বিড়ির কারখানায় শিশুশ্রম


বিড়ির কারখানায় শিশুশ্রম


গুলশান ঝুমুর : দরিদ্র এলাকায় সস্তা শ্রম আর কাঁচ্ামালের সহজলভ্যতার ছায়ায় বেড়ে উঠা বিড়ি কারখানাতে কোন প্রকার স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই যুগ যুগ ধরে কাজ করে যাচ্ছে বিড়ি শ্রমিক। অত্যন্ত ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা এই বিড়ি কারখানায় বেশির ভাগই নারী ও শিশু শ্রমিক। এছাড়াও রয়েছে বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী শ্রমিক। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কাজ করায় বিড়ি শ্রমিকরা মারাত্মকভাবে স্বাস্থঝুঁকিতে রয়েছে। ক্রমশঃ তারা আক্রান্ত হচ্ছে শ্বাসকষ্ট, এজমা, যক্ষা ও ফুসফুসের ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে। বিড়ির চাতালগুলোতে ডাস্ট কালেক্টর না থাকায় বিষাক্ত ডাস্ট ছড়িয়ে পড়ছে চারিপাশে, যা আশেপাশের মানুষ ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশির ভাগ বিড়ি কারখানাতে চাইল্ড কেয়ার না থাকায় নারী শ্রমিকরা তাদের খুব ছোট শিশু সন্তানদের সাথে নিয়েই কাজ করেন। যার ফলে এই বিষাক্ত পরিবেশে শিশুরা নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হয় এবং সেই সাথে সাথে তাদের নেশার অভ্যাসও তেরি হয়। দারিদ্র্যতার জালে বন্দী হয়ে হাজারো শিশু অমানবিকভাবে দিনের পর দিন সামান্য মুজুরিতে কাজ করে মুনাফা বাড়িয়ে চলেছে বাংলাদেশ বিড়ি শিল্পের।

কারখানায় নিয়োজিত ৬০-৬৫ ভাগ শ্রমিক শিশু। লালমনিরহাট জেলায় দেখা গেছে ২১ হাজার শ্রমিকের ভেতরে ১৫ হাজারই শিশু শ্রমিক যাদের বয়স ৪-থেকে ১৪ বছর। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ অনুসারে, বাংলাদেশের সরকার ২০১৩ সালে মোট ৩৮ টি র্কমক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে যেগুলো শিশু শ্রমিকের জন্য নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, বিড়ি ও তামাক এই তালিকায় চর্তুথ। অথচ বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গেছে এই নীতিমালা বাস্তবায়নে সরকার তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়নি। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত অন্য যেকোন শ্রমিকের তুলনায় কম মজুরি পান বিড়ি শিল্পের শ্রমিকরা আর শিশু শ্রমিকরাতো নামে মাত্র মজুরি পায়। বিড়ি ও জর্দা শিল্পে একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি যথাক্রমে ৩৫ এবং ৪৮ টাকা মাত্র। এক হাজার বিড়ির খোসা প্রস্তুত করার জন্য একজন শিশু শ্রমিকের পারিশ্রামিক কোনভাবেই ৭ থেকে ৮ টাকার বেশি হয় না। পর্যবেক্ষনে দেখা গেছে, শিশুরা সাধারনত বিড়ি তৈরির ৪টি ধাপ, যথাঃ (১) বিড়ির খালি ঠোস তৈরি, (২) খালি ঠোসে গুড়া তামাক ভরা, (৩) তামাক ভরা ঠোসে মাথা মোড়ানো এবং (৪) বিড়ির প্যাকেট তৈরির কাজে নিয়োজিত থাকে। শিশুরা সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত বিড়ি কারখানায় কাজ করে, এরপর বাড়িতে বিকেল ৪ থেকে ৯ টা পর্যন্ত কাজ করে।

বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত টানা কাজ করলে একজন শিশু শ্রমিক গড়ে সাড়ে চার হাজার ঠোস তৈরি করতে পারে। প্রতি হাজার ঠোস তৈরির মজুরি গড়ে ৭.৫০ টাকা। কারখানার চাহিদা পূরণ করার জন্য একজন শিশু শ্রমিককে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘন্টা পর্যন্ত টানা কাজ করতে হয়। কঠোর প্ররিশ্রমের বিনিময়ে এই সামান্য আয়ে তাদের জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণ যেখানে অসম্ভব সেখানে দূষিত পরিবেশে তারা প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছে জটিল নানা রোগে। শিশুরা অসুস্থ হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিভাবকরা স্থানীয় ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ ক্রয় করে তাদের খাওয়ায়। মাসে গড়ে চিকিৎসা বাবদ খরচ হয় ৩০-৪০ টাকা। আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় চিকিৎসা বাবদ খরচ হওয়া এই সামান্য টাকা তাদের জীবনে যাপনে অতিরিক্ত চাপ তৈার করে। বিড়ি কারখানায় র্কমরত বেশির ভাগ শিশুই স্কুলে যায়না। আর যারা যায় তারা ৫ম শ্রেণির বেশি পড়তে পারে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত জরিপ, ওয়েজ রেট অফ ওয়ার্কিং পুওর ইন বাংলাদেশ, ২০০৯-১০, এর তথ্যানুযায়ী, অন্য যেকোন পেশায় নিয়োজিত শ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি থেকে বিড়ি ও জদ্দ্র্া তৈরিতে নিয়োজিত শ্রমিকের গড় মজুরি অনেক কম। শিশুদের মজুরির চিত্র তো আরো ভয়াবহ! মাত্র ৩৫ টাকা! তবে কারখানাগুলোতে সপ্তাহের প্রকৃত কাজের উপর হিসাব করে একজন শিশু শ্রমিকের মজুরি বাবদ প্রাপ্ত মাসিক গড় আয় থেকে দৈনিক গড় আয় বের করলে শিশু মজুরির অমানবিক চিত্র সহজেই চোখে পড়ে। এই হিসেব অনুযায়ী, এই আয় মাত্র ১৮ টাকা! শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ অথচ এই ভবিষ্যৎ এর একটা অংশ দরিদ্রতার ঝড়ে কি অমানবিক ভাবে ঝরে যাচ্ছে? ১৮ টাকার জন্য শিশুর কোমল হাত সারাদিন বিষাক্ত পরিবেশে বিড়ি বানিয়ে চলছে।
লেখক : ডকুমেন্টেশন ও মনিটরিং কর্মকর্তা
ভয়েস, ঢাকা



>