নাটক-চলচ্চিত্রে লালন


নাটক-চলচ্চিত্রে লালন


শেকড় প্রতিবেদন :মানবতাবাদী বাউল সাধক লালন সাঁই। কালে কালে বেলা অনেক হলেও এ মানুষটির জীবন-দর্শন দিনে দিনে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে আমাদের জীবনে। লালন একটি নাম, একটি ধারা, একটি চেতনা, সর্বোপরি তিনি একজন মানুষ। তাই তার জীবন আর জীবনধারার মাঝে এখনো পথ খুঁজে বেড়ায় মানুষ। আর তাই নানাভাবে লালনকে ধরে রাখছে তার অনুসারী, অনুগামী, ভক্ত ও গবেষকরা।
তাকে নিয়ে অসংখ্য বই লেখা হয়েছে। দুই বাংলায় নির্মিত হয়েছে অনেক চলচ্চিত্র, নাটক, তথ্যচিত্র প্রভৃতি। চলচ্চিত্র, নাটক আর গল্পে নানাভাবে তুলে ধরা হয়েছে লালনকে, হয়েছে তার গানের ব্যবহার।
চলচ্চিত্র নাটক এসব হচ্ছে সমাজের প্রতিচ্ছবি। সমাজে আমরা যা দেখি তার মঞ্চায়িত রূপ কিংবা পর্দার রূপই হচ্ছে নাটক ও সিনেমা। বাংলাদেশে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নির্ভর ছবি বা নাটকের সংখ্যা খুব বেশি নয়, অন্তত: এ দেশে যে সব ব্যক্তিত্ব ছিলেন যাদের নিয়ে চলচ্চিত্র কিংবা নাটক নির্মাণ করা যায় এমন অনেককে নিয়েই তা করা হয়নি।
যা হয়েছে একটি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য কিংবা নির্মাণের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য কীতিমান পুরুষের বিপরীতে সে সংখ্যা নগণ্য। এদিক থেকে কিছুটা ভাগ্যবান লালন সাই। তাকে নিয়ে যেমন চলচ্চিত্র নাটক আর যাত্রাপালা হয়েছে, তেমনি এসবে জায়গা পেয়েছে তার গান।
মহাত্মা লালন সাঁইকে নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সৈয়দ হাসান ইমাম। যিনি নিজেই একজন জাত অভিনেতা। নাট্যকার আসকার ইবনে শাইখ লালনকে নিয়ে একটি নাটক লিখেছিলেন। ঢাকার নাট্যমঞ্চে এ নাটকটি বেশ কয়েকবার মঞ্চায়িতও হয়েছিল। স্বাধীনতার পর পর এ নাটকটি অবলম্বনেই সৈয়দ হাসান ইমামের সংলাপ, চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও প্রযোজনায় নির্মিত হয় সাঁইজিকে নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র ‘লালন ফকির’। এ ছবিটি ১৯৭২ সালে মুক্তি পায়। এ চলচ্চিত্রে লালন সাঁইয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন উজ্জ্বল। এতে আরো অভিনয় করেন কবরী, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। চলচ্চিত্রটির গানে কণ্ঠ দেন আবদুল আলীম, নীনা হামিদ এবং আরো অনেকে।
বাংলাদেশের বিকল্পধারা চলচ্চিত্র যাদের শ্রমে আর জ্ঞানে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন তানভীর মোকাম্মেল। বাউল সাধক লালন সাঁইয়ের জীবন ও দর্শন ছাত্রজীবন থেকেই তানভীর মোকাম্মেলের চিন্তা-ভাবনাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তার এ আকর্ষণ থেকেই ১৯৯৬ সালে সাঁইজিকে নিয়ে নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র ‘অচিন পাখি`। এটি তৈরি করার সময়ই তার মনের ভেতর দানা বাঁধে অতৃপ্তি। ২০০৪ সালে লালনকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তা বাস্তবায়ন করেন।
তানভীর মোকাম্মেলের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ‘লালন’ চলচ্চিত্রের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। এছাড়া আরো অভিনয় করেন শমী কায়সার, আজাদ আবুল কালাম, রামেন্দু মজুমদার, চিত্রলেখা গুহ, ইয়াসমীন তামান্না তিথি, নাজনীন চুমকি প্রমুখ। সাঈদ সাবাব আলী আরজু সঙ্গীত পরিচালনায় এ ছবির বেশিরভাগ গানে কণ্ঠ দেন লালন আখড়ার বাউলশিল্পীরা।
১৪০ মিনিটের এ চলচ্চিত্রে লালন চরিত্রে অভিনয় করে রাইসুল ইসলাম আসাদ দর্শকের মন হরণ করেন। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া এ ছবিটি ২৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠে শিল্প নির্দেশক বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার লাভ করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এ চলচ্চিত্রটি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
