ফকির লালন সাঁইজিকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করি


ফকির লালন সাঁইজিকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করি


সুস্মিতা চক্রবর্তী : কোনো দিন কেউ শুনেছেন বাউলদের মধ্যে ধর্ষণের মত যৌন নিপীড়নের ঘটনা! শোনেন নি হয়তো। কারণ ভেবেছেন কখনো? এত এত বাৎসরিক বাউলসমাবেশ-মেলা হয়। নারীপুরুষ দল বেঁধে একত্রে থাকেন। নাচগান করেন। কেউ কেউ নেশাও করেন। নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশা থাকে তবু সেখানে তেমন কোনো নারীনিপীড়নের ঘটনার কথা শোনা যায় না! অবাক হওয়ার মতই না! মূলধারার সমাজে এটা তো প্রায় অসম্ভব! অথচ তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘শিক্ষিত’ নন। পরম্পরাগত তাদের শিক্ষাসাধনার ধারা।

বাউলগুরু-সাধকেরা নিজ ধর্ম-সংস্কৃতি-রীতি মেনে ‘দেহসাধনা’ করেন। তারা দেহকে সবার আগে গুরুত্ব দেন৷ বিদ্যমান সমাজমূল্যবোধের বিপীরতে তাদের যৌনাচার-ধর্মাচার। যৌনতাকে ধর্মের মত মান্য করে তারা সাধনা করেন। মাছ ছাড়া অন্য আমিষ খান না। তাদের নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস রীতিনীতি রয়েছে। গুরুর হাতে হাত রেখে ‘যুগলভজা’ সাধকেরা হন ‘জ্যান্তে মরা প্রেম সাধনা’র মানুষ। কোনোরূপ ব্যক্তিগত মালিকানা-সম্পত্তির ধারণায় তারা বিশ্বাস করেন না। মনের মানুষের খোঁজে তারা গুরুর কাছে আত্মতত্ত্বের পাঠ নেন, নিজের কামকে প্রেমে রূপান্তরিত করার পাঠ নেন৷ পাঠ নেন দেহকে নিয়ন্ত্রণের নানা কলাকৌশল। গুরুমুখী বিদ্যায় দীক্ষিত-শিক্ষিত হন তারা। দেহ সাধনার গান তাদের সাধনমন্ত্র। বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাকে তারা অস্বীকার করেন। আটপৌরে নির্জন তপোভূমে তারা বাস করেন। অন্তর্লোককে আলোকিত করার সাধনা তাদের। নারীপুরুষের সম্মলিত সাধনা।

বিয়ে করতে হয় না তাদের, সন্তান উৎপাদনেও তারা বিরত থাকেন৷ পরের ছেলেমেয়েকে নিজের সন্তান বানানোর মত প্রেম তাদের৷ গুরু তার সাধকের কাছে ঈশ্বরতুল্য। দেহসাধন-বিদ্যায় পারদর্শী ও জ্ঞানী যারা তারা সেখানে গুরুরূপে অবতীর্ণ হন। গুরু হওয়া সহজ কর্ম নয়৷ সেখানেও দেহসাধনার নানা স্তর-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তবে একজন গুরু হন৷ গুরু তার শিক্ষায় শিষ্যকূলকে আলোকিত করে চলেন৷ এভাবেই বাউলগোষ্ঠী বেঁচে থাকেন পরম্পরাগত সাধনভজনসঙ্গীত-সংস্কৃতিতে।

প্রচলিত সমাজব্যবস্থার রীতিপ্রথায় তারা থাকেন না। সেখানে সাধকসাধিকা পরস্পরের প্রেমে আবদ্ধ থাকেন। স্বয়ং লালন সাঁইজির হাত ধরে জাতবর্ণের বৈষম্য ঘুচিয়ে বাউলেরা এ বঙ্গে সম্মিলিতভাবে সংহত হয়েছিলেন একদা। লালন সাঁই নারীজাতিকে সাধনায় অন্যরকম মর্যাদায় বসিয়েছেন৷ যদিও গুরু হওয়ার মত পদটি পুরুষের জন্যই বরাদ্দ তবু তুলনামূলকভাবে নারীরা অপরাপর সমাজ-সংস্কৃতি অপেক্ষা স্বাধীন মর্যাদা নিয়ে সেখানে অধিষ্ঠিত। নারী ছাড়া কোনো পুরুষ সেখানে গুরুপদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন না। তাই নারীর মর্যাদা-কদর বেশি। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর প্রতিষ্ঠিত কোনো ধর্মসংস্কৃতিই সম্ভবত নারীর ঋতুচক্রকে অন্যমাত্রায় আচরন দেয় নি! বিপরীতে এ বিষয়টিকে অপবিত্র বলেই জ্ঞান করেছে। অথচ লালন সাঁই নারীর ঋতুচক্র-কালকেই বাউলধারায় সাধন-ভজনের অন্যতম করেছেন৷ সমাজের সকল বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর দর্শনে-আচরনে শক্ত অবস্থান৷ কোনোরূপ সাম্প্রদায়িকতার স্থান বাউলদর্শন-সংস্কৃতিতে নাই।

আত্মানুসন্ধানে ব্যাকুল বাউলসাধকসাধিকারা যাবতীয় জাগতিকস্থূলতা ত্যাগে সহজমানুষ হওয়ার পথে আজীবন সাধনা চালান। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়’- এই ‘পাখির’ আসাযাওয়ার সাথে বোঝাপড়া করেই কাটিয়ে দেন তারা ‘গভীর নির্জন পথের’ ধর্মসাধনায়! এ হেন বাউল-ধারা-দর্শনের অন্যতম মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজির আজ তিরোধানের দিন৷ এই ধর্ষণসংস্কৃতি, ধর্ম-সাম্প্রদায়িক কট্টরতা, বৈষম্য, অন্যায়-দুর্নীতির বাড়াবাড়ির দেশে তাঁকে আজ শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। ওম শান্তি।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক । শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ।



>