লালন একজন আধ্যাত্মিক সাধু : ফকির আব্দুল গণি শাহ


লালন একজন আধ্যাত্মিক সাধু : ফকির আব্দুল গণি শাহ


পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রকৃত বাউলদের অবস্থা  সংক্ষীন, এমনকি নিজেদের পরিবারেও যেন কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। নিজেদের মত-পথ-তরিকার প্রতি সন্তানদেরও তেমন একটা আগ্রহী করে তুলতে পারেননি তাঁরা। প্রকৃতত সত্য  হলো ছেঁউড়িয়ায় লালন-তরিকার সাধনার ধারা ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু একটি ধারায় পরিণত হচ্ছে, গুরুবাদী সাধনার ধারা প্রায় বিলুপ্তির পথে। এই ধারায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসীদের একজন ছিলেন ফকির আব্দুল গণি শাহ। ক্ষোভ আর অভিমান নিয়ে ছেঁউড়িয়া ছাড়াও  নিজের ঘরে বসেই গুরুর সাধন-ভজন চালিয়ে যেতেন। ২০০৮ সালে তাঁর মৃতু  হয়। মধ্য কার্তিকের সন্ধ্যায় আকাশে পূর্ণ চাঁদ। আলো ঠিকরে পড়ছিল। গাছ-গাছালির ফাঁক-ফোকরে আলো আধাঁরির খেলা। আর বাঁশ বাগানের ওপার থেকে ভেসে আসছিল- ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে…’। কুষ্টিয়া শহরতলীর ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহ’র আখড়ার সামনে দিয়ে চলে গেছে পিচঢালা রাস্থা। আখড়ার প্রধান ফটকের উত্তর দিকে নেমে গেছে কাঁচা গলিপথ। বাঁশ বাগান আর গাছ-গাছালিতে ঢাকা গলিপথ পেরুলেই সেই সুরের উৎস, আব্দুল গণি শাহ’র বাড়ি।

বাড়ির একদিক কিছুটা অন্ধকার, অন্যদিকে আলো। জীর্ণ বেড়ার টিনের খোলামেলা ঘরে চৌকিতে বিছানা পেতে বসে আছেন গণি শাহ। হাতে তাঁর সাধের একতারা। পাকা লম্বা চুল-দাড়ি-গোঁফে ছাওয়া মুখমন্ডল। ঘোলাটে চোখে যেন আলোর ঝিলিক। নব্বই ছুঁতে চলেছে বয়সের কাঁটা। গায়ে সাদা ফতুয়া আর সাদা লুঙ্গি। প্রতিদিনের মতো তিনি গান গাইছিলেন। লালনের গান। আসলে এটা তাঁর  ̧গুরু ভজনা। ভক্ত পরিবেষ্টিত গণি শাহ তখন গাইছিলেন, “ক্ষম হে অপরাধ আমার এ ভব কারাগারে/ পার করো হে দয়াল চাঁদ আমারে”। “বুঝলা বাবা… গুরু ভজনা, গুরুরে না ভজলে তো পার হওয়া যাবে না। এই গানটার কথাই ধর।” আবার গাইলেন কলিগুলো। সুর থামিয়ে বললেন, “দুনিযাতে তো কারাগাে র আছি।

কারাগারের দরজা পার হওয়ার ক্ষমতা নেই। তাই দয়ালের কাছে, গুরুর কাছে মিনতি জানাচ্ছি, আমায় পার করো।” এই গানে লালন এইরকমই বোঝাতে চেয়েছেন। লালন অনুসারীরা মনে করেন এই ভবের নাট্যশালা থেকে তাঁদের পার হতে হবে লালনের মাধ্যমে। গণি শাহ বলেন, “লালন একজন আধ্যাত্মিক সাধু। একজন প্রকৃত ফকির। তিনি শুধু একজন সঙ্গীত রচয়িতা নন। ফকিরও। তিনি বলেন, “আমরা মনে করি লালন মানে গুরু। সঠিকভাবে সাধন-ভজন না করলে পুলছেরাত পার হওয়া যাবে না। তাই আমরা লালনের গান গাই, তাঁর আরাধনা করি।”

