লালন-গীতির দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা


লালন-গীতির দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা


ডক্টর বেগম জাহার আরা : লালন-গীতির মূল উৎসই ভক্তি, গানের প্রতি ছত্রে প্রকাশিত বক্তব্যের মধ্যেই বিধৃত আছে লালনের দর্শন ও তাঁর অধ্যাত্ম-চিন্তার ফসল। লালনের জন্ম, ঠিকানা ইত্যাদি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও প্রাপ্ত লালন-গীতির বিপুল সম্ভার আমাদের উপহার দিয়েছে কবি লালনের অকপট সত্তা। তাই মানুষ-লালনের ঠিকানা দূরবর্তী হলেও লালন-গীতির প্রসন্ন সান্নিধ্যে কবি লালন, সাধক লালন, মরমী লালন ও দার্শনিক লালনকে আমরা একান্তে পাই। লালন-গীতির দর্শনে মরমী কবির অস্তিত্ব অত্যন্ত স্পষ্ট। তারই ভিত্তিতে সঙ্গীত স্রষ্টা-লালনকে আমরা বিচার বিশ্লেষণের সুযোগ পাই।

আমরা সবাই জানি কবি লালনের একটা দর্শন ছিল। দর্শন কখার সাধারণ তাৎপর্য জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ। এই জ্ঞানানুরাগ বা অনুসন্ধিৎসার কারণেই লালন তাঁর জীবনের স্বরূপ ও জীবনের মৌলিক মূল্য নিরূপণের চেষ্টা করেছিলেন। এক বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে মানব জীবনের সমস্যা অনুধাবন করে জগৎ ও জীবন সম্পর্কে গভীরতর উপলব্ধিতে ডুব দিতে পেরেছিলেন। সেখানে মানুষের একটি পরিচয়ই তাঁর কাছে সার রূপে ধরা দিয়েছে – তা হলো, মানুষের মানুষ-পরিচয়। পুথির মাধ্যমে মানুষের এই পরিচয় তিনি পান নি, মানুষকে দেখেছেন তিনি আপনার পরিবেশ-বলয় থেকে। লোকায়ত জীবন ছিল তাঁর আপনার জগৎ। তাই জাতি-ধর্ম, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে মানুষের এই মহান পরিচয়, যা তিনি বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দিনে দিনে আবিষ্কার করেছেন, তাকে শীর্ষ চিন্তায় স্থায়ী আসন দিয়েছেন। আর ঐ অভিজ্ঞতার আলোকেই বিশ্ব-মানবের তথঅ বিশ্ব-মানবতার সর্বজনীন ধারণায় উপনীত হতে পেরেছেন। এই স্বচ্ছবোধই লালন-গীতির দর্শন। কবি বলেন-

    ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।

    লালন বলে জাতির কি রূপ দেখলাম না দুই নজরে।।’

    ‘কেউ মালা কেউ তস্বি গলে

তাইতে কি জাত ভিন্ন বলে

আসা কিংবা যাবার কালে

জাতি তখন রয় কারে।।’

মহাজ্ঞানী মহাসাধকদের দর্শন ও মত বড় উদার। একথা সত্য যে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্যকে উপলব্ধি করার সাধনাই দর্শন। ব্যক্তি-চিন্তায় সমাজ, ধর্ম ও পরিবেশের শক্তিশালী প্রভাব থাকে। তাই মনে হয়, জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণ থেকে প্রচণ্ড ভোগান্তির মধ্য দিয়ে জীবনের চেতনায় ফিরে এসেছিলেন বলেই লালন হয়তো ধর্ম-সত্যের চেয়ে মানবতা ও হৃদয়-ধর্মের শক্তির প্রতি বেশী অনুরাগী হন। সবাইকে ভালবাসতে শেখেন, বিচিত্র সৃষ্টির মধ্যে তিনি ঈশ্বরকে অনুভব করতে চেষ্টা করেন। তবে সর্বেশ্বরবাদীদের মতো ব্যাপক তাঁর দর্শন ও ঈশ্বরচেতনা। কাজেই তাঁর মতে-

