২৫ বছর হলেই তারা হারিয়ে ফেলে দৃষ্টি


২৫ বছর হলেই তারা হারিয়ে ফেলে দৃষ্টি


সৌমিত্র শীল চন্দন, রাজবাড়ী ॥ বাবা কৃষক। ছেলেরাও ছিলেন কর্মঠ। যা আয় রোজগার করতো তা দিয়ে সংসারটা বেশ সচ্ছলই ছিল। হঠাৎ করেই ওঠে ঝড়। প্রথমে বড় ভাই হারান তার দৃষ্টি শক্তি। এরপর একে একে আরও দুই ভাই। ২৫ বছর বয়স হলেই তারা হারাতে থাকে তাদের দৃষ্টি শক্তি।

 ছোট ভাইটির বয়স এখনও ২৫ হয়নি। তিনি এখন থেকে চোখে কম দেখতে শুরু করেছেন। তিনি নিশ্চিত আর কিছুদিন পরেই পৃথিবীটা তার কাছে অন্ধকার হয়ে যাবে। রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাণিবহ ইউনিয়নের দক্ষিণ বাণিবহ গ্রামের আবুল খায়েরের পরিবারে বিরাজ করছে এ করুণ অবস্থা। চার ছেলের এই দুরাবস্থা  তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া যেন কিছুই করণীয় নেই বাবা আবুল খায়েরের। সংসারে কর্মক্ষম কেউ না থাকায় মানবেতর জীবন যাপন করছে তারা।

চার ছেলে, তিন মেয়ের জনক আবুল খায়ের পেশায় একজন কৃষক। তার পরিবারের বর্তমান সদস্য সংখ্যা নয় জন। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এখনও বিবাহযোগ্যা এক কন্যা রয়েছে তার। এছাড়াও সংসারে রয়েছে স্ত্রী, মেঝ ছেলের স্ত্রী ও এক নাতনী। কৃষিকাজের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য বাড়ির পাশে গড়ে তুলেছেন ছোট্ট একটি নার্সারী। তাকে সাহায্য করার কেউ নেই। ছেলেরা অন্ধ বলে সব কাজই করতে হয় তাকে। নার্সারী ও ফসলী জমি থেকে যে আয় আসে সেটা দিয়েই পরিবারের ভরণপোষণ করেন। অন্ধ ছেলেদের দেখাশুনা সহ সমস্ত কাজকর্ম করতে হয় তাকেই।

বড় ছেলে আবুল বাশারের বয়স ৩৫। তিনি দাখিল পাশ করার পর চোখে কম দেখতে থাকেন। পরবর্তীতে তিনি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যান। মেজ ছেলে আবুল কালামের বয়স ৩২।  সেজ ছেলে আব্দুস সালামের বয়স ৩০। এই তিনজনই এখন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। ছোট ছেলে আব্দুল মোতালেবের বয়স ২২। তিনি এখন থেকেই চোখে কম দেখতে শুরু করেছেন। এদিকে চার ছেলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ার সুযোগে তার নিকটাত্মীয়রা তাদের জমি দখল করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ আবুল খায়েরের।

আবুল খায়েরের মেজ ছেলে আবুল কালাম জানান, যখন স্কুলে পড়তেন তখন থেকেই চোখে কম দেখতেন। শিক্ষকরা ব্লাকবোর্ডে কী লিখেছে তা তিনি পড়তে পারতেন না। সহপাঠিরা সবাই লিখত, তিনি বসেই থাকতেন। ১৬ বছর বয়স থেকে তার চোখে সমস্যার বিষয়টি বুঝতে পারেন। নাইন পর্যন্ত পড়ে তিনি গার্মেন্টসে চাকরী করতে যান। সেখানে ভালো ভাবে চোখে দেখতে না পারায় গার্মেন্টসের অন্য সহকর্মীরা তাকে চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তার দেখে বললেন, এই চোখ আর ভালো হবেনা। ডাক্তার জানিয়েছেন, এই রোগের নাম ‘রেটিনা প্রিগনেনট্রোসা’। এ রোগের জীবাণু মায়ের শরীরে থাকে। বাবা-মায়ের রক্তের গ্রুপ এক হলে তা পুত্র সন্তানদের মধ্যে প্রভাব ফেলে। পরে ঢাকার এক চক্ষু বিশেষজ্ঞকে দেখালে তিনি একই মত দেন। তিনি বললেন, চোখের জ্যোতি দিন দিন আরও ক্ষীণ হবে। এরপর গার্মেন্টসের চাকরী ছেড়ে তিনি বাড়ি চলে আসেন।

বড় ছেলে আবুল বাশার জানান, ৯৮ সালে তিনি দাখিল পাশ করে আলিমে ভর্তি হয়েছিলেন। পরীক্ষার আগে থেকেই তিনি চোখে কম দেখতে শুরু করেন। তিন মাস ক্লাস করার পর আর চোখে দেখেন না। চোখের সমস্যার জন্য তিনি রাজবাড়ী, ফরিদপুর এবং ঢাকার বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েও কোন ফল পাননি। এর মাঝে তিনি বিয়ে করেন। তার কোলে জুড়ে আসে এক কন্যা  সন্তান। চোখের আলো না থাকায় তার স্ত্রী তাকে ও তার শিশু কন্যাকে রেখে পালিয়ে যায়। যা তাকে খুবই কষ্ট দিয়েছে। এই কষ্ট তিনি এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন।

সেঝ ছেলে আবুল কালাম জানান, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ায় তারা কোন কাজ করতে পারেন না। সরকার যদি তাদের প্রতি একটু সুদৃষ্টি দিতো তাহলে অন্ততঃ বাঁচার সুযোগ পেতেন।

ছোট ছেলে আব্দুল মোতালেব জানান, তিনি চোখে কম দেখেন। তিনি বুঝে ফেলেছেন, তার কিছুদিন পরেই পৃথিবী তার কাছে অন্ধকার হয়ে যাবে।

আবুল খায়ের জানান, ছেলেদের অসহায় অবস্থা দেখে তার বাবা তাকে কিছু জমি বেশি দিয়ে যান। কিন্তু তার মেঝ ভাই এখন তার জমি কেড়ে নেয়ার চক্রান্ত করছে। তিনি আরও জানান, গ্রামের দুষ্টু ছেলেপেলেরা মাঝে মধ্যে খুবই অন্যায় অত্যাচার করে। এমনিতেই খুব অসহায় করুণ জীবন যাপন করছি, তার উপর এইসব অত্যাচার তাকে প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হয়। তিনটি ছেলেই অন্ধ। আরেক ছেলেও অন্ধের পথে। আজ একটা বিপদে পড়লে কারও কাছে যাবার মতো জায়গা নেই। তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানান, যাতে করে তার পরিবারকে নিয়ে একটু ভালো থাকতে পারেন।



>