একটু উসকে দিতেই কথার মালা গাঁথেন গণি শাহ। তিনি বলেন, “ গুরু নিজেই বলেছেন, এসো দয়াল ভবের ঘাটে।” তিনি লালনের বিভিন্ন আধ্যাত্মিক গানের ব্যাখ্যা করলেন। বললেন, “স্রোষ্টাকে উদ্দেশ ̈ করে লালনের অনেক গান আছে। এই যেমন- ‘ডুবাইয়া ভাসাইতে পারো/ ভাসাইয়া কিনারা দাও আরো’। এরকম আরো অসংখ্য গান রয়েছে তাঁর। ‘খাঁচার ভিতর অচিন্ পাখি কম্নে আসে যায়’, ‘আমার এ ঘরখানায় কে বিরাজ করে, একদিন

দেখলাম না তারে’। অচিন পাখি কি আর এই ঘরখানাই বা কি- এটাই বুঝতে হবে।-এসব গান গেয়ে গেয়ে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “যেমন ধর- ‘নুহু নামে এক নবীওে ভাসালেন অকূল পাথারে/ আবার তারে মেহের করে আপনি লাগান কিনারে’। ‘নিজাম নামে বাটপার সেতো/ পাপেতে ডুবিয়া রইতো/ তার মনে সুমতি দিলে/ আলাহ, কুমতি তার গেল চলে/ আওলিয়া নাম খাতায় লিখলে…’।” গণি শাহ বললেন, লালন বোঝাতে চেয়েছেন নিজামের মতো ডাকাত আলাহ’র ইশারায় আওলিয়া হয়ে গেল, আর তোমরা সঠিক মানুষ হতে পারলে না। তিনি বললেন, লালন সবসময় তাঁর গান দিয়ে সমাজের অসঙ্গতি, অযথা হানাহানি দূর করতে চেয়েছেন। তিনি  সত্য -সুন্দরের পথে মানুষকে ধাবিত করতে চেয়েছেন। আর গণি শাহ তখন গেয়ে চলেছেন, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে….’।

আচ্ছা ‘বাউল’ বলতে আপনারা কি বোঝেন? আব্দুল গণি শাহ বললেন, “‘বা’ অথবা ‘বাউ’ অর্থ বাতাস, আর ‘উল’ অর্থ সম্মান। বাউল মানে ‘বাতাসের সম্মান’।” লালন এখানে কোন বাতাসের কথা বলেছেন? গণি শাহ’র জবাব, “প্রত্যেকের মধে ̈ বাতাস থাকে, হাওয়া থাকে।” বললাম, আরেকটু  স্পষ্ট করে বলেন। গণি শাহ এবার গান ধরলেন- ‘ধরো চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে/ সে কি সামান ̈ চোর ধরবি কোনা-কানছিতে?’ গণি থামলেন। বললেন, “এই হাওয়া বা বাতাস হচ্ছে স্রষ্টা। মানুষের মধ্যেই স্রষ্টা বিরাজ করে।

সেই স্রষ্টাকে ধরার জন ̈, স্রষ্টাকে পাবার জন ̈ বা তাঁর নৈকট ̈ লাভের জন্য চেষ্টা করতে হয়, সাধনা করতে হয়। সে তো সামান্য নয়। তাই স্রষ্টাকে পেতে হলে কষ্ট করতে হবে। সাধন-ভজন করতে হবে। আর বাউলরা সেই বাতাসের সন্ধানকারী, স্রষ্টার সন্ধানকারী।” গণি শাহ এ প্রসঙ্গে আবার গাইলেন- ‘পাতাল চোরের বহর দেখাই আসমানের উপর/ তিন তারে হচ্ছে খবর/ শুভ শুভ যোগমতে’। ‘তিন তারের ব্যাখ্যা কি সবসময় দেওয়া যায়? তিনি বললেন, “না দিলেই বোঝা যায়। বুঝতে হলে গুরু ধরতে হয়। একদিনে এতো জানা যাবে না। সাধুদের কাছে আরো ঘোরেন। তারপর জানতে পাবেন।”

