লালন প্রতিকৃতি নিয়ে বিতর্ক


লালন প্রতিকৃতি নিয়ে বিতর্ক


কাজী মোজাম্মেল হোসেন : লালনের জন্মস্থান, জন্মসাল এবং ধর্ম নিয়ে আজও নানা মতবাদ চালু আছে। একইভাবে লালনের প্রতিকৃতি নিয়েও রহস্যের কিনারা হয় নি। লালনের দু’ধরনের প্রতিকৃতির যে চিত্র পাওয়া যায় তাতে কোনটি আসল তা নিয়ে জোরালো বিতর্ক রয়েছে। বিশিষ্ট চিত্র শিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞ কাজী মোজাম্মেল হোসেন এই প্রশ্নের উত্তরে যে যুক্তিপূর্ণ তথ্য মেলে ধরেছেন তা ভাববার বিষয়

বাউল সম্রাট লালন শাহ জীবনভর ছিলেন একজন জ্ঞানান্বেষক, সাধক। তাঁর মানস ছিল গভীর তত্ত্বজ্ঞানে ভরপুর। আধুনিক দার্শনিক দেকার্ত’র মতে সংশয় থেকেই জ্ঞানতত্ত্বের উৎপত্তি। লালনের জ্ঞানতত্ত্বের পেছনেও একই যুক্তি দাঁড় করানো যায়। তাঁর জ্ঞান ছিল তাঁর বুদ্ধির সামগ্রী। লালন ছিলেন স্বজ্ঞানবাদী। আর সেই কারণেই তাই অনেকে তাঁকে পুরোপুরি বাউল বলতে নারাজ। সুফীবাদ ছিল লালন দর্শনের মূলমন্ত্র। ফলে তিনি যেমন পীরের মুরিদ ছিলেন তেমনি নিজেও পীরের মর্যাদায় আসীন হয়ে বহু লোককে মুরিদ বানিয়েছেন। 

জাতিভেদ প্রথা, বর্ণবৈষম্য, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আজন্ম এক প্রতিবাদী পুরুষ। ক্ষুদ্রতা, সংকীর্ণতা, গণ্ডীর সীমাবদ্ধতার মধ্যে তাঁর দৃষ্টি কখনও সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর কাছে অহং ছিল স্তব্ধ, জাত-পাত ছিল অবলুপ্ত। তিনি তঁাঁর সহজ সরল-সুরেলা ভাষায় মরমী বাউল গানের সুরে-বাণীতে পৃথিবীর সকল মানুষকে এক কাতারে সামিল করে মুক্ত বিশ্বের মুক্ত মানব হিসেবে সকলকে প্রতিষ্ঠিত করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর রচিত গান এবং সুর আমাদের মূলে নাড়া দেয়। চেতনা জাগায়। তিনি কেবল তাঁর বাউল দর্শনের কারণেই খ্যাত নন, একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার, সুগায়ক এবং সাধক হিসেবে আজও হাজারো ভক্তের মনে বিরাজমান। তাঁর অন্তঃদর্শন দিয়ে তিনি যা অনুধাবন করতেন তা সুর-তাল-লয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করে মানবকে মজিয়ে তুলেছেন ’এ ভবে’। তাঁর রচিত হাজারো বাউল সঙ্গীত যেমন বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে তেমনি তাঁর হাজারো একনিষ্ঠ ভক্ত সাধক তাঁর সুর-বাণী কণ্ঠে ধারণ করে লালনকে আজ আরও উচ্চাসনে বসিয়েছেন, তাঁকে বানিয়েছেন বাউল সম্রাট।

লালনের জন্মসাল ও জন্মস্থান নিয়ে আজও নানা মতবাদ থাকলেও বর্তমান সর্বজন স্বীকৃত (লালন শাহ’র শিষ্য দুদ্দু শাহ রচিত লালন-চরিত পুঁথি অনুযায়ী) জন্মতারিখ ১ কার্তিক ১১৭৯ বঙ্গাব্দ (১৪ আগস্ট ১৭৭২ খৃস্টাব্দ)। জন্মস্থান বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ড উপজেলার হারিশপুর গ্রাম। তবে অনেকের মতে তাঁর জন্মস্থান কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ভাড়ারা গ্রাম। মৃত্যু ১ কার্তিক ১২৯৭ বঙ্গাব্দ (১৭ অক্টোবর ১৮৯০ খৃস্টাব্দ), ১১৮ বছর বয়সে।

