লালন ‘থিম’ ও ‘মিথ’ এবং আমাদের করণীয়


লালন ‘থিম’ ও ‘মিথ’ এবং আমাদের করণীয়


আব্দুর রহমান : লালন সাঁই, আমাদের জাতীয় জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য আর জীবনাচারের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ লালন। তার গান আমাদের জীবনে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। শুধু তাই নয়, যতই দিন যাচ্ছে ততই তা আরও মজবুতভাবে গেঁথে যাচ্ছে। লালন আমাদের ভাবনার জগৎকে প্রসারিত করছেন, তিনি আমাদেরকে, আমাদের জীবন ও জীবনাচারকে প্রতিনিয়ত নানাবিধ প্রশ্নের মুখোমুখি করেছেন আর সে প্রশ্ন আমাদেরকে সত্য খুঁজে বের করতে সহায়তা করছে, পথ দেখাচ্ছে।

মরমি সাধক ফকির লালন সাঁই’র জন্ম ১৭৭৪ সালে। তার জন্মস্থান নিয়েও আছে নানা বিতর্ক। কোন কোন গবেষণায় তার জন্মস্থান হিসেবে ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হারিশপুর গ্রামের কথা বলা হয়েছে, কোথাও কোথাও তার জন্মস্থান হিসেবে বলা হয়েছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামের কথা। আবার যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে তার জন্ম বলেও মত রয়েছে। লালনের জন্মস্থান নিয়ে তিনি নিজে কিছু বলে যাননি। ফলে বিষয়টি নিয়ে যে বিতর্ক তা আসলে চিরন্তন এক বিতর্ক হিসেবেই রয়ে গেছে।

তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর। ১১৬ বছরের দীর্ঘায়ু পেয়েছিলেন তিনি। তার এই দীর্ঘ জীবনের বাকে বাকে ছড়ানো আছে নানা রহস্য, আর সেই রহস্য প্রকৃত অর্থে মানবজনমের রহস্য। মানবজীবনের স্বার্থকতা তিনি খুঁজেছেন, খুঁজেছেন তিনি মানবজীবনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য, ভেবেছেন মানবের মানুষ হয়ে ওঠার উপায় নিয়ে আর তাই তিনি গেয়েছেন ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’।

লালন ছিলেন একজন মানবতাবাদী সাধক। যিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সকল প্রকার জাতিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। লালন ফকিরের জীবন আর দর্শণকে আমরা কতটা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি, সেটি নতুন কোন প্রশ্ন নয়, পুরনো সেই প্রশ্নটি আমরাও রাখলাম, একইসঙ্গে তার প্রতি জানাই আমাদের হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা।

লালন মেলা বছরে দুইবার অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। একবার দোল পূর্ণিমায়, আরেকবার লালনের মৃত্যুতিথিতে। ১ কার্তিকে তার মৃত্যুদিবসকে স্মরণে রেখে যে মেলা হয় তা চলে তিন দিন ধরে। এই তিন দিনই দেশ-বিদেশ থেকে আসা বাউল সাধকরা গানের আসন বসান লালনের মাজারে। জীবনের অর্থ খোঁজেন গানে, কথায় আর নানা প্রশ্নে।

এবার করোনা পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বেই নেমে এসেছে এক চরম স্থবিরতা, মন্দা লেগেছে মানুষের জীবনে, জীবিকায়, আর স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব পড়েছে সংস্কৃতি অঙ্গণেও। লালন উৎসব নিয়ে তাই এবার নেই আগের মতো সেই প্রানপ্রাচুর্যে ভরপুর কোন আয়োজন, কিন্তু সাঁইজিকে নিশ্চয়ই ভজন করবেন তার অনুসারীরা। ছেউড়িয়ার আখড়া হয়তো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর হয়ে উঠবে না, লালন স্মরণে আনুষ্ঠানিকতার মূল্য থাকলেও বর্তমান বাস্তবতাকে তো অস্বীকার করা যাবে না তাই তাকে স্মরণের বিষয়টি এবার আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অনানুষ্ঠানিকতারই প্রাধান্য।

লালন আছেন দেশ-বিদেশে তার গানের লাখো লাখো ভক্তের হৃদয়ে, তার মৃত্যুদিবসকে যথাযথভাবে পালন করতে না পারার বেদনা তার ভক্ত অনুসারীদের হৃদয়ে কিছুটা হলেও ক্ষত সৃষ্টি করবে, বেদনার ভার বাড়াবে।

