লালন আখড়ার বিবর্তন


লালন আখড়ার বিবর্তন


সঞ্জয় চাকী : লালন শাহ। বাউল সম্রাট। লালনের গান মানুষকে টানে। টানে লালনের আখড়া বা মাজারও। লালনের পূণ্যভূমি দর্শন করে ধন্য হন অনেকে। তাই মানুষ কোন উদাসী টানে ছুটে আসে লালনের সমাধিসৌধে। দূর-দূরান্ত থেকে। দেশ-বিদেশ থেকে।

বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা কুষ্টিয়া। যাকে বলা হয় দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। কুষ্টিয়া শহরতলীতেই ছেঁউড়িয়া। লালন ভূমি। কুমারখালী থানার শেষপ্রান্তে মরা কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে এই ছেঁউড়িয়াতেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ফকির লালন শাহ এবং তাঁর শিষ্যরা। এখানেই লালন কাটিয়েছেন তার দীর্ঘজীবন। রচনা করেছেন সহস্রাধিক বাউল গান যা লালন সঙ্গীত নামে প্রচলিত। বিখ্যাত। কুষ্টিয়া জেলা শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে ছেঁউড়িয়ায় লালন সমাধিসৌধ পর্যন্ত দিন-রাত রিক্সা ও ভ্যান চলে। অল্প সময়েই পৌঁছে যাওয়া যায় সেখানে।

লালনভক্ত ফকির মলম শাহ লালনকে ছেঁউড়িয়ায় সাড়ে ১৬ বিঘা জমি দান করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের এই জমির জন্য যাতে ‘কর’ না দিতে হয় তার ব্যবস্থা করেছিলেন। এই জমির অর্ধেকের উপর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে লালনের আখড়া। সেসময় এখানে লালনচর্চা হতো ভক্তদের মাধ্যমে, শিষ্যদের মাধ্যমে। প্রথম দিকে চারদিকে বারান্দাসহ একটি পূবদুয়ারী চারচালা বড় খড়ের ঘরে শিষ্য ও ভক্তদের নিয়ে বসতেন লালন। পরে তিনি গোলাকৃতির একটি বড় ঘরে থাকতেন। এখানেই চলতো গান রচনা-গাওয়া, সাধন-ভজন। গড়ে উঠেছিল আলাদা একটি সম্প্রদায় যারা প্রচলিত অর্থে হিন্দু-মুসলমান কোনো ধর্মেরই সরাসরি অনুসারী ছিলেন না, ছিলেন মানবতাবাদী – বাউল সম্প্রদায়। সাধন-ভজনের মাধ্যমে স্রষ্টাকে পাওয়ার পথ অবলম্বন করতেন তাঁরা।

১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর (১ কার্তিক ১২৯৭ বঙ্গাব্দ) মৃত্যুর পর এখানেই লালনকে সমাধিস্থ করা হয়। এক সময় এলাকাটি গাছ-গাছালিতে ছাওয়া ছিল। কিন্তু এখন আর সেই পরিবেশ নেই। লালনের সময়ে তিনি থাকতেন খড়ের ঘরে। লালনের গানের চর্চাও হতো এই ঘর কেন্দ্রিক। দিনে দিনে লালনের গানের যেমন বি¯তৃতি ঘটেছে দেশে-বিদেশে, পরিচিতি বেড়েছে, তেমনি লালনের সমাধিসৌধেরও বিবর্তন ঘটেছে, বিবর্তন ঘটেছে লালন চর্চায়ও।

লালনের মৃত্যুর অনেক দিন পরও তাঁর সমাধিটি কাঁচাই ছিল। শীতল শাহ ও ভোলাই শাহর চেষ্টায় চুন-সুরকি দিয়ে প্রথম সমাধিটি পাকা করা হয়। কিন্তু ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে বজ্রপাতে এর ডান দিক ভেঙে পড়ে। ১৯৪৯ সালে লালন শাহ আখড়া কমিটির পক্ষে লালনের প্র-শিষ্য কোকিল শাহ ও ইসমাইল শাহর চেষ্টায় ভেঙে যাওয়া সমাধিসৌধটি আবারও ভেঙে নতুন করে তৈরির কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু অর্থাভাবে তা শেষ হয় নি। মোহিনী মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেবীপ্রসাদ চক্রবর্তী (কানু বাবু) উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা ভেস্তে যায়।

এরপর লালন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান আমলে। লালনের জীবদ্দশায় যা ছিল তাঁর আখড়া, মৃত্যুর পর ১৯৬৩ সালে সরকারি উদ্যোগে তাকে পরিণত করা হয় লালনের মাজারে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আব্দুল মোনায়েম খাঁ ১৩৭০ বঙ্গাব্দের ১৩ আশ্বিন বর্তমান লালন মাজারটি উদ্বোধন করেন। দিল্লির প্রখ্যাত সাধক হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার (রঃ) মক্বরার আদলে নির্মিত হয় সুদৃশ্য লালন সমাধিসৌধ। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে কিছুটা হেঁটে লালন শাহ ও তাঁর সাধনসঙ্গী মতিজান বিবি’র সমাধিস্থল বা মূল মাজার ভবন। চারপাশে তাঁর শিষ্যদের সমাধি। এর পিছনেই গড়ে তোলা হয় লোকসাহিত্য কেন্দ্র ও জাদুঘর।

