“লালনের গান মানুষকে ক্রমেই পূর্ণাঙ্গ করে তোলে”


“লালনের গান মানুষকে ক্রমেই পূর্ণাঙ্গ করে তোলে”


যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের শহুরে মানুষদের ড্রয়িং রুমে লালন সাঁইকে আলগোছে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে যে ক’জন ব্রতচারী সফল হয়েছেন, ফরিদা পারভীন তাদের মাঝে অন্যতম- এ কথা কবুল করতে দ্বিধা নেই। মূলত তার কণ্ঠেই লালনকে চিনতে শুরু করেছিল শহুরে অধিবাসীরা। প্রথমে স্রেফ শোনা, পরে লালনের গানের কথা ও সুর, সর্বোপরি ভাবনার দরজাটি খুলে দিতে এই গুণী শিল্পীর অবদান স্মর্তব্য। তিনি অকপটে বলেছেন তাঁর গায়ন রীতি নিয়ে বিতর্কের কথা। স্বীকার করেছেন, একদা তাঁর কাছে লালন ছিলেন ভালো লাগার একটা কিছু, কিন্তু এখন লালন সঙ্গীত তাঁর কাছে প্রার্থনার মতো।

শেকড়: সঙ্গীতে কিভাবে এলেন?

ফরিদা পারভীন : ৫/৬ বছর বয়স হবে তখন। যে বাসায় থাকতাম তার পাশের বাসায় কেউ একজন হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতো। সে শব্দ শুনলে আমি স্থির থাকতে পারতাম না। সেই থেকে বায়না ধরেছি হারমোনিয়াম কিনে দিতে। বাবা নিজ হাতে হারমোনিয়াম বানিয়ে দিলেন। সেই থেকেই গানের শুরু। আগ্রহ দেখে বাবা গানের শিক্ষক রেখে দিলেন। ক্লাসিক্যালের জন্য, নজরুলের গান শেখার জন্য আলাদা গুরু ছিলেন। তখনও লালনের গান শুরু করি নি।

শেকড়: লালনের গানের চর্চার শুরুটা কেমন ছিল?

ফরিদা পারভীন : স্বাধীনতার পর লালনের জন্ম বার্ষিকী পালিত হবে। ছেঁউড়িয়াতেই। তখন আমরা কুষ্টিয়ায়। বাবার এক পরিচিত হোমিও ডাক্তার বাবাকে বললেন- এতো বড় অনুষ্ঠান হবে, পূর্ণদাস বাউল আসবে, আপনার মেয়েটা যদি লালনের গানটা ধরতো তাহলে ভালই হতো। বাবা আমাকে ব্যাপারটা বললেন। আমি রাজি না হওয়াতে বাবা বলেছিলেন, সকলের গানই গাইতে হবে। গেয়ে দেখো না, ভালও লেগে যেতে পারে। এই অবস্থায় গুরুজী মোকছেদ আলী সাঁই এলেন। বললেন, ওখানে আখড়ার গুরুরা আছে, তোমাকে দেখিয়ে দেবে। নতুন গুরু এলেন। তিনি ধরিয়ে দিলেন। আমার প্রথম গান- ‘সত্য বল সুপথে চল’। মঞ্চে উঠলাম। গাইলাম। সেই থেকেই শুরু।

শেকড়: অনুপ্রেরণাটা যদি শুরু বলি তবে ভাল লাগাটা কখন থেকে?

ফরিদা পারভীন : সেটা আরও পরের কথা। শিখছি, গাইছি। তারপর ’৭২/’৭৩ সালের দিকে ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস নতুন শিল্পীদের সুযোগ দিতো। সেখানে গেলাম, সুযোগও পেলাম। কিন্তু তখনও পর্যন্ত গানের সাথে যে প্রেম তা হয় নি। আসলে লালনের গানের যে মর্মবাণী তা বোঝার মতো বয়স তখনও হয় নি। তারপর যা হলো তা হচ্ছে চর্চা আর পড়াশুনা। গানের অন্তর্নিহিত বাণী অনুধাবনের চেষ্টা। মোটকথা লালনকে বোঝার চেষ্টা। যেটা সবচেয়ে জরুরি।

শেকড়: প্রচলিত সঙ্গীতের চেয়ে লালনের গানের চর্চায় যদি একটা মৌলিক পার্থক্য থাকে তবে সেটা আপনাকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে?

ফরিদা পারভীন: আসলে তাঁর গানের যে অন্তর্নিহিত বাণী তা দারুণভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছে। অনেকটা আচ্ছন্ন করে রাখার মতো। চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন এসেছে। মানুষ এবং তার উপরে যে কেউ নেই সেই বোধ এসেছে। ‘সহজ মানুষ বুঝে দেখনারে মন দিব্যজ্ঞানে’ – একটা মানুষকে সহজ হতে বলা হয়েছে সেই গানে। সেই গান গেয়ে তো দাম্ভিক হওয়া যাবে না। লালনের গান শুনে যে বোধের জন্ম নেয় তা মানুষকে ক্রমেই আরও পূর্ণাঙ্গ মানুষ করে তোলে। গান শোনার পর অনেকের মধ্যেই সেই পরিবর্তনটা আমি দেখেছি।

শেকড়: আপনি লালনের মতবাদ নিয়ে কথা বললেন, তাঁর যে মানবতাবাদ তা কতোটা বিশ্বজনীন?