জিজ্ঞেস করলাম, বাউল ধর্মে দীক্ষিত হতে হলে বা লালনের অনুসারী হতে হলে কি করতে হবে? বয়সের ভারে ন্যুজ্ব গণি শাহ যেন ক্ষেপে গেলেন। সাদা চুল-দাড়ি ঝাকিয়ে বিস্ফোরিত চোখে বললেন, “বাউল হওয়া? লালনের শিষ্য হওয়া এতো সহজ না। সকলে এসব পারে না। কঠিন, খুব কঠিন।” যেন একটু নরম হলেন। বললেন, “এই দ্যাখেন লালন নিজেই বলে গেছেন- ‘তোরা আয় না মনে খাঁটি হয়ে/ ধাক্কায় যেন যাসনে চোটে ফেটে/ কে যাবি গৌর প্রেমের হাটে?’” পাশ থেকে সাদা চুল-দাড়ির ফকির আজিম উদ্দিন বলে উঠলেন, “২০ বছর পে ড় আছি। এখনো ‘বানিক শিক্ষা’ পাইনি।” গণি শাহ’র গলায় যেন আক্ষেপ, “এই লাইনে ৪০ বছর কেটে গেল, তবুও কিছুই শিখতে পারি নি।” আচ্ছা, বাউল ধর্মে খেলাফতটা কি? গণি শাহ আবার রাগলেন। বললেন, “এতো বাতনিক কথা (অতি গোপন কথা)। এসব বলা যাবে না।” তারপর আস্তে  করে বললেন, “বাউল ধর্মে খেলাফতটাই আসল। ঘুরে ঘুরে ‘মুরিদ’ হওয়া যায়। কিন্তু খেলাফত পাওয়া খুব সহজ নয়।

অনেকে ২০/২৫ বছর সাধন-ভজন করে খেলাফত লাভ করে। খেলাফত বাউল ধর্মের একটি উচ্চ ̄স্তর। খেলাফত লাভ না করতে পারলে বাউল ধর্মে যোগদান বৃথা। এর জন্য আগে গুরু ধরতে হয়। মুরিদ

হতে হয়। তারপর দীর্ঘদিন সাধনা করতে হয়। খেলাফতের জন্য সাধনার মধে ̈ থাকতে হয়।

খেলাফত দয়ালের নৈকট ̈ লাভের প্রধান দরজা। খেলাফত নিয়ে ধীরে ধীরে সে পথে এগোতে হয়।” বললেন, “৫০ বছরের বেশি এই লাইনে ঢুকেছি। আর গুরু আমাকে খেলাফত দিয়েছেন ২৮ বছর আগে।”

অনেকেই মনে করেন বাউলরা সংসারত্যাগী। পথে পথে ঘোরে। কিন্তু আব্দুল শাহ সংসারী মানুষ। তিনি বলেন, “প্রকৃত বাউল সংসারত্যাগী হবে কেন? সংসারের মধ্যে দিয়েই তো ধর্ম পালন করতে হবে। স্বামী-স্ত্রী একসাথে। সঙ্গী ছাড়া বাউল ধর্ম হবে না। সঙ্গীকে নিয়েই তো রিপু নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। “ভাতের থালা সামনে থাকবে, খেতে পারবে না। আর খাওয়া…, বললেই হবে না, খাওয়া শিখতে হবে। আমরা খাওয়া না শিখেই বিপদে পড়েছি।

সাঁইজি যদি কৃপা করে উদ্ধার করেন তাহলেই উদ্ধার হবো।” তিনি বললেন, “সংসারর মধ্যে ‘সার’ বা বস্তু আছে। আমরা ‘সার’র খোঁজ না করে ‘সং’ সাজি। বাউলের নামে সংসার ছেড়ে দেওয়া ঠিক না। তবে দয়াল ধরবার অনেক পথ আছে। ওরাও হয়তো কোনো পথে যাচ্ছে।”