    ‘ভক্তের দ্বারা বাঁধা আছেন সাঁই।

    হিন্দু কি জবন বলে জাতির বিচার নাই।।’

কারো কারো মতে এমন উদার দার্শনিক মনোভাবের জন্যেই হয়তো বিভিন্ন ধর্শের মতবাদ ও সাধনার ধারাকে মিলিত চিন্তায় ধারণ করতে চেয়েছেলেন লালন। তাঁর শিক্ষা কোন্ পদ্ধতিতে কতদূর হয়েছিল, তা না জানলেও লালন-গীতির মাধ্যমেই আমরা দেখতে পাই – ইসলামের সৃষ্টিতত্ত্ব, হিন্দুদের ব্রহ্মতত্ত্ব, অবতারবাদ, জন্মান্তরবাদ ও নির্বাণ-বৌদ্ধধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে তাঁর পরিচ্ছন্ন ও ব্যাপ্ত জ্ঞান ছিল। তবে তিনি ইসলামের সৃষ্টিতত্ত্ব স্বীকার করেছেন অকৃপণভাবে এবং মুসলিম দর্শন সম্পৃক্ত বক্তব্যই তাঁর গানে বেশী পাওয়া যায়। তিনি বলেন-

    ‘এলাহি আলামিন গো আল্লাহ

         বাদশাহ আলামপানা তুমি।

    …..

    নবী না মানে যারা, মোয়াহেদ কাফের তারা।’

অন্য গানে দেখা যায়-

         ‘নবীর অঙ্গে জগৎ পয়দা হয়।

         সেই যে আকার কি হলো তার, কে করে নির্ণয়।।’

কিংবা-        ‘নবী না চিনে কি আল্লাহ পাবে।

         নবী দীনের চাঁদ আজ দেখনারে ভেবে।।’

অথবা-        ‘মুখে পড়রে সদাই লা-ইলাহা-ইল্লাল্লা।

         আইন ভেজিলেন রাছুলউল্লা।।’

    অর্থ্যাৎ ইসলাম-দর্শনের মূল কথাগুলো লালন স্বীকারই শুধু নয়, প্রগাঢ়ভাবে উপলব্ধি করেছেন, বিশ্বাস করেছেন। এ দর্শনের মতে সৃষ্টি, স্রষ্টা ও মানবাত্মা এক নিবিড় যোগসূত্রে গ্রথিত। মুসলিম-দর্শন কোরান-হাদিস অর্থ্যাৎ ইসলাম ধর্মকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। আর এ ধর্মের প্রতি লালন পরম বিনয়ী ও অনুরাগী। তিনি কোরানের গূঢ় অর্থ পেশ করেছেন তাঁর গানে। তিনি বলেন-

         ‘আলিফ আর লাম-মিমেতে।

         কোরান তামাম শোধ লিখিতে।।

             আলিফ আল্লাজী, মিম মানে নবী,

             লামের হয় দুই মানে, এক মানে শরায় প্রচার,

             আর মানে মারফতে।।’

কিংবা-        ‘আলিফ লঅম মিম আহাদ নূরী।

         তিন হরফের মর্ম ভারী।।

             আলিফে হয় আল্লা হাদী

             মিমেতে নূর মুহম্মদী

             লামের মানে কেউ করলে না

             নূক্তা বুঝি হলো চুরি।।’

আলিফ বা আল্লাই যে এ বিশ্বপ্রকৃতির নিয়ন্তা এবং সেই নিয়ন্তার স্বরূপ জেনার জন্যে তাঁরই জ্যোতিতে উদ্ভাসিত ও সর্বগুণে অলংকৃত মুহম্মদরূপী নবীকে চিনতে হবে ও তাঁর নীতি মানতে হবে, এ সত্যে লালন ছিলেন অটল। সেই সত্য ও শাশ্বত গুরুর নীতি-নির্দেশ মেনে তাঁর প্রতি পবিত্রতার ভক্তি বজায় রেখে তাঁকে পরমগুরু জ্ঞান করে জগৎ ও জীবনের গভীরতর অর্থ সন্ধান করতে হবে – এই ছিল লালনের বোধি ও দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি বলেন-

