গুরুর গুরুত্ব


গুরুর  গুরুত্ব


কোহিনুর আক্তার গোলাপী : লালন নিজেকে কখনো ‘বাউল’ বলেন নি। তিনি ‘ফকির’। এই বিশেষ ভক্তির ধারা নদীয়া কিম্বা বিশেষ ভাবে কুষ্টিয়া ও তার আশপাশের জেলা ঘিরে গড়ে উঠেছে। ভক্তি আন্দোলনের মধ্যে ঐক্য যেমন আছে, তেমনি বিভিন্ন পথ, আচার, অনুষ্ঠান, ঘর বা চর্চার মধ্যে পার্থক্যও আছে। ঐক্যের কথা বিবেচনা করে তথাকথিত শাস্ত্রবাদী, গ্রন্থকেন্দ্রিক শিক্ষিত শ্রেণীর শাসনবাদী চিন্তার বিপরীতে মুক্তিকামী মানুষের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা, বাসনার ধারক ও বাহকদের ‘বাউল’ বলা হয়। ‘বাউল’ কথাটি কবে কোথায় কিভাবে গড়ে উঠল সে সম্পর্কে নানান জনের নানান বক্তব্য আছে, তবে নিশ্চিত করে কিছু বলার উপায় নাই। সহজে আমরা এখন বুঝি যে গ্রামে গঞ্জে পথে প্রান্তরে শহরে নগরে যারা গানে গানে মানুষের মহিমা কীর্তন করেন, তারাই বাউল। এর ফলে যারা একটু আধটু গান গাইতে জানেন তারাও ‘বাউল’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তবে বাংলার ভক্তি আন্দোলনে গুরুর গুরুত্ব বুঝতে হলে বিভিন্ন ধারার পার্থক্য জানতে হবে, বিভিন্ন সাধ্নার ধারায় গুরুর গুরুত্ব এবং ভূমিকা একরকম। বাইরে থেকে মিল মনে হলেও চর্চার ও বোঝার ক্ষেত্রে পার্থক্য আছে। এটা সত্য ফকির লালন শাহ ছাড়া বাউল গানে কোন তৃপ্তি নাই। তিনি তাই বাউলদেরও মধ্যমণি হয়ে আছেন। তবে তাঁর সুনির্দিষ্ট ভাব ও চর্চার ধরণ বা রূপ না জেনে সাধারণ ভাবে ‘বাউল’ বললে ফকির লালন শাহের কিছুই বোঝা যায় না। লালনের ধারা ‘নদীয়ার ভাব’। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জাতপাত বিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ফকির লালন সাঁইয়ের ভক্তির ধারা ‘নদীয়ার ভাব’ হিশাবে গড়ে ওঠে। লালন ফকির ছিলেন সর্বোপরী জাত, পাত, ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের উর্ধে অসাধারণ একজন সাধক।

নদীয়ার ফকিরি ভাবচর্চার ভিত্তি তিনি রচনা করে দিয়ে গিয়েছেন। যার সূত্র ধরে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় এই ভাবের চর্চা সীমান্তের দুই পাশে বাংলায় শক্তিশালী সাধনার ধারা হিশাবে গড়ে উঠেছে। লালনের ভাবচর্চাকে আজ সারা পৃথিবীর মানুষকে আকুল ও বিস্মিত করছে। গুরুর অধীনতা এবং দাস্য ভাবের বিনয় ছাড়া সাধারন জ্ঞানে লালনের ভাব বোঝা কঠিন। সাঁইজীর ভাব সুনির্দিষ্ট জীবন চর্চার সঙ্গে জড়িত। সেই জীবন-যাপনের বাইরে সাঁইজীর গানের অর্থ কখনই পুরাপুরি হৃদয়ঙ্গম করা যাবে না। ফকির লালন শাহ্ আত্মতত্ত্ব সাধনার প্রত্যক্ষই ঙ্গিত যেমন দিয়েছেন, তেমনি গুরুর অধীন থেকে ভাবচর্চার শিক্ষাও দিয়ে গিয়েছেন। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, “ভাব দিয়ে ভাব দিলে পরে তবেই রাঙা চরণ পায়”। সাঁইজীর পথ নিজেকে চেনার পথ, হঠাৎ করে কারো কাছে চালপানি নিলেই ‘ফকির’ হয়ে যাওয়া সম্ভব না। নিজেকে বদলাবার চেষ্টায় — সহজ সাধনার ধারা জানা, বোঝা ও আয়ত্ব করার মধ্যেই এই ধারার শক্তি নিহিত। ধীরে ধীরে রূপান্তরের মধ্য দিয়েই মানুষ সেই আলোর সন্ধান পায় যখন নিজের ভেতরের সঙ্গে বাহিরের কোন ভেদ থাকে না। হঠাৎ করে কেউ এসে সাধনা করতে গেলেই সে সাধক হতে পারে না।রাতারাতি সাধন সিদ্ধির কোন উপায় নাই। নদীয়ার সাধন জগতের বিধি বিধান মেনে নিজেকে রূপান্তরের সংকল্প নিয়েই সাধন প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে হয়। নদীয়ার ভাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে গুরুর গুরুত্ব বোঝা। এই উপমহাদেশের ভক্তি সাধনায় ‘গুরু’ কথাটা নানান ভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাহলে নদীয়ায় ‘গুরু’ কথাটার মানে সুনির্দিষ্ট ভাবে বুঝতে হবে। প্রাথমিক স্তরে গুরু মানে যার অধীনতা শিষ্যকে ‘সুভাব’ দেয়। নিজের কাছে নিজে, পরিবারে কিম্বা সমাজে যেন আমরা এমন ভাবে চলতে পারি যাতে আমাদের স্বভাবের মাধুর্যে মানুষ আনন্দিত হয়। তারাও যেন ভক্তির ভাব কিম্বা দাস্য ভাবের মহিমা বুঝতে পারে। তাই প্রাথমিক স্তরে ‘গুরু দৈন্য’ গান নিয়মিত গাওয়া সাধন পথের প্রাথমিক চর্চা।

