পাখি পল্লীর কথা


পাখি পল্লীর কথা


আহসানুল আলম সাথী : পাখি। রং-বেরঙের। নানা জাতের। এ যেন পাখিদের অভয়ারন্য। দৃষ্টি নন্দন এই পাখিদের বসবাস আমাদের নিকট দূরুত্বে। না দেখলে বিশ্বাসই হবে না এত পাখি কোথায় থাকে,  কোথা থেকে সাঁঝবেলা ফিরে আসে। নীলাকাশ পাড়ি দিয়ে স্রোতের মত ফিরে আসে দল বেঁধে। পুকুর পাড়ের বাঁশ বাগানটার মাথায় চাঁদ না ওঠবার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত তাদের ডাক প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
দিনাজপুর শহর থেকে মাত্র ৭/৮ কিলোমিটার দূরে এক সময়ের বহতা গর্ভেশ্বরী (গাবুরা) নদীর কূল জুড়ে এই পাখিদের আনাগোনা। বসবাস। এখন সেই জনপদে গর্ভেশ্বরী নেই। এক সময়ের খরস্রোতা গর্ভেশ্বরী আজ পানি শূন্য।
পাখিদের অভয়ারণ্যে যেতে হলে দুই দিক দিয়ে যাওয়া যায়। শহর থেকে কিছু দূরে ঐতিহাসিক দিনাজপুর রাজবাড়ী। তার কোল ঘেষে কাঁটাপাড়া। সেখানেই গর্ভেশ্বরী নদী। এখন হেঁটেই পারাপার সম্ভব। ওপারে নুলাইবাড়ী। পাশেই সারি সারি লিচু বাগানের ভাটিনা গ্রাম। এই গ্রামটিই পাখি পল্লী বলে সুপরিচিত।
অন্য পথে শহর থেকে দিনাজপুর-পার্বতীপুর সড়কে গাবুরা ব্রিজ পেরুলেই মাস্তান বাজার। টমেটোর আড়ত খ্যাত বাজার থেকে উত্তরে এঁকে বেঁকে যে পাকা রাস্তাটি রানীগঞ্জে গেছে, ওই রাস্তায় আড়াই কিলোমিটার গেলেই ভাটিনা গ্রাম। সেখানে একাধিক ছোট-বড় পুকুর জুড়ে বাঁশ বাগান ও গাছ-গাছালি। এই বাঁশ বাগানেই মিলবে দেশিয় পাখিদের বসবাস।
১৯৯৩-৯৪ সালে পাখি প্রেমী মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবী আবুল হাসেম তালুকদারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠে ভাটিনার পাখি পল্লী। এখানে পাখি শিকার নিষিদ্ধ। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করে কিছু তরুন প্রাণ এবং গ্রামবাসি। পাখি সম্পর্ক গ্রামের মানুষ খুবই সচেতন। ভাটিনা পাখি পল্লীতে গেলে গ্রামের মানুষই পাখি বিষয়ে অনেক তথ্য তুলে ধরেন দর্শনার্থীদের উদ্দেশ্যে। এখানকার সকলে বিত্তবান না হলেও পাখিদের মত শান্ত-সুবোধ অতি সাধারণ। হাসেম ভাইয়ের সঙ্গে থেকে তারা পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় গড়তে স্ব-প্রণোদিত ভাবেই ভূমিকা রেখে চলেছে।
পাখি প্রেমী আবুল হাসেম জানান, ভাটিনার বৈশিষ্ট হচ্ছে এখানকার পাখিরা আমাদের দেশের। শীতে অতিথি পাখি এলেও সংখ্যায় নগন্য। অতি সম্প্রতি দিনাজপুর-৩ সদর আসনের এমপি ইকবালুর রহিম পাখি পল্লী এসে অভিভূত হন এবং দেশজ পাখি রক্ষায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
আবুল হাসেম বলেন, ভাটিনা আসতে ১ কিলোমিটার রাস্তা পাকা করা দরকার দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে। সেই সাথে ২ একর পরিমানের একটি পুকুর পাড় তৈরী এবং আধুনিক পদ্ধতিতে গাছ লাগালে পাখিকূল নিরাপদে থাকতে পারবে। এ জন্য বাঁশবন (স্থানীয় ভাবে বেউর বাঁশ-কঞ্চিযুক্ত) দরকার। দেড় কিলোমিটার দূরে ৩নং ফাজিলপুর ইউনিয়নে মহারাজ পুরের বিলমখায় অনুরূপ পাখিদের আবাস গড়তে ২টি সরকারী পুকুর যুক্ত করলে ভাল হয়। প্রতি বছর ৪০/৫০ হাজার পাখি নিয়ে হিমশিম খেতে হয় ভাটিনাবাসিকে। বক পাখির বিষ্টায় বাঁশ নষ্ট হতে বসে। তাই আরও বাঁশ ঝাড়ের প্রয়োজন। তাছাড়া ঝোপ-ঝাড়ের অভাবে শেয়াল-বেজি-বাড়বিলাই, গুইসাপ বিলুপ্ত হতে বসেছে।
হাসেম ভাই জানান, ১টি খেঁকশিয়াল অন্তত ১০ একর মাটিতে বসবাসকারী ইঁদুরদের হাত থেকে ফসল রক্ষা করতে পারে। আমাদের পরিবেশ-জলবায়ু রক্ষায় পাখপাখালির পাশাপাশি বন্যপ্রানীও রক্ষা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাখি প্রেমী হাসেম জানান, দেশি পাখিদের ডিম পারবার সময় বর্ষাকাল। তখন সহস্র পাখির সমাগম ঘটে এখানে। নিরাপদ প্রজননে তারা ছুটে আসে। বকপাখির পাশাপাশি এখানে পানকৌড়ি, ডাহুক, বুলবুলি, দোয়েল, কোয়েল, ঘেটকো, কোকিল, ঘুঘু, বালিহাঁস, হাট্টিট্টি, চড়াই, শালিক, গাঙ্গপাখি, রাতচোরা এমন ৩৫/৪০ জাতের পাখির আবাস ভূমি ভাটিনা। এমন কিছু প্রজাতির পাখি আসে যারা তাদের নীড় চিনতে ভূল করে না। ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে। শাবক উড়তে না শেখা পর্যন্ত মা-পাখি তাদের যত্ন করে। তখন ভাটিনা অন্যরকম ভাটিনা। অনেক পাখির ভিড়ে ভাটিনায় বকেরই যেন রাজত্ব। সেই বক পাখিদের দেখতে হলে একবার ঘুরে আসুন পাখি পল্লী ভাটিনায়।



>