         ‘কোথায় রইল হে, ওহে দয়াল কাণ্ডারী।

         এ ভব-তরঙ্গে আমার, আমারে দাও চরণতরী।।’

কিংবা-        ‘পাপ-পূণ্য যতই করি, ভরসা কেবল তোমারই,

         তুমি যারে হও কাণ্ডারী, ভব বয় তার যায় ছুটে।।’

অথবা-        ‘গুরু সুভাব দাও আমার মনে।

         তোমার চরণ যেন ভুলিনে।।’

সেই পরম বোধ যাঁর জ্যোতিতে হযরত নবী করীমেরে জন্ম, তাঁর আচরণ, দর্শন মেনে চলতে পারলেই মোক্ষ লাভ সম্ভব, মুক্তি – এমন ভাবধারার লালন-গীতি প্রচুর আছে। আমরা জানি ইসলামী দর্শনের আওতায় ইসলাম ধর্মতত্ত্বের দুটো রূপ আছে, এক – প্রাকৃতিক বা বিচারসম্মত ধর্মতত্ত্ব, যাকে বলা হয় … বা …., দুই – প্রত্যাদিষ্ট ধর্মতত্ত্ব বা …..। প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব হচ্ছে বর্হিজগৎ এবং মানবাত্মার প্রকৃতি লক্ষ্য করে পরম সত্তার অস্তিত্ব ও স্বরূপ সম্বন্ধে গবেষণা করা বা চিন্তা করা। অন্যদিকে প্রত্যাদিষ্ট ধর্মতত্ত্ব হলো মহাপুরুষদের মাধ্যমে প্রচারিত ঐশী প্রত্যাদেশ। ইসলামী মতে একে বলা হয় ওহী।

স্বীকার্য যে, মুসলিম ধর্মতত্ত্ বলতে হযরত মুহম্মদ (সাঃ) প্রচারিত ধর্মকে বোঝায়। এ ধর্মতত্ত্বে খোদার স্বরূপ, জগৎ ও মানুষের সঙ্গে পরম সত্তার সম্পর্ক – সবই আলোচ্য। তাই বলা যায়, মুসলিম দর্শন ও মুসলিম ধর্মতত্ত্বের বিষয়বস্তু এক। উভয়েরই মূলে আছে সত্য-সন্ধান-বাসনা। লালনের গানে আমরা দুটো জিনিসই পাই।

উল্লেখ্য যে, মুসলিম ধর্মতত্ত্ব ও মুসলিম দর্শনের বিষয়বস্তু এক হলেও এদের গতিপথ ভিন্ন। দর্শন যুক্তির প্রাবল্যে ও আবেগহীন বিচারে বলিষ্ঠ, অন্যদিকে ধর্মতত্ত্ব বিশ্বাস ও অনুভূতির তীব্রতায় মহিমামণ্ডিত। লালনের গানে বিশ্বাস, উপলব্ধি ও অনুভূতি যেখানে গাঢ়তর হয়েছে, সেখানে কবি হয়েছেন ভাবুক, আধ্যাত্মিক চেতনায় মগ্ন। দেহের মধ্যে তিনি অরূপ রতনকে পেয়েছেন সেখানে।

এই অরূপ রতনের গাঢ়বন্ধবোধই লালনের অধ্যাত্মচেতনা। ভাবের পরিমণ্ডলে সেই অরূপকে তিনি অনুভব করতে চেয়েছেন নানাভাবে। তিনি বলেছেন-

         ‘সাধ্য কিরে আমার সেরূপ দেখিতে।

         অহোনিশি মায়া ঠুসি জ্ঞান-চোখেতে।।’

অর্থ্যাৎ হৃদয়ের গহনে সেই অরূপ রতন আছে জেনেও লালনের তৃষ্ণা সদা কষ্টকর। তিনি আরো কাছে থেকে দেখতে চান তাঁকে। তিনি বলেন-