পরিদা পারভীন: সব ধর্মেরই অন্তর্নিহিত বাণী হচ্ছে শান্তি মঙ্গল কামনা। সেরকম লালনের দর্শনেরও মূল কথা মানুষ। ‘মানুষ শুরু নিষ্ঠা’- এ দিয়েই লালন মানুষকেই সবার উপরে রেখেছেন। এই যে আজ সারা পৃথিবীতে অশান্তি, অত্যাচার- তার কারণতো একটাই। নিজেকে বড় করে দেখা, অন্যকে সহ্য করতে না পারা, পরমত সহিষ্ণুতাকে পাত্তা না দেওয়া। এই যে লালন আখড়া নিয়ে বাউলদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে কাজটা হচ্ছে, এখানে কি বাউলরা/ লালন সম্প্রদায় প্রতিরোধ করতে পারতেন না? তা তাঁরা করেন নি। ধৈর্য্য ধারণ করার দীক্ষা নিয়ে কেউ হৈচৈ করে না। দেখবেন সাদা গেরুয়া পরা লালনভক্ত। তার মানে কি? তার মানে হচ্ছে জীবিত থেকেই মৃত্যুর স্বাদ নাও। সাদা রূপ ধারণ করো। ভেতরের কালিমা দূর করে সাদা হয়ে যাও।

শেকড়: একটু অন্য প্রসঙ্গে, আপনার এতোদিনের যে লালনচর্চা, এর মধ্য দিয়ে আপনি শিল্প আর দর্শন- লালনের গানের এই দু’টো বিষয়ের মধ্যে আপনি কোনটাকে বড় করে দেখেন?

ফরিদা পারভীন: দু’টোই এবং একসাথে।

শেকড়: লালনতো তাঁর দর্শন প্রচারের জন্য শিল্পকে বেছে নিয়েছেন…

ফরিদা পারভীন : আর আমরা তাঁর শিল্প, তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে দর্শনের কাছে পৌঁছাবো।

শেকড় : আমরা যদি বলি লালনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে…, তার মানে কি? তাঁর শিল্প না তাঁর দর্শনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে?

ফরিদা পারভীন: তাঁর গানের কথা সুরের মাধ্যমেই তাঁর দর্শনে পৌঁছানো যায়। তাঁর দর্শনের কাছে যাওয়ার রাস্তাা তাঁর গান। ফলে একটা আরেকটার পরিপূরক।

শেকড় : আবার গানে ফিরে যাই। আখড়ায় যারা গান করেন, চর্চা করেন, তাঁদের গায়কী ভঙ্গী এক রকম। যেমন লাইলী বেগম, করিম সাঁই, সুনীলের গান। তাঁদের সাথে আপনার গানের ভঙ্গীর একটা পার্থক্য দেখা যায়। সেটা কেন?

ফরিদা পারভীন: লালনের যারা শিষ্য, যারা আখড়ার শিল্পী তাঁরা একতারা দিয়ে গান করেন। গুরুর কাছ থেকে শুনে শুনে শেখা। তাঁদের কণ্ঠ পরিশীলিত না। আমি তানপুরায় গলা সেধে চর্চা করে কণ্ঠটাকে ঐভাবে তৈরি করেছি। সে গলায় যখন ঐ গানটি এসেছে তখন একটুতো অন্যরকম হবেই।

শেকড়: আপনি কি মনে করেন এতে লালনের গানের যে মূল গায়কী ভঙ্গী তা নষ্ট হয়?

ফরিদা পারভীন: না, তা হচ্ছে না। কখনও যদি তাই মনে হয় তবে আমি বলবো এই মনে হওয়াটা ভুল। ভুল শিখেছি বা ভুল গাই তা কখনও মনে হয় না।

শেকড় : আপনার গায়কী ভঙ্গীর ব্যাপারে কেউ কখনও দ্বিমত পোষণ করেছেন কি না?

ফরিদা পারভীন : হ্যাঁ, তা করেছে। অনেকে বলেছে লালনের গানের আধুনিকায়ন করেছি আমি। কিন্তু এর একটাই জবাব। পরিশীলিত গলায় লালন গাইলে একটু পরিবর্তন হতেই পারে। কিন্তু এতে সুরের পদস্খলন হয়েছে তা আমি মনে করি না। যারা বিশুদ্ধতা নষ্ট করছি বলে ভাবছে তারাই আবার আমার গানটা গ্রহণ করছে।

শেকড়: স্বরলিপি করার ব্যাপারে কোনো উদ্য্গো কি এখানে নেওয়া হচ্ছে?

ফরিদা পারভীন: সেটাতো সেভাবে হচ্ছে না। আমার গায়কী নিয়ে কিছু কাজ হয়েছে। কিন্তু সেটা খুবই অল্প। তবে চেষ্টাটা হচ্ছে।

শেকড়: সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ?

ফরিদা পারভীন: এখনও নেওয়া হয় নি। যেখানে জাতীয়ভাবে লালন দিবসগুলো পর্যন্ত পালন করা হয় না, সেখানে এটা আশা করা যায় না। এই যে শিল্পকলা একাডেমী, তারা কি করছে? আজ পর্যন্ত তারা একটা শিল্পীও তৈরিকরতে পারে নি। অথচ কতো পরিকল্পনা, কতো হাঁকডাক।



>