অক্ষমের কান্না আসে


অক্ষমের কান্না আসে


অনিল সেন : পাল্টে গেছে ধর্ষণের ধরন। এখন আর একা হয় না। দলবেধে যেতে হয়। কি ভয়ানক দৃশ্য! ৯ জন বাঙালি পুরুষ আর একজন আদিবাসী কিশোরী বোন। সেও আবার প্রতিবন্ধী। ভাবলে শরীর হিম হয়ে আসে। চোখ খোলে না। অক্ষমের কান্না আসে। কোথায় যাচ্ছি আমরা? একেই কি বলে সভ্য সমাজ।
দেশে গত এক সপ্তাহে ঘটে গেছে বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা। তার একটি পাহাড়ী অঞ্চলে। হৃদয় বিদারক। সেখানে এক প্রতিবন্ধী আদিবাসী কিশোরীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছে। মর্মান্তিক আরেকটি ঘটনা ঘটেছে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে। স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছে৷ রাজশাহীতে এক গীর্জার ফাদার ধর্ষণ করেছে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে।
সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনা এবং ঘটনার ধরন মানুষের মনে ব্যাপক শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। ধর্ষকের হাত থেকে বাদ যাচ্ছে না প্রতিবন্ধী কিশোরী এবং শিশুরাও। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবার কাছ থেকে ভিকটিমকে ছিনিয়ে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। এ এ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন মানবাধিকারকর্মীসহ বিশিষ্টজনেরা। তারা বলছেন, বিচারহীনতা সংস্কৃতি এবং বিচারের দীর্ঘসুত্রিতার কারনে দেশে এ রকম ঘটনা ঘটছে এবং ধর্ষকরা নিজেদের অপ্রতিরোধ্য ভাবছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক জরিপে দেখা গেছে, কেবল গত আগস্ট মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৪৯ জন নারী ও শিশু। এরমধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩২ জন।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশের সুশানের অভাবে ধর্ষণের ঘটনা বিশেষ করে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। তিনি বলেন, এটা একটা নতুন স্টাইল শুরু হয়েছে। এটা সমাজের জন্য অশনি সংকেত। মানুষ যখন অমানবিক হয়ে ওঠে তখন তার হিতাহিত জ্ঞান লোভ পায়। একটা চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে দেশ চলছে।এ থেকে পরিত্রানের জন্য সরকারের জবাবদিহিতা দরকার। যদিও সরকার চেষ্কা করছে। কিন্তু দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় বিষয়টি জঠিল হচ্ছে। বিরোধী পক্ষরা রাজনীতি করতে পারছে না।