         ‘না জানি কেমন রূপ সে।’

লালন বিস্ময়ে অভিভুত হন এই ভেবে যে, এত কাছে যিনি থাকেন, এত দেহ-সম্পৃক্ত যাঁর উপলব্ধি, তাঁকে কেন আকার বা সাকারে অনুভব করা যাবে না? তাঁর ধারণা  – ‘লামে আলিফ লুকায় যেমন, মানুষে সাঁই আছে তেমন’। সেই পরম অরূপ যে তাঁর সবচেয়ে কাছের বস্তু, এ ব্যাপারে লালনের দ্বিধা বা সংশয় নেই। তিনি বিলাপ করে তবু বলেন – ‘আমি একদিনও না দেখিলাম তারে, বাড়ীর কাছে আরশী নগর, পড়শী বসত করে’।

মরমী লালনের সেই অরূপ রতন পরম সত্তার খণ্ডরূপে দেহের মাঝেই বাস করে। তাঁকে জানার সাধনাই শ্রেষ্ঠ সাধনা। কারণ তাঁকে চিনলে পরমকে চেনা যায়। আচরণীয় জগতের মাঝে বাস করেও মুর্শিদ-ভজলে আত্মকে তথা ‘মূল ছাড়া সেই পরম ফুলকে’ জানা যায় না – এ অধ্যাত্ম কথা লালন-গীতিতে স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে বারবার। আত্মকে জানার ব্যাপারে তিনি বলেছেন – ‘আমি কি তাই জানলে সাধন সিদ্ধ হয়’। এ আধ্যাত্মিক বাণীল সঙ্গে – ‘আত্মনং বিদ্ধি’ কিংবা ‘নো দাইসেল্ফ’ কথার কোনো পার্থক্য নেই। আর এই আত্মকে জানলে সেই অখণ্ড আত্মার প্রচণ্ড জ্যোতি সম্পর্কে যে বোধি জন্মায়, তা মারেফাতের সর্বোচ্চ স্তর, যেখানে মনসুর হাল্লাজ প্রবেশ করেই উন্মাদ হয়ে বলেছিলেন – ‘আমি সত্য’। আত্ম সেখানে শুধু আবিকৃত নয়, পরমাত্মার সঙ্গে মিশ্রিত। এ বিস্ময়কর দুর্গম বোধিতে পৌঁছানোর জন্যে লালন বলেন- ‘জানা যাবে মারেফতে, যদি মনের বিকার যায়’।

লালন-গীতির অধ্যাত্মচিন্তার বিচার প্রসঙ্গেই প্রশ্ন তোলা যায় – নিষ্কাম জগতের সেই দুর্গম বোধিতে কি লালন পৌঁছুতে পেরেছিলেন? তাঁর কি মনের বিকার বা স্বজ্ঞান-সত্তা বিলুপ্ত হয়েছিল? আত্মকে জানা সম্পন্ন হয়েছিল? যদি না হয়ে থাকে, তা হলে আধ্যাত্মিকতার কোন্ স্তরে তিনি বাস করতেন? নিঃসন্দেহে বলা যায়, মনোময় জগতের পুষ্পিত পরিমণ্ডলে প্রবেশ করেও বিশ্বাস আর অনুভূতির প্রগাঢ় আচ্ছন্নতায় তিনি কখনো পুরোপুরি নিমজ্জিত হতে পারেন নি। এই না পারার কারণ তাঁর দার্শনিক সত্তা। তাঁর যুক্তি ও আবেগহীন প্রখর বোধি তাকে স্থিতি দেয় নি। বিশ্বচরাচরব্যাপী তিনি ঘুরেছেন মনে মনে। এ ঘোরার শেষ নেই। ক্লান্তি এলেও মুক্তি নেই। মরমী কবি রবীন্দ্রনাথ যে বোধি তথা শক্তিকে স্মরণ করে অনুযোগের সুরে বলেছিলেন – ‘আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে, হে সুন্দরী’। প্রতিমুহূর্তে জলে-স্থলে অন্তরীক্ষে নব নব উদ্ভাসে যার প্রকাশ, তাঁকে চিনে শেষ করা কি সম্ভব? কাছে থেকেও প্রবাসী তিনি। রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছেন-

