সমস্যা কি পোশাকে নাকি মস্তিষ্কে?


সমস্যা কি পোশাকে নাকি মস্তিষ্কে?


ইশরাত জাহান তৃণা : মিশেল ফুকো বলেছিলেন, ” মানুষের ইতিহাস ক্ষমতার ইতিহাস”। ক্ষমতা কাঠামোর উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠে সমাজ ব্যবস্থা ও তার মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা। যে সমাজের চাবিকাঠি পুরুষের হাতে সমার্পিত সেই সমজের পাপ পূণ্যের, ন্যায় অন্যায়ের মাপকাঠি গড়ে উঠে পুরুষের চিন্তা ধারার মত করে। আজকের যুগে এই প্রশ্ন বার বার আসছে তার কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ও তার কারণ হিসেবে যে হারে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর পোশাকের উপর দায় চাপাচ্ছে তা আমাদেরকে বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে আমরা এখনো মধ্যযুগীয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকে বের হতে পারিনি।
ধর্ষণকে নারীর প্রতি পুরুষের নৃশংস আচরণ হিসাবে দেখা হয় ঠিকই, কিন্তু যে পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে নারীর প্রতি অবমাননা নৈমিত্তিক ঘটনা এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে নারীর প্রতি যে নৃশংসতা চর্চিত হয়, সেসব বিষয় তারা পাশ কাটিয়ে যান। ধর্ষণকে যৌন আক্রমণ হিসাবে পাঠ করলে ধর্ষণের আওতা সীমিত হয়ে পড়ে এবং কাঠামোগত লৈঙ্গিক বৈষম্য এবং ধর্ষণের ক্ষেত্রে এর প্রভাব- ইত্যাদি বিষয় ঢাকা পড়ে যায়। ধর্ষণের মনস্তত্ত্ব তৈরি হয় নারীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। যেমন, বলা হয় পুরুষ হবে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, গুরুগম্ভীর বা রাশভারী। নারী হবে সরল, কোমল, সাত চড়েও রাগ করবে না, হবে পুরুষের আজ্ঞাবহ। নারীর প্রতি সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে যৌনবস্তু ও ভোগের উপাদান হিসাবে দেখবার প্রণোদনা দেয়। পুরুষ চায় নারীর শরীর ও যৌনতার নিয়ন্ত্রক হতে। ফলে পুরুষ ঠিক করে দেয় নারী কী পোশাক পরবে, কার সাথে, কখন যৌন সম্পর্ক স্থাপন করবে, কখন মা হবে ইত্যাদি। একজন পুরুষ জন্মাবার পর থেকেই তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক আরোপণের মধ্য দিয়ে পুরুষ হয়ে ওঠে এবং এক সময় এসবই তাকে ‘দুর্বল’ নারীর ওপর জোর ও যৌন আক্রমণ করতে উৎসাহিত করে।
তাই বর্তমান সময়ে যখনি কোন ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে তখন পুরো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ধর্ষিত মেয়ের চরিত্র ও তার পোশাক নিয়ে রিতিমতো সমালোচনার ঝড় তুলছে। ধর্ষক নয় ধর্ষিতার পোশাকই যেন দায়ী ধর্ষণের জন্যে। আর শুধু মাত্র অনন্ত জলিলের মত গুটিকয়েক মানুষ নয় বরং সমাজের অধিকাংশ মানুষই মনে করছে যে ধর্ষণের জন্যে দায়ী নারীর চরিত্র ও তার পোশাক। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের দায়ভার উল্টো নারীদের ওপর চাপিয়ে এই ঘটনার জন্য তাদের পোশাককে দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ, নারীরা যদি সঠিকভাবে পোশাক পরতেন তবে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটতো না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও একথা সত্য, যারা এমন পরামর্শ প্রদান করছেন তারাও এক অর্থে ওই ঘটনায় অভিযুক্তদের সমর্থন করছেন এবং তাদের কর্মকান্ডের বৈধতা প্রদান