জানতে চাইলাম, আপনি কি কোনো গান বেঁধেছেন? গণি শাহ’র জবাব, “না, না, নিজে গান লেখা যাবে না।গুরুর উপর মাতব্বরি চলবে না। লালন তো কোনো জায়গা ফাঁকা রেখে যান নি। লালনের প্রকৃত শিষ ̈রা গান লেখে না। কিন্তু অনেকে গান বেঁধেছে। সে গানের মধে ̈ লালনের কথাই ঘুরে ফিরে এসেছে। মেটে আলু আর বিলেতি আলু সমান করা যায় না। লালন হচ্ছেন বিলেতি আলু।”

ফকির গণি শাহ যেন ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন। অনেক কথা বলেছেন। অনেক গান গেয়েছেন। রাত বাড়ছে। তাঁর জন্য ভাত নিয়ে অপেক্ষা করছেন ৭০ বছর বয়সী স্ত্রী কুলসুম। তাঁর চোখই বলে দিচ্ছে কথা থামানো দরকার। এক শিষ্য শেষ করতে অনুরোও করলেন। শেষ করা দরকার আজকের মতো। তাই আরেকটি বিষয় খুব জানতে ইচ্ছে করছিল। প্রাসঙ্গিকও। লালন সম্পর্কে এই অল্প সময়ে কিছুই জানা যায় না। শেষে বললাম, আপনি যে সুরে, যে ঢঙে লালনের গান গাইছেন, অনেকেইতো এভাবে গায় না। গণি শাহ আক্ষেপের সাথে বললেন, “লালনের গানের সুর বিকৃত করা হচ্ছে। ভুল শব্দ বলা হচ্ছে। আজকাল অনেকেই নিজের  মতো গান গাইছে যাতে মানুষের মনে ধরে। বাণিজ্যিক কারণে এসব করা হচ্ছে। লালনকে ভাঙিয়ে কামাবার জন্য। লালনের গানের প্রকৃত সুর ওরকম নয়।” তিনি একজন জনপ্রিয় লালন সঙ্গীত শিল্পীর প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, “উনি ভুল গান। যেমন একটি গান আছে- ‘ভবে মানুষ গুরুর নিষ্ঠা যার/ সর্বসাধন সিদ্ধি হয় তার’। কিন্তু ঐ শিল্পী গান- ‘ভবে মানুষ গুরুর নিষ্ঠা যার/ সর্বসাধন সিদ্ধ হয় তার’। ‘সিদ্ধি’কে তিনি ‘সিদ্ধ’ গাইছেন।” আরেকটি গানের কথা উলেখ করে গণি শাহ বলেন, “‘ইমান ধন আখেরে পুঁজি/ সে ঘরে দিলে না কুঞ্জি’। কিন্তু ঐ শিল্পী গান- ‘ইমান ধন আখেরে পুঁজি/ সে ঘরে দিলে না কুঞ্চি’। ‘কুঞ্জি’কে ঐ শিল্পী ‘কুঞ্চি’ বানিয়ে ফেলেছেন।”

গণি শাহ যখন লালনের গান বিকৃতি নিয়ে এসব বলছিলেন তখনো পাশের লালন আখড়া চত্বর থেকে ভেসে আসছিল গানের সুর। গণি শাহ থামতে চান। তিনি এখন আর লালনের নআখড়ায় যান না। ভেতরে তাঁর চাপা ক্ষোভ। তাই নিজের ঘরেই আসর বসান। নিজেই গান করেন। ব্যাখ্যা করেন। শিষ্যদের বোঝান। বোঝান আমার মতো অন্যদেরও। তিনি লালনের শিষ্য মলম শাহ’র শিষ্য। আর গান শিখেছেন ফকির ইসমাইল শাহ’র কাছে। শুনে শুনেই। তিনি লেখাপড়া জানেন না। কিন্তু চর্চা আছে তাঁর। লালন এবং তাঁর গান সম্পর্কে বিস্তর জানেন। স্ত্রী কুলসুমও একই পথের মানুষ।



>