         ‘তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর,

         তোমার অন্ত নাই গো, অন্ত নাই।’

কিন্তু তবু কবির হৃদয় তাতে শান্ত হয় না। অস্পষ্টতায় হাঁফ ধরে যায়। ছটফটিয়ে বলে ওঠেন – ‘অমন আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে চলবে না’।

লালন বোঝা না বোঝার মাদ্যমে দোল খেয়েছেন। অরূপকে প্রকাশের এবং ইন্দ্রিয়ের আওতায় পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়েছেন বারবার। পরক্ষণেই বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে বলেছেন – ‘হায় চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি, পাখি ভেদ পরিচয় দেয় না মোরে, ঐ খেদে ঝরে আঁখি’।

আগেই বলা হয়েছে, লালনের আধ্যাত্মিক চেতনা গভীর। স্রষ্টার প্রকাশ তিনি সর্বত্র দেখতে পান। আত্মসমর্পণের বিষয়ও তাঁর মধ্যে আছে। কিন্তু কখনো পরমের সঙ্গে বিলীন হওয়া বা আত্মবিলুপ্তির অবোধ আকুলতা তাঁর নেই। তিনি চান পরম সত্তা বা তাঁর খণ্ডরূপে চিনতে ও বুঝতে। এই স্বজ্ঞান বোধিই লালনের ঋজু দার্শনিকতা। বৌদ্ধ-তত্ত্বে নির্বাণ বা শূন্য লাভ তাঁর কাম্য ছিল না। লালন সংযমী, যুক্তিবাদী, চিন্তাশীল, মানবতাবাদী ও রিপুসচেতন সাধক। নিষ্কাম প্রেমে লালনের মনোভাব কেমন, তা তাঁর ভাষাতেই বলা যায় – ‘কাম হলো সেই প্রেমের লতা, কাম ছাড়া প্রেম পায় কি গতি’। আর এক গানে তিনি বলেছেন-

         ‘চিনি হওয়া মজা কি খাওয়া মজা।

         দেখ দেখি মন কোনটা মজা।।’

এ থেকে বোঝা যায়, নিষ্কাম প্রেম বা নির্জন শূন্য-চেতনা ছিল লালনের আদর্শ-বিরুদ্ধ দর্শন। অতএব বলা যায়, লালনের মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনা এবং অনুসন্ধিৎসা থাকলেও দার্শনিক লালনের পরিচয় এবং প্রকাশ অনেকগুণ বড় ও পরিব্যাপ্ত। দার্শনিক লালনের কাছে পরম সত্তা মানবদেহে বাস করেও পৃথক সত্তারূপে পরিচিত। খণ্ড সত্তা যদি হয় মন, তাহলে পরম সত্তা সেই মনের ‘মানুষ’। খণ্ড সত্তা যদি হয় ফুল, তাহলে পরম সত্তা তার বেহেস্তী সুবাস। একটাতে আছে ইন্দ্রিয়ের স্বাদ, অন্যটাতে আছে অনুভবের তৃপ্তি। লালন কোনোটাকেই তুচ্ছ করেন নি। তিনি দুটো চিন্তাকে একাকার করতে পারেন নি, দুটো সত্তার স্বরূপ খুঁজেছেন পাগলের মতো। বহু গানে বহুভাবে বলেছেন – ‘লালন ভেবে দিশে নাহি পেল’।