সুধী পাঠক, লালন জীবনী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার ধৃষ্টতা আমার নেই। সঙ্গীতের ছাত্র হয়েও লালন সঙ্গীতের গভীরে যাওয়ার ইচ্ছে নেই, কারণ আমার বিশ্বাস খণ্ডকালীন শিল্পচর্চা করে কেউ কখনও শিল্পী হতে পারে না। আমার ক্ষেত্রেও তাই। চিত্রকলাকে নেশা-পেশা হিসেবে নিয়ে জীবন সায়াহ্নে এসে আজ একটু বোধ জন্মেছে চিত্রকলার কোনটি আসল কোনটা নকল তা বেছে বের করতে পারব।

কথাটা বললাম লালন শাহ’র সম্প্রতি প্রচলিত দুটো রেখাচিত্র প্রতিকৃতিকে সামনে রেখে। গত মার্চ-এপ্রিলে  ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে লাগানো হয়েছিল লালন আখড়ায় বহুতল ভবন নির্মাণের প্রতিবাদে ২৯ মার্চ ২০০১ লংমার্চের ডাক দিয়ে একটি পোস্টার এবং ৯ বৈশাখ ১৪০৮-এর লালন আখড়া রক্ষার অঙ্গীকার সম্বলিত আর একটি পোস্টার যার প্রায় সমস্ত জায়গা জুড়ে ছিল লালনের একটি রেখাচিত্রের প্রতিকৃতি। পোস্টার দুটোই ছাপা হয়েছিল ৩/১ শ্যামলী, সড়ক নং-১, ঢাকা থেকে। পোস্টার দুটো দেখে আমি সারারাত ঘুমাতে পারি নি। কারণ, সেখানে লালনের যে প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়েছিল তা প্রকৃতপক্ষে লালনের সঠিক আত্মপ্রতিকৃতি ছিল না। লালন আখড়া প্রতিরোধ কমিটি নিজেরা এ সম্পর্কে সচেতন নন বলেই লালনের এই প্রতিকৃতি ছাপাতে তাদের মনে কোনো দ্বিধার সঞ্চার করে নি। আশা করি আমার এই লেখা পাঠের পর তারা নিশ্চয়ই স্বজ্ঞানে একই ভুল আর কখনও করবেন না।

বর্তমানে লালন শাহ’র দুটো প্রতিকৃতি আমাদের চোখে পড়ে। তার একটি বৃদ্ধ লালন বিষণœ বদনে লাঠি হাতে হাতলওয়ালা চেয়ারে সম্মুখপানে মাথা হেলিয়ে বসে আছেন। অপরটি মাথায় ঝুঁটি বাঁধা চুলসহ লম্বা চুল-দাড়ি-গোঁফ সম্বলিত লালন। এর প্রথমটির শিল্পী রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং দ্বিতীয়টির শিল্পী শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু।

উল্লেখ্য, লালনের জীবিতাবস্থার কোনো আলোকচিত্র আজও আবি®কৃত না হওয়ায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নন্দলাল বসুর আঁকা রেখাচিত্রের লালন প্রতিকৃতি দুটোই একমাত্র লালনের প্রতিকৃতি হিসেবে দীর্ঘদিন যাবৎ উভয় বাংলায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রতিকৃতি দুটো পাশাপাশি রেখে সুধী পাঠক একটু মিলিয়ে খুঁটিয়ে দেখলে দেখতে পাবেন মূল চেহারার দিক থেকে প্রতিকৃতি দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থ্যাৎ, একই ব্যক্তির দুটো ছবি, অথচ চেহারাগত দিক থেকে সামান্যতম মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ কি? ঘটনাটা কি কখনও কেউ খুঁটিয়ে দেখেছেন?