গবেষণা ও প্রকাশনা সংস্থা ‘রুটস’ বাঙালি সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্প সবচে’ বড় কথা বাঙালিয়ানা লালনের অঙ্গীকার নিয়ে পথচলা একটি মঞ্চ বা প্রতিষ্ঠান। ‘‘রুটস’ এর প্রকাশনা শেঁকড়’ বাঙালি জাতির এবং মানুষের শেঁকড়ের সন্ধান করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। রুটস’ এর ভাবনা দীর্ঘদিনের তবে বিভিন্ন বাস্তবতায় এর কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা ছিল না, তা আমরা স্বীকার করি।

এবার পৃথিবীর এই দু:সময়ে বা দুর্দিনে আমাদের বাঙালি জাতির গর্বের পুরুষ ফকির লালন সাঁইকে নিয়ে আমরা বিশেষ আয়োজন করেছি। লালন সাঁইকে মানুষের হৃদয়ে নতুন করে ঠাঁই দেয়ার কিছু নেই। তারপরও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ভাবনায় পরিবর্তন আসে, লালন যেমন গেয়েছেন ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। তাই মানুষ ভজনকে স্মরণ করিয়ে দিতে কিংবা লালনভজনের ধারাবাহিকতায় আমাদের ক্ষুদ্র প্রয়াস ফকির লালন সাঁইকে নিয়ে বিশেষ এই আয়োজন।

এই আয়োজন প্রাথমিকভাবে রুটস এর অনলাইন প্রতিষ্ঠান ‘গণবার্তায় প্রকাশিত হবে। আমাদের আকাঙ্ক্ষা আছে এই সংখ্যাকে মুদ্রিত আকারে বের করা। সে লক্ষ্যে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। পাঠক, শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতা আর পরামর্শে আমরা তা নিকট ভবিষ্যতে করার ব্যাপারে প্রত্যয়ী ও আশাবাদী।

লালন এখন একটি ‘নাম’নয় তা আসলে একটি ‘থিম’- এ পরিণত হয়েছে, পরিণত হয়েছে ‘মিথ’-এ। লালনের নাম টিকে থাকবে তার গানে। কিন্তু লালন যে ‘থিম’ তাকে প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি কিন্তু রয়ে যায়, আর তাতেই চলে আসে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি, আর ‘মিথ’ হিসেবে যে লালন তাকে বিশ্বপরিমণ্ডলে পৌঁছে দেয়ার কাজটিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়।

লালন বলেছেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।’ আমরা ‘মানুষ’ হতে চাই, আমরা ‘মূল’ ছাড়া হতে চাই না তাই আমাদের প্রচেষ্টার নাম ‘শেঁকড়’। লালন গানে বলেছেন ‘সময় গেলে সাধন হবে না’। আমরা মনে করি লালনকে নিয়ে আরও বৃহত্তর পরিসরে, বৈশ্বিক আকারে যে উদ্যোগ নেয়ার সুযোগ রয়েছে তা নেয়া খুবই প্রয়োজন। বৈশ্বিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে লালনের গান আর কথা পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের মাঝে  তৈরি করতে পারে আশা ও আত্মবিশ্বাস।

আগেই বলেছি ‘গণবার্তা’য় লালনের নানাদিক তুলে ধরে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ ‘রুটস’ এর প্রাথমিক প্রয়াস, আমরা লালনের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে বাঙালি মানবতা ও মানব সাধনার বার্তাটি পৌছে দিতে চাই। শুধু বাংলা ভাষায়ই নয়, আমাদের ইচ্ছা আছে, ইংরেজি ভাষায়ও এই লেখাগুলোকে ছড়িয়ে দেয়া।  শেঁকড়, শেঁকড়ের সন্ধান করবে, আজ লালনের কথা বলছি, প্রতিনিয়ত আমরা তুলে ধরবো আমাদের বাঙালি জাতির গর্বের মানুষগুলোর কথা। আমাদের বিশ্বাস আমাদের এই ক্ষুদ্রপ্রচেষ্টা, আজ না হলেও কাল একটি বৃহৎ উপলক্ষ্যে পরিণত হবে। আর সেজন্যই প্রয়োজন আপনাদের সবার মনোযোগ আর সহযোগিতা।



>