ঠিক এই কারণেই লালন-গীতির মধ্যে যে দর্শন ও অধ্যাত্মচেতনা আছে, তাকে পৃথক করা যায় না। ফুল আর সুবাসের উপমা আগেই দেওয়া হয়েছে, আবারও বলতে হচ্ছে – লালনের দর্শন হলো ফুল, তাঁর অধ্যাত্মচেতনা হলো সুবাস। সম্পুরক চেতন হিসেবে লালন-গীতিতে উভয় চিন্তাধারা বাঙময়। তবে লালনের দর্শন কখনো কখনো গূঢ় আধ্যাত্মিক রহস্যের বাইরে রয়ে গেছে। সেখানে শুধু কোরান ও হাদিসের বাণীর মাধ্যমেই ইসলামী আদর্শানুগত মৌলিক মূল্যবোধ এবং খোদার প্রেরিত পুরুষ ও তাঁর বাণী-ভিত্তিক আচার -আচরণের প্রতি মানুষকে সচেতন করে দেওয়া হয়েছে। যেমন – ‘আল্লা বল মনরে পাখি, ভবে কেউ হবে না সাথের সাথী’। এসব ক্ষেত্রে লালনের দর্শন সুবাসযুক্ত ফুল্ল-কমলের মতো, যার প্রতিটি পাঁপড়িতে জীবনের প্রসন্নতা এবং আকর্ষণ। এ ধরনের গান অধিক জীবন-সম্পৃক্ত। আর তাই আপামর সবার কাছে লালনের সঙ্গীত অতি প্রিয়। দুর্বোধ্য আধ্যাত্মিকতা লালন-গীতিকে গ্রাস করতে পারে নি প্রাচীন সাহিত্যের বৌদ্ধসাধনগীতি তথা সেই চর্যাগীতির মতো।

পূর্বসূত্রের জের ধরেই বলছি, অনেকের মতে লালন অনেকগুলো ধর্মমতকে সমন্বিত করার চেষ্টা করেছিলেন। অণ্প পরিসরে একথা প্রমাণ করা বা না করা কোনোটাই সম্ভব নয়। তবে তাঁর গানে একেশ্বরবাদ, দ্বৈতবাদ, বহুত্ববাদ সব ধারণাই পাওয়া যায়। এ তাঁর উপলব্ধির ফসল। লালনের জ্ঞানের পরিধিও ছিল বিশাল – এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। হয়তো সে কারণেই তিনি ব্রহ্মবাদ বা বৈষ্ণবতত্ত্ব আলোচনা করে এ কথাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, ধর্ম ও ভাবের কথা সব ধর্মেই আছে। সব ধর্মেই বলে – মানুষ হলো ধর্মের আধার। তারই জন্যে ধর্ম, অর্থ্যাৎ মানুষকে ভালোবেসেই স্রষ্টার সান্নিদ্য লাভ করতে হবে। আর এসব তত্ত্বের অবতারণা তিনি করেছেন দার্শনিক বিশ্লেষণের জন্যে, সমন্বয় সাধনের প্রসঙ্গ এখানে হয়তোবা ছিল নগণ্য।

পরিশেষে বলবো, লালন ছিলেন আমরণ জ্ঞানান্বেষী। দর্শন ছিল তাঁর বুদ্ধির সামগ্রী, স্বজ্ঞান বোধির নন্দন-চেতনা। আনন্দমূর্তি আর আধ্যাত্মিকতা ছিল তাঁর হৃদয়ের সামগ্রী, স্বজ্ঞান বোধির দুর্বোধ্য জগতের পরম বিস্ময়। লালনের আধ্যাত্মিকতা তাঁর একান্ত একটি জগৎ, কিন্তু লালনের দর্শন সবার জন্যে, লালন-গীতির অমৃত সকলেন জন্যে। লালন-গীতির অমিয়ধারা যেন চৌম্বর শক্তিতে হৃদয়ের মূল ধরে টান দিতে পারে। তাই আমাদের অনেকের বিচারে লালন-গীতির আধ্যাত্মিকতার চেয়ে লালন-গীতির দর্শন বহুগুণে অনুসৃত, প্রসারিত ও জীবন-সম্পৃক্ত।

[লালন মৃত্যু-শতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ ১৯৯২, পৃঃ ১১২-১১৯]



>