প্রান্তিক কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদানের ফলে তাঁদের পারিবারিক আয় বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামগ্রিক দারিদ্র্য নিরসন নিশ্চিত করা গেছে। আরএমটিপি প্রকল্পকে যথাযথ উপাদানসম্পন্ন একটি প্রকল্প হিসেবে উদ্ধৃত করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এটি প্রান্তিক পর্যায়ের উৎপাদক ও উদ্যোক্তাদের বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিতে সহায়তা করবে। এ প্রকল্পে সম্পৃক্ত হতে পেরে তাঁর সরকার আনন্দিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইফাদের কান্ট্রি ডিরেক্টর ওমার জাফর বলেন, গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোগ উন্নয়নে আরএমটিপি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করতে পেরে ইফাদ আনন্দিত। উদ্ভাবনীমূলক প্রযুক্তি সন্নিবেশিত করে ও আদর্শ পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রকল্পটি নিরাপদ ও পুষ্টিসম্মৃদ্ধ উচ্চমূল্যমানের কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণে কাজ করবে। এছাড়া, প্রকল্পটি অকৃষি উদ্যোগ বিকাশে সহায়তা করে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে পিকেএসএফ চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও গ্রামীণ ও কৃষি নির্ভর এবং এখানে ৮০ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। এই পরিস্থিতির রূপান্তর নিশ্চিত করতে হলে যথাযথ অর্থায়নের পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্থান্তর, প্রশিক্ষণ, বাজার সম্প্রসারণ ও সংযোগ আবশ্যক বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে। যাতে করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে জীবিকার প্রয়োজনে অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে হবেনা। তিনি বলেন অতিদরিদ্র, দরিদ্র এবং উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে পিকেএসএফ কাজ করে যাচ্ছে, যার ফলে দরিদ্ররা টেকসইভাবে দরিদ্র অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসছে। ক্ষুদ্র উদ্যোগসমূহের উৎপাদনশীলতা ও বাজার সম্প্রসারনে তিনি উপযুক্ত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড সংযোগ স্থাপনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষনে যে মুক্তির সংগ্রামের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে পিকেএসএফ-এর বহুমুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসমূহ বিশেষ ভূমিকা পালন করছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি ইফাদ এবং ডানিডা-কে এ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য এবং সরকারকে সার্বিক সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানান।

স্বাগত বক্তব্যে পিকেএসএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেন, স্বকর্ম ও মজুরি কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে পিকেএসএফ ২০০১ সাল থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোগ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। আরএমটিপি প্রকল্প কৃষি খাতে ক্ষুদ্র-উদ্যোগ কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ ত্বরান্বিত করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রকল্পের আওতায় আর্থিক সেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের নানাবিধ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে বলে তিনি জানান।

নতুন এই প্রকল্প বিষয়ক উপস্থাপনায় মোঃ ফজলুল কাদের, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পিকেএসএফ, জানান যে প্রকল্পের আওতায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন, উচ্চ মূল্যমানের শস্য ও উদ্যান কৃষি, এবং মৎস্যচাষ — এই তিনটি প্রধান কৃষি খাতভুক্ত পণ্যের ভ্যালু চেইন কর্মকাণ্ড, ক্ষুদ্র উদ্যোগে আর্থিক পরিষেবা প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা দেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের ৪.৫ লক্ষ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে প্রত্যক্ষ সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে বাস্তবায়িতব্য এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ইফাদের অর্থায়নের পরিমাণ ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সহ-অর্থায়নকারী হিসেবে ডানিডা ৮.৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সরবরাহ করবে। অবশিষ্ট অর্থ পিকেএসএফ, সহযোগী সংস্থা, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও উদ্যোক্তারা যোগান দেবে বলে তিনি জানান।

নিরাপদ কৃষি পণ্য উৎপাদন ও কৃষি পণ্যের ব্র্যান্ডিং-এর লক্ষ্যে এ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্লোবাল গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (জিগ্যাপ) এবং হ্যাজার্ড এনালাইসিস এন্ড ক্রিটিকাল কন্ট্রোল পয়েন্টস প্রোটোকল অণুসরণ করে পণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন করা হবে। এছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় পণ্যের উৎস সনাক্তকরণ ও সনদ প্রদানেরও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের উচ্চ মূল্যমানের ফল/ফসল চাষের প্রচলন করা হবে। আর্থিক পরিষেবা, কৃষি পণ্যের উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণে উদ্ভাবনীমূলক প্রযুক্তি প্রচলনে এ প্রকল্প নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। প্রকল্পটিতে ইন্টারনেট অফ থিঙ্কস (আইওটি) ও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ভিত্তিক আধুনিক চাষাবাদ ও উৎপাদন ব্যবস্থা প্রবর্তনের পাশাপাশি অধিকতর স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ব্লকচেইন টেকনোলোজি প্রয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের জন্য ইক্যুইটি ফাইনান্সিং-এর সুযোগ সম্প্রসারণে ক্রাউড ফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম চালু করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। উল্লেখ্য, আরএমটিপি-এর পূর্বে পিকেএসএফ ইফাদের অর্থায়নে চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।



>