ভক্তের সাধন ভজনের মধ্য দিয়ে যেন গুরুর মহিমা প্রকাশিত হয়, সেই শিক্ষা পাওয়াই সবার আগে জরুরী। সমাজ সাধকের জীবন যাপনের মধ্যে নিজেদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত খুঁজে পায়। সেই দৃষ্টান্তের মধ্য দিয়ে গুরুও স্ব-প্রকাশ হন। “গুরু, সুভাব দাও আমার মনে রাঙা চরণ যেন ভুলিনে।। গুরু, তুমি নিদয় যার প্রতি ও তার সদাই ঘটে কুমতি তুমি মনোরথের সারথী যথা নাও যাই সেইখানে।। গুরু, তুমি তন্ত্রের তন্তরী গুরু, তুমি মন্ত্রের মন্তরী গুরু, তুমি যন্ত্রের যন্তরী না বাজাও তো বাজবে কেনে।। আমার জন্ম-অন্ধ মন –নয়ন তুমি বৌদ্ধ সচেতন চরন দেখবো আশায় কয় লালন জ্ঞান-অঞ্জন দাও নয়নে।। মানুষ যেদিন নশ্বর জীবনের সীমা উপলব্ধি করে পরমার্থিক জীবনের জন্য মনে প্রাণে আকুতি বোধ করবে কেবল তখনই সাঁইজীর কালাম আর তাদের কাছে গানের কথা হয়ে থাকবে না। পরমার্থিক জীবন কিভাবে যাপন করা যায় তার জন্য তার আকাংখাও তীব্র হবে। সেই দিন মানুষ ফকির লালন শাহকে বোঝার তাগিদও বোধ করবে। জীবকুল স্থুল বস্তুগত প্রকৃতির মধ্যে থেকেই পরমের জন্য আকুতি বোধ করে। গুরু মানুষের সেই ‘সহজ’ স্বভাবকে রূপ দিয়ে থাকেন, গড়েন। নইলে ভুলের কবলে পড়ার প্রবনতা রয়ছে। গুরু একদিকে জীবের আশ্রয়, অন্যদিকে তিনি পরম সত্তা। লালন শাহ্ সেই জন্য গুরু ভজনাকে মানুষ ভজনার কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন।

নদীয়ার ভাবের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে দাস্যভাব চর্চা। ‘আমারে কি রাখবেন করে চরণদাসী’ সহ আরও বহু গুরুদৈন্য গানে এই দাস্য ভাবই ফকির লালন ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। র্বতমান কালে মানুষ সবকিছুই অনুমান ও সাধারন জ্ঞান দিয়ে বুঝতে চায়। জানতে চায়। অসম্পূর্ণ জ্ঞান দিয়ে কখনই পরম সত্তাকে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। সে কারণেই নদীয়ার ‘গুরু’ ধারণার গুরুত্ব ও দাস্য ভাবের মাধুর্য্য সকলের পক্ষে সহজে বোঝা সম্ভব নয়। লালন ফকিরের ভাণ্ডার অফুরন্ত ও অক্ষয়। আমাদের কেবল তাঁর প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে হবে। তাহলেই কেবল আমাদের জীবনের বড় সমস্যা গুলো সমাধানের পথ আমরা পেয়ে যাব। জগত আমাদের মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে রাখে। এই মহামায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হতে হলে গুরুর্কম করা বাঞ্ছনীয়। আমাদের আমল অনুযায়ী এই জীবনে চলার পথে সুখ-দুঃখ হাসি কান্না অনেক কিছুই রয়ে যায়, আমরা র্কমফল অনুযায়ী র্কমফল পাই। কিন্তু পাওয়া না পাওয়ার হিশাবের উর্ধে গুরুই আমাদের আশ্রয়। তাই গুরু পদে ডুবে থাকাই নদীয়ার সাধনা। ‘গুরু পদে ডুবে থাকরে আমার মন গুরু পদে না ডুবিলে জনম যাবে অকারণ”।



>