জমিদারী তদারকির উদ্দেশ্যে শিল্পী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ এবং ঠাকুর পরিবারের পূর্ব-পুরুষদের কুষ্টিয়ার শিলাইদহে ছিল নিয়মিত যাওয়া-আসা। শৈশব-কৈশরে রবীন্দ্রনাথ বহুবার শিলাইদহে আসেন। শিলাইদহেই যে লালনের সাথে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে তা রবীন্দ্রনাথ তাঁর বহু স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন। সবশেষে ১৮৮৯ সালে রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে শিলাইদহে আসেন জমিদারী দেখাশুনার দায়িত্বভার নিয়ে। সাথে সঙ্গী হিসেবে থাকতেন বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। তখন ছেঁউড়িয়া রবীন্দ্রনাথের জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর ঠিক সেই সময় শিল্পী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৯ সালে শিলাইদহে বোটে বসে একখণ্ড চোথা কাগজে লালনের প্রথম প্রতিকৃতিটি আঁকেন।

ঠাকুর পরিবারের সন্তান রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ (১৮৪৯-১৯২৫ খৃস্টাব্দ) মূলত একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি পাট, নীল ও স্টিমার ব্যবসা পরিচালনা করে লাভবান হতে পারেন নি। ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর সফলতা না থাকলেও একজন নাট্যকার হিসেবে তাঁর সফলতা ছিল প্রচুর। তাঁর লেখা ৩৩ খানা নাটকের মধ্যে ২২ খানা নাটকই ছিল অনুবাদ। মৌলিক ও পূর্ণাঙ্গ নাটকের সংখ্যা ছিল মাত্র চার খানা- পূরা বিক্রম, সরোজিনী, অশ্র“মতী ও স্বপ্নময়ী। এছাড়াও তিনি ছিলেন  একজন সফল গীতিকার, সুরকার, স্বরলিপিকার, অনুবাদক ও প্রতিকৃতি আঁকায় সফল চিত্রশিল্পী। চিত্রকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও প্রতিকৃতি অঙ্কনে ছিল তাঁর অসাধারণ প্রতিভা।

জন্মসাল অনুযায়ী লালন ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথের চেয়ে ৭৭ বছরের বড়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ১৮৮৯ সালের শিলাইদহের বোটে বসে সামান্য চোথা কাগজে লালনের যে রেখাচিত্রটি আঁকেন সেখানে লালনকে একটি হাতলওয়ালা চেয়ারে সম্মুখে মাথা হেলিয়ে হাতে একটি লাঠি নিয়ে বসা অবস্থায় দেখা যায়। লালনের মুখে রয়েছে বার্ধক্যের ছাপসহ রুগ্ন চেহারা যা ১১৭ বছর বয়সে দেখা যাওয়া স্বাভাবিক। রেখাচিত্রের নিচের দিকে মাঝামাঝি শিল্পীর স্বাক্ষর। স্বাক্ষরের ঠিক উপরেই রয়েছে যথাক্রমে বাংলা তারিখ ‘২৩ বৈশাখ ১২৯৬’ এবং ইংরেজি তারিখ ‘৫ঃয গধু ১৮৮৯’। চিত্রের ডানে মাঝ রবাবর রয়েছে শিল্পীর নিজ হাতের লেখা ‘লালন ফকীর’, ঠিক নিচেই বন্ধনীর মধ্যে লেখা ‘শিলাইদহ – বোটের ওপর’। শিল্পীর এই রেখাচিত্রটি এক অমূল্য সম্পদ। এটি না থাকলে আজ কেন, কোনো কালেই খুঁজে পাওয়া যেত না দুটো রেখাচিত্রের কোনটি প্রকৃত লালন প্রতিকৃতি।