তবে ২০০০ সালে মাজার এলাকা সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমান চেহারা নেয়। লালন একাডেমী কমপ্লেক্সের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়। সেই অর্থে সমাধিসৌধের আশেপাশের পরিবেশ পাল্টে যায়। পুরো এলাকার অধিকাংশ গাছ কেটে ফেলা হয়। ১৯৬৩ সালে গড়ে ওঠা একতলা লোকসাহিত্য কেন্দ্রটিও আর নেই। মাজারের ঠিক পিছন দিকে গড়ে উঠেছে ৬০০ আসন বিশিষ্ট আধুনিক অডিটোরিয়াম। এর নিচে রয়েছে বাউলদের জন্য খোলা চত্বর যেখানে প্রতিদিন গানের আসর বসে। এর উত্তর দিকে গড়ে উঠেছে চারতলা ভবন। এখানে রয়েছে জাদুঘর, লাইব্রেরি, সঙ্গীত বিদ্যালয়; আরও রয়েছে লালন একাডেমীর প্রশাসনিক কাজ চালানোর ব্যবস্থা। প্রধান ফটকে দাঁড়ালে সমাধিসৌধ ছাড়িয়ে পিছনের ভবন দুটো আগে চোখে পড়ে। গত কয়েক বছর ধরে নদী ভরাট করা স্থানে মাটির মঞ্চ তৈরি করে পালিত হচ্ছে লালনের মৃত্যু বার্ষিকী ও দোল পূর্ণিমা তিথির অনুষ্ঠান।

২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে বর্তমান কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ শুরু হলে নির্মাণস্থল নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ঢাকাসহ সারা দেশে আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের দাবী ছিল মাজার সংলগ্ন নয়, মূল মাজার এলাকার বাইরে সামনের কালীগঙ্গা নদীর ভরাট করা স্থানে কমপ্লেক্সের প্রধান দুটি ভবন নির্মাণ করা হোক। তবে আন্দোলন দাঁড়াতে পারে নি। লালনের মাজারকে কেন্দ্র করে সরকার বড় অনুদান দেওয়ায় অনেকেই খুশি হন। কুষ্টিয়াবাসীর অধিকাংশই যেন গর্বিত এতে।

কিন্তু পাশাপাশি আরেকটি বিষয় অনেকের মনেই বেদনার উদ্রেগ করেছে। লালন মাজারে এখন আর সেই লালন তরিকার প্রকৃত বাউলদের আনাগোনা নেই। অনেক দর্শনার্থীর অভিযোগ – ছেঁউড়িয়ায় গেলে গান শোনানোর শিল্পী পাওয়া যায়, বাউল পাওয়া যায় না। লালন সম্পর্কে বা লালনের গান ব্যাখ্যা করে শোনাবার তেমন লোক মেলে না। আধুনিক অনেক শিল্পীর কল্যাণে লালন সঙ্গীতের, বিশেষ করে শহুরে, ভক্তের সংখ্যা বাড়লেও প্রকৃত বাউলের সংখ্যা কমছে। লালনের দর্শন বোঝার আগ্রহ ও ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে ভক্তদের মাঝ থেকে। লালন-দর্শনে ঋদ্ধ হতে চাইতে এসে হতাশ হচ্ছেন অনেক প্রকৃত ভক্ত-অনুরাগী।

সাধনা বিলুপ্তির পথে: ছেঁউড়িয়ায় লালন-তরিকার সাধনার ধারার আর্থ-সামাজিক ধারা হিসেবে নির্জীব, ক্ষয়িষ্ণু একটা ধারায় পরিণত হয়েছে। দেহসাধক-তরিকার দিক থেকে দেখলে ছেঁউড়িয়ায় এখন ‘গুরু’ বলে স্বীকৃত মানুষ আছেন মাত্র দুই জন। এঁরাও আবার একেবারে হতদরিদ্র এবং সামাজিকভাবে ধ্বস্ত। এমনকি নিজেদের বৃহত্তর, যৌথ পরিবার-কাঠামোতেও এঁদের তেমন শ্রদ্ধার আসন নেই। পরিবারের লোকেরাও কেউ তাঁদের মত-পথ-তরিকার প্রতি আগ্রহী নন। ফলে, এই ধারার নবায়ন ঘটানোর মতো কোনো চিন্তা করা বা কর্মতৎপরতার উদ্যোগ-আয়োজন করার মতো অবস্থাও এঁদের নাই। এঁদের যাঁরা শিষ্য আছেন, তাঁরা কেউ নিজেরা ‘গুরু’ পর্যায়ের না। গানের পেশাকে কেন্দ্র করেই তাঁদের জীবিকা। সাধনা-পরম্পরার প্রাণ-প্রাচুর্য ও সজীবতাকে যেকোনো কারণেই হোক এঁরা বেগবান করে তুলতে পারছেন না। ফলত, গুরুবাদী সাধনার ধারা এখানে বলতে গেলে বিলুপ্তির পথে।



>