করছেন। কারণ যারা এই ঘটনায় যুক্ত তারাও এমনটি ভেবেছেন। পোশাকের দোহাই দিয়ে তারা নারীর শরীর জনসম্মুখে ভোগ করতে চেয়েছেন। তারা নারীকে মানুষ না ভেবে কেবল ভোগের সামগ্রী মনে করেছেন। তাই যারা সরাসরি নারী ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি ও নারী নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আর যারা নারীকে কথিত শালীন পোশাক পরার পরামর্শ প্রদান করছেন উভয়ের চিন্তা-চেতনা একই সূত্রে গাঁথা। সংকটটা উভয়ের পুরুষতান্ত্রিক পোশাক ধর্ষণের জন্য দায়ী এই যুক্তি আর যাই হোক সভ্য সমাজের যুক্তি হতে পারে না। আর আদিম সমাজের কথা বলতে গেলে সেখানেও এই যুক্তি খাটে কি না সেটাও বড় প্রশ্ন। পুরুষ এবং নারী দুজনেরই অধিকার আছে তাদের নিজেদের পোশাক পছন্দ করবার। আর পোশাকেই যদি ধর্ষণ হতো তাহলে পাহাড়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্বার নারীরা তাদের পুরুষ দ্বারা ধর্ষিত হত কিন্তু সেখানে তা হচ্ছে না। আমাদের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখি মুসলিম শাসন আমলের আগে এমনকি মুসলিম শাসন আমলেও এদের অধিকাংশই শাড়ি দিয়েই তাদের সর্বাঙ্গ ঢেকে রাখতো অন্য যে পোশাক তা তারা পরতো না। বাংলাদেশের প্রাচীন যুগের মানুষরা নিশ্চয় নারীর বক্ষ উন্মুক্ত সেই অজুহাতে শ্লীলতাহানি অথবা ধর্ষণের উৎসব করেননি। প্রাচীন বাংলার সামাজিক ইতিহাসে নানা অপরাধের কথা জানা গেলেও দলবেঁধে যুবকদের নারী ধর্ষণে মেতে ওঠার কথা জানা যায় না। যদি পোশাকের কারণে অর্থাৎ বক্ষ আর নাভি উন্মুক্ত রাখাই ধর্ষণের মূল কারণ হতো, তবে আমাদের পূর্ব পুরুষের সবাই ধর্ষক হয়ে উঠতেন। তাহলে তখন কি নারীরা এখনকার মত ধর্ষিত হত? ইতিহাস তো তা বলে না। তাহলে সমস্যাটা আসলে কোথায়?
পোশাক নয় বরং পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, নারীকে ভোগপণ্য, হেয়, দুর্বল করে দেখা এবং মস্তিস্ক বিকৃতির ফল নারী ধর্ষণ। আর এই বিকৃত মস্তিস্কদের পালে হাওয়া দিচ্ছে কতিপয় ধর্মীয় কুসুংস্কারের আবদ্ধ ব্যক্তি যারা নারীর শালীন পোশাক ও নারীকে ঘরবন্দী করার মাধ্যমে ধর্ষণের সমাধানের জিকির তোলেন। আর ধর্মীয় বিধানে যে পর্দার কথা বলা হয়ে থাকে তা এদের অধিকাংশ মেয়েই মেনে চলে৷ যারা ধর্ষীত হয়েছে তাদের কেউই তো অশালিন পোশাক পরেনি। তাহলে দোষটা কোথায়? আর ধর্মীয় বিধানে শুধু নারীকে তো পর্দার কথা বলা হয়নি পুরুষকেও বলা হয়েছে। আল কোরআনের সুরা নূরে (আয়াত ৩০) বলা হয়েছে, ‘(হে নবী!) মুমিন পুরুষদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত রাখে এবং যৌন পবিত্রতা রক্ষা করে চলে। এটাই তাদের জন্য পবিত্রতম পন্থা। নিশ্চয়ই তারা যাহা কিছুই করে,আল্লাহ তা সম্পর্কে পরিজ্ঞাত।’ তাই এখানেই প্রশ্ন আসে শুধু নারী কেন, পুরুষ কেন নয়?
তাই পরিশেষে এটাই বলতে হয় অপরাধকে প্রশ্রয় ও শুধুমাত্র পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকে ঠিকিয়ে রাখার জন্যে ধর্ষণের মত ঘৃণ্য অপরাধকে পোশাকের মত বিষয় দিয়ে বিবেচনা না করে নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা, তার অধিকার দিন এবং পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব বর্জন করুন। যতদিন না আমরা আমাদের পুরুষালী মনোভাব বর্জন করতে না পারছি আইন বা শাস্তির মাধ্যমে ধর্ষণকে পুরোপুরি রুখতে পারা যাবে না।
লেখক : কমিউনিকেশন ইন্টার্ন
ভয়েস, ঢাকা ।



>