যাই হোক, পরবর্তীতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আঁকা এই রেখাচিত্রটি ড. সুশীল রায়ের ‘জ্যোতিরিন্দ্রনাথ’ গ্রন্থ তালিকায় প্রকাশিত হয়। আনন্দবাজার পত্রিকাসহ নানা গ্রন্থ এবং পত্রিকায় তখন লালনের এই রেখাচিত্রটি মুদ্রিত এবং মূল রেখাচিত্রটি রবীন্দ্রভারতী সোসাইটির সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে দুর্ঘটনাবশত সেখান থেকে রেখাচিত্রটি হারিয়ে যায়। লালন প্রতিকৃতির জরুরি প্রয়োজন অনুভব করায় এবং প্রথমটির কোনো কপি না থাকায় শান্তিনিকেতনে অবস্থানরত তখনকার নামী শিল্পী শচীন্দ্রনাথ অধিকারী শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুকে এই খবর জানান এবং তাঁকে স্মৃতি থেকে লালনের প্রতিকৃতি এঁকে দেওয়ার অনুরোধ করেন। নন্দলাল বসু জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের রেখাচিত্রটি মনে রেখে লালনের একখানা বাউল প্রতিকৃতি এঁকে শচীন্দ্রনাথকে দেন। উল্লেখ্য, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আঁকা রেখাচিত্রটি পূর্বেই দেখেছিলেন বলে নন্দলালের পক্ষে কল্পনার মাধ্যমে লালনের আরেকটি রেখাচিত্র আঁকা সম্ভব হয়েছিল। তবে আসল-নকলের ভেদাভেদ সবসময়ই থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর আঁকা লালন প্রতিকৃতিটির গায়ে কোনো সন-তারিখ উল্লেখ না থাকলেও এটি যে ১৯১৬ সালে আঁকা হয়েছিল তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। নন্দলালের আঁকা লালন প্রতিকৃতিটির দিকে গভীর দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে যে, অঙ্কনরীতির দিক থেকে এই রেখাচিত্রটি একটি অনন্য বাউল রেখাচিত্র। বাউলের ঝুঁটি বাঁধা চুল, চোখ, নাক ও ঠোঁটের অঙ্কনরীতিতে রয়েছে অত্যন্ত দক্ষতার ছাপ। চিত্রের রেখার বলিষ্ঠতা দেখে শিল্পীর যোগ্যতার বলিষ্ঠতার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রতিকৃতির উপরের ডানে ঘারের পাশে শুধু ‘নন্দলাল’ শব্দটা স্বাক্ষর হিসেবে লেখা রয়েছে। কোথাও কোনো বিবরণ বা সাল-তারিখের বালাই নেই। সব মিলিয়ে রেখাচিত্রটি যে নন্দলাল বসুর আঁকা তা তাঁর অন্যান্য রেখাচিত্রের সাথে মিলালে রেখার বৈশিষ্ট্যে তা ধরতে কোনো অসুবিধা হয় না।

শিল্পে পারদর্শিতার কারণেই নন্দলাল বসুর নামের সাথে ‘শিল্পাচার্য’ খেতাবটি যোগ করা হয়। কোলকাতা আর্ট স্কুলে পাঁচ বছরের শিক্ষা শেষে তিনি কোলকাতায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে তিন বছর শিল্পচর্চা করে সুখ্যাতি অর্জন করেন। এরপর শান্তিনিকেতনে কলা ভবনের শিক্ষক হিসেবে এবং পরে অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন।

শচীন্দ্রনাথ অধিকারী পরে তাঁর গ্রন্থে নন্দলালের আঁকা লালন প্রতিকৃতিটি ব্যবহার করেন। এরপর থেকেই লালন প্রতিকৃতি নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। বাড়তে থাকে বিতর্ক-সন্দেহসহ গবেষণা ও যাচাই-বাছাই। লালন প্রতিকৃতি সম্পর্কে গবেষক আবু তালিবের মন্তব্য হলো, “এরূপ অনুমান করতে দোষ নেই, লালনের অন্তিমকালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যখন এই ছবি আঁকেন, তখন রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে থাকতেও পারেন। অন্তত তাঁর ছিন্নপত্রের একটি চিঠি থেকে জানা যায়, ঐ বছরের শেষভাগে তিনি মাসাবধি শিলাইদহে সপরিবারে কাটান। জ্যোতিরিন্দ্রনাথও প্রায় সমসময়েই শিলাইদহে বোটে বসেই লালনের প্রতিকৃতি আঁকেন (২৩ বৈশাখ, ১২৯৬/ মে ৫, ১৯৯৮ খ্রীঃ)। আনন্দবাজার ও অন্যান্য পত্রিকায় এই প্রতিকৃতি প্রকাশিত হয়েছে (লালন শাহ ও তৎকালীন বাঙ্গালী সমাজ, অধ্যাপক মুহম্মদ আবূ তালিব, লালন শাহ মৃত্যু-শতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ, ১৯৯২, পৃ. ২৯)।” 