তিনি বলেন, সরকারের সচ্ছতা জরুরী। বড় বড় দূর্নীতির বিচার হওয়া দরকার।বিচারবিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। বিচারে গতি আনতে হবে। দিনের পর দিন হাজার হাজার মামলা পরে থাকে। রায় হয় না। যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা না যায় এবং বিচারে হস্তক্ষেপ করা হয় তবে ধর্ষনের মতো সমাজ বিরোধী , নেক্কারজনক কার্যকলাপ বন্ধ করা যাবে না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা আবারো এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করবো। ড. মজুমদার বলেন, এজন্য সূশীল সমাজের ভুমিকা রয়েছে। তবে সরকারকে কঠোর হস্থে এসব বন্ধ করতে হবে।
সিলেটের এমসি কলেজের ধর্ষনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও বিচার নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে ৷ কারন এই ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, তারা সবাই ক্ষমতাসীন দলের সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। জানা গেছে, সেখানকার ক্ষমতাসীন দলের দুই নেতার সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সু- সম্পর্কে রয়েছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় তারা অপরাধ সংগঠিত করছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে খাগড়াছড়িতে। সেখানে ডাকাতি করতে ঘরে ঢুকে প্রতিবন্ধী এক আদিবাসী কিশোরীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। তবে সিলেটের মতো সেখানে প্রশাসনের তেমন কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। আদিবাসী বলে কিনা-সেটা ভাববার বিষয়। পাহাড়ী অঞ্চলে ধর্ষণের ঘটনা অহরহ ঘটে। বিচারহীনতা এবং প্রতিবাদ করতে না পারায় অনেক ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। তবে দেশের মানুষ চায়, খাগড়াছড়ির প্রতিবন্ধি অসহায় মেয়েটিকে যারা ধর্ষণ করেছে তাদের যেন উপযুক্ত বিচার হয়।
‘উই ক্যান’-এর নির্বাহী সমন্বয়ক জিনাত আরা হক বলেন, ধর্ষণ করতে সময় লাগে কয়েক মিনিট, কিন্তু বিচার পেতে সময় লেগে যায় যুগের পর যুগ। তিনি বলেন, পুলিশ দুর্নীতিগ্রস্থ, প্রশাসনে জবাবদিহিতা নেই, পুরুষবান্ধব আদালত প্রাঙ্গন- সব মিলিয়ে ধর্ষণের ঘটনার ভিক্টিমের সময় বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়ায় যেভাবে একজন ভিকটিমকে প্রমাণ করতে হয় যে সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যতগুলো ধাপ পার হয়ে ট্রায়াল ফেইস করতে হয়, এর প্রত্যেকটাই যথেষ্ট একজন নারীকে বিচার প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে যাওয়ার জন্য। তার ওপর দীর্ঘসূত্রতা তো আছেই। আবার আদালত মামলা আমলে নেওয়ার আগে তদন্তের ভার পুলিশকে দেওয়া হয়। সেখানে তদন্ত প্রভাবিত হয়ে যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এসব কারণে ধর্ষক নির্ভয় হয়।
রাজশাহীর তানোরে গীর্জায় ঘটনায় গীর্জার ফাদারকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। ফাদারের নাম প্রদীপ গ্যাগরী। রাতে মেয়েটির ভাই বাদী হয়ে থানায় অপহরণ ও ধর্ষণ মামলা দায়ের করে। কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, গত ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে বাড়ির কাছে ওই গির্জার পাশে ঘাস কাটতে গিয়ে নিখোঁজ হয় তাদের মেয়ে। খোঁজাখুঁজির পর তাকে না পেয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তার ভাই। প্রথমে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য স্থানীয় গ্রাম্য প্রধান মাইকেল হেমরণ ও মহেষ মুরমু ও আদিবাসী নেতা কামেল মার্ডীকে নিয়ে সালিসি বৈঠক বসান। সালিসি বৈঠকে ফাদার প্রদীপকে অপসারণ করা হয় এবং কিশোরীকে ভরণ পোষণসহ যাবতীয় খরচ বহন করা হবে গীর্জার পক্ষ থেকে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। এর পর তারা জিডি তুলে নিতে বাদিকে চাপ দেয়। কিন্তু এরই মধ্যে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। এখন দেখার অপেক্ষা সেখানকার প্রশাসন কি ব্যবস্থা নেয়।
বর্তমান অবস্থা নিয়ে ‘ভয়েস’-এর নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ বলেন, পুজিবাদ ও পুরুষতন্ত্র যখন রাষ্ট্রের উপর ঝেকে বসে, আইন-শৃঙ্খলা যখন উদ্বিগ্নের কারন হয় এবং বল প্রয়োগের ক্ষমতা যখন সর্বপ্লাবী হয় তখন দলবদ্ধ হয়ে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটে। এজন্য রাষ্ট্রের উচিত, আইন প্রয়োগে কঠোর হওয়া। একমাত্র আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আয়তায় আনতে হবে। রাষ্ট্রকে আরো মানবিক হতে হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অভাব রয়েছে। ধর্ষণ অবশ্যই একটি রাজনৈতিক অপরাধ। সেটা নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষমতার রাজনীতি । রাষ্ট্রক্ষমতার রাজনীতি। এ ঘটনাগুলো থেকে সরকার এবং বিরোধীদল সবাই রাজনৈতিক ফায়দাটা নেয়। বেশ কিছু দিন ধরে ধর্ষণ বেড়ে চলেছে। সমতল ও পাহাড়ে পর পর কয়েকটি দলবদ্ধ ধর্ষণ ঘটনার ভয়াবহতায় সাধারণ মানুষের বোধশক্তি লোপ পেতে বসেছে। একজন নারী তার পরিবারের সঙ্গেও কোথাও গিয়ে নিরাপদ বোধ করছেন না। ভাইয়ের কাছ থেকে, স্বামীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে।
পাহাড়ী প্রতিবন্ধি কিশোরী ধর্ষণ, বা সিলেটের এমসি কলেজের ধর্ষণের ঘটনা আলাদা বিচ্ছন্নি নয়। দেশের আনাচেকানাচে হরদম যৌন হয়রানী, চলছে। মহিলারা কোথাও নিরাপদ নয়। স্কুল,কলেজ,মাদ্রাসা,শপিংমল,বাস,উপাসনালয় সর্বত্র ধর্ষকদের দৌরাত্ম। আসলে চিত্রটি এমনই স্বাভাবিক পর্যায় চলে গেছে যে সুস্থ মস্তিষ্কের রুচিশীল মানুষেরা তা এড়িয়ে গেলেই বাঁচি অবস্থা! এই জঘন্য কাজটি প্রত্যেক সরকারের আমলেই হয়, হচ্ছে এবং দুষ্কৃতীকারীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে।
দু:খের বিষয় হলো অপবিত্রতায় ছেয়ে গেছে পুরো দেশ। আর সময় দেয়া যায় না। যৌন হয়রানী,ধর্ষণের মতো অগ্রহণযোগ্য বিষয়কেও ক্ষুদ্র স্বার্থে আমরা পলিটিসাইজ করে ফেলি। নিছক রাজনৈতিক কারণে ধর্ষকদের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে নির্লজ্জের মতো অতিশয় ঘৃণ্য কাজটিকে প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে আমরা রাজনৈতিক চরিত্র বানিয়ে ফেলি। এটি কোনোভাবে কাম্য নয়। ধর্ষণ ও যৌণ হয়রানী বিষয়গুলোকে অতি গুরুত্বেও সঙ্গে দেখতে হবে। এ দায়িত্ব শুধু সরকারের নয় দেশের সকল সচেতন নাগরিকের।
ধর্ষক ও তাদের গডফাদারদের জন্য একটি অদৃশ্য ঘৃণার স্তম্ভ তৈরী করা এখন সমায়ের দাবী। সেখানে এদের দেখামাত্র থুথু ফেলতে হবে। দেশের মুক্ত বাতাসও যেনো তাদের জন্য একটি দৃশ্যমান কারাগারে রুপ নেয়। মোট কথা, ধর্ষক বিরোধী কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দেশের মানুষকে মানবিক এবং নারী বান্ধব হতে হবে।



>