পরবর্তীতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আঁকা লালন প্রতিকৃতিটি খুঁজে পাওয়া গেলে প্রকৃতপক্ষে কোন প্রতিকৃতিটি লালনের যথার্থ প্রতিকৃতি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত তা ঘিরে বিতর্ক আরও জোরালো হয়। নন্দলাল বসুর আঁকা রেখাচিত্রটি বর্তমানে উভয় বাংলায় বহুল প্রচলিত। এর একমাত্র প্রধান কারণ, নন্দলাল বসুর ড্রয়িং এবং লাইনের পারদর্শিতার সাথে তাঁর পরিচিত ও সুখ্যাতি। বিপরীতে, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল লালন প্রতিকৃতির অজনপ্রিয়তার কারণ তাঁর রেখার গতির মন্থরতা। মুখাবয়বে আধুনিক বাউলের ছাপের অপ্রতুলতাসহ বার্ধক্যের ছাপ শরীরের সর্বত্র থাকার কারণে প্রতিকৃতিটি দুর্বল মনে হওয়া স্বাভাবিক।

লালন প্রতিকৃতির সঠিক বিবরণ পাওয়া যায় ড. তুষার চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্যে। তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বিশেষজ্ঞ ড. সুশীল রায় এবং নন্দলাল বসুর লালন রেখাচিত্র আঁকার ইতিহাসের সাথে জড়িত শচীন্দ্রনাথ অধিকারীর সাথে যোগাযোগ করেন। শচীন্দ্রনাথ জানান, “আমার এখন দৃঢ় বিশ্বাস যে নন্দলালের সাথে দেখা হয়েছিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথের। একটা চোথা কাগজে লালনের একটি পেন্সিল স্কেচ এঁকেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর।… যেকোনো কারণেই হোক লালনের স্কেচটি হারিয়ে যায়। শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বসুকে এই খবর জানালে পরে তিনি স্মৃতি থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্কেচের অনুরূপ লালন ফকিরের একটি স্কেচ আবার এঁকে দেন। নন্দলাল বসুর এই স্কেচটি পরে আমার গ্রন্থে এবং অন্যত্র ব্যবহৃত হয়েছে (পূর্বোক্ত, পৃ. ১২০)।”

দুটো লালন প্রতিকৃতির মূল প্রতিকৃতিটি যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আঁকা তার আরও প্রমাণ মেলে ড. তুষার চট্টোপাধ্যায়কে লেখা ড. সুশীল রায়ের চিঠিতে এভাবে, “তোমার ৭ই নভেম্বর, ১৯৭৩ তারিখের চিঠি পেলাম। আমার সঙ্গে তোমার কথা হয়েছিল। সেই অনুসারে তুমি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা লালনের স্কেচটি রবীন্দ্রভারতী সোসাইটির সংগ্রহশালায় দেখেছ জেনে সুখী হলাম। অবশ্যই লক্ষ্য করেছ যে, ঐ স্কেচটির সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের হস্তাক্ষরে চিত্র পরিচয় আছে। স্কেচটি শিলাইদহ বোটে আঁকা, তারিখ ৫ই মে, ১৮৮৯। আমার ‘জ্যোতিরিন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে চিত্র তালিকা দেয়া আছে, তাতেও ঐ ১৮৮৯ উল্লেখ আছে। লালনের এই প্রতিকৃতি সম্বন্ধে কোন সন্দেহের অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। তোমার দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা সম্পর্কে বলি যে, আচার্য নন্দলাল বসু যেহেতু স্মৃতি থেকে লালনের স্কেচ করেছিলেন, সুতরাং জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মূল স্কেচের সঙ্গে তার পার্থক্য থাকা বিচিত্র নয়। এ সম্বন্ধে তুমি উপযুক্ত অনুসন্ধান করে দেখো। বাংলাদেশে লালন দ্বিশতবার্ষিক জন্মোৎসব উপলক্ষে সেখানে যখন যাচ্ছ, তখন ওখানকার লালন গবেষকদের সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে একটু চর্চা করে দেখতে পারো।”

জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আঁকা লালনের রেখাচিত্র অক্ষয়কুমার মৈত্র দেখেন এবং পরবর্তীতে ভারতী পত্রিকার সম্পাদক সরলা দেবীকে এ সম্পর্কে যা লেখেন তা হুবহু নিুরূপ, “শ্রীযুক্ত জ্যোতিনিরাদ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের চিত্র-পুস্তকে ইহার একটি প্রতিকৃতি দেখিয়াছি, তাহাই লালনের পার্থিব দেহের একমাত্র ছায়া। অসম্পূর্ণ হইলেও তাহাই একমাত্র আদর্শ (ভারতী, ভাদ্র ১৩০২ বঙ্গাব্দ, ১৮৯৫ খৃস্টাব্দ)।”

ড. তুষার চট্টোপাধ্যায় ১৯৭৪ সালে লালনের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কুষ্টিয়া আসেন এবং সেখানে তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নন্দলাল বসুর আঁকা লালন প্রতিকৃতির যথার্থতা সম্পর্কে অনুসন্ধান চালান। তিনি এ সম্পর্কে অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক মুহম্মদ আবূ তালিব, ড. আনোয়ারুল করীম প্রমুখ লালন গবেষকদের সাথে মতবিনিময় করেন। অনুসন্ধানে প্রায় সবাই এক বাক্যে বলেন, ‘নন্দলাল বসুর আঁকা লালন চিত্রটি মৌলিক লালন প্রতিকৃতি নয়। লালনের মূল প্রতিকৃতিটি আঁকেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৯ খৃস্টাব্দের ৫ই মে তারিখে।’

লালনের প্রতিকৃতি নিয়ে ঘটনা-দুর্ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, বিকৃত লালন প্রতিকৃতির প্রচলন অবশ্যই আমাদের রোধ করতে হবে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আঁকার ২৭ বছর পর লালন প্রতিকৃতি আঁকেন নন্দলাল বসু। সুতরাং, প্রথমে যে প্রতিকৃতিটি আঁকা হয়েছিল তাই বিশুদ্ধ লালন প্রতিকৃতি বলে ধরে নিতে কোনো বাধা নেই। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লালন প্রতিকৃতির ড্রয়িং প্রপোর্সন যতই দুর্বল হোক না কেন, তা বাস্তব লালনকে দেখে আঁকা। সুতরাং তার প্রচলন অবশ্যই ঘটাতে হবে। পরিতাপের বিষয় ড. খোন্দকার রিয়াজুল হক সম্পাদিত লালন মৃত্যু-শতবার্ষিকী স্মারক গ্রন্থের (১৯৯২) প্রচ্ছদে লালনের যে প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়েছে (শিল্পী কে. জি. মোস্তফা’র আঁকা) তাও বিকৃত। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি অবলম্বনে আঁকা হলেও যথার্থতা এখানে অনুপস্থিত। প্রতিকৃতি দুটো পাশাপাশি রাখলেই যে কেউ সেটা বুঝবেন। সুতরাং, দেশবাসীর কাছে আবেদন, আপনারা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লালন প্রতিকৃতিটি সর্বত্র ব্যবহার করুন এবং নন্দলাল বসুর লালন প্রতিকৃতিটি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করুন। নতুবা ভবিষ্যত প্রজন্ম বিকৃত লালন প্রতিকৃতির সাথে পরিচিত হবে, আসল লালন প্রতিকৃতি পড়বে ছাইচাপা। বিকৃত লালন প্রতিকৃতির হবে জয়।



>