পরিচালক হাসিবুর রেজা কল্লোল তার প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন বাউল লালনকে নিয়ে। ‘অন্ধ নিরাঙ্গম’ শিরোনামের এ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ২০১১ সালে। এ সিনেমায় লালনের জীবনী তুলে ধরা হয়নি। এতে সাঁইজির মানবতাবাদী দর্শন আর তার ভাবাদর্শের অনুসারিদের বিভেদের মধ্যে লালনের অনুসন্ধান করা হয়েছে।
এ চলচ্চিত্রটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, রোকেয়া প্রাচী, সঞ্জীব আহমেদ, রিতু সাত্তার, ফখরুজ্জামান চৌধুরী, আমিনুর রহমান বাচ্চু, শিহাব পারভেজ, ইমদাদ ফকির, লাভলী ফকিরানী, মিডারি কারটিস, মাগালি লাভিরাত্তি, মাইকেল কোল, দিয়ারমাইদ স্পাইরো, আনুশেহ্ আনাদিল, শফি মণ্ডল প্রমুখ। একাধিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয় এ ছবিটি।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র আর নাটকেও লালনের ব্যাপক উপস্থিতি চোখে পড়ে। লালনকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন কলকাতার চলচ্চিত্র পরিচালক শক্তি চট্টোপাধ্যায়। এতে লালনের ভূমিকায় অভিনয় করেন অসীমকুমার। মতি বিবি চরিত্রে সন্ধ্যা রায় ও সিরাজসাঁই চরিত্রে অভিনয় করেন অসিত বরণ। ‘লালন ফকির’ নামের এ চলচ্চিত্রটি ১৯৮৭ সালে কলকাতায় মুক্তি পায়।
বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রযোজনায়ও নির্মিত হয়েছে লালনকে নিয়ে চলচ্চিত্র। ২০১০ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে লালন সাঁইকে নিয়ে নির্মিত হয় ‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্র। বাংলাদেশ এবং ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন গৌতম ঘোষ। ২০১০ সালে একই সময় ঢাকা ও কলকাতায় মুক্তি পায় এ সিনেমাটি।
গৌতম ঘোষের সংলাপ, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্রে লালনের ভূমিকায় অভিনয় করেন কলকাতার খ্যাতিমান অভিনেতা প্রসেনজিৎ। সিরাজ সাঁইয়ের ভূমিকায় ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। এতে আরো অভিনয় করেন চঞ্চল চৌধুরী, পাওলি দাম, প্রিয়াংশু চট্টোপাধ্যায়, তাথৈ, চম্পা, হাসান ইমাম প্রমুখ।
সাধারণ দর্শকদের কাছে ‘মনের মানুষ’ বেশ সমাদৃত হয়। চলচ্চিত্রটি ৪১তম ভারত ফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যালে সেরা চলচ্চিত্রর পুরস্কার লাভ করে।
ম. হামিদ ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে পরিচালনা করেন তথ্যচিত্র ‘দ্যাখে কয়জনা’ । এটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়।
লালন সাঁইজির জীবনীর নির্ভরযোগ্য তথ্য ও লালন-দর্শনের মূল কথা নিয়ে সাইমন জাকারিয়া রচনা করেছেন “উত্তরলালনচরিত” শীর্ষক নাটক। নাটকটি ঢাকার সদর প্রকাশনী হতে প্রকাশিত হয়েছে। উত্তরলালনচরিত নাটকটি নাট্যকার ও বাউলসাধকদের সমন্বয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমণ্ডলে উপস্থাপিত হয়েছে।
লালনের সংগীত ও ধর্ম-দর্শন নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে। ১৯৬৩ ছেউড়িয়ায় আখড়া বাড়ি ঘিরে লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্রের বিলুপ্তি ঘটিয়ে ১৯৭৮ সালে শিল্পকলা একাডেমির অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় লালন একাডেমি।
শুধু আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতি অর্থাৎ চলচ্চিত্র বা নাটকেই নয়, সাধারণ মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিতেও লালন চর্চা কিংবা লালনের অসামান্য প্রভাব রয়েছে। কলকাতার দমদম সংশোধনাগারে ২৫জন কয়েদি মঞ্চস্থ করে লালনকে নিয়ে একটি নাটক। এই নাটকের মূল উপজীব্য ছিল অসাম্প্রদায়িক লালন।
লালনের রচিত গানের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। তার গানের বৈশিষ্ঠ্য হচ্ছে সহজ-সরল শব্দ ও বাক্য। মনের কথাগুলোকে তিনি গানের কথায় রূপান্তরিত করেছেন, আর সেই কথাগুলো এখনো লাখোজনের মনের কথা যা গান হয়ে ভেসে আসে হাজারো বাউলশিল্পী ও সাধকের কন্ঠ থেকে। লালন প্রশ্ন করেছেন, উত্তর খুঁজেছেন আবার নিজেও উত্তর দিয়েছেন। লালন হিন্দু না মুসলমান এ প্রশ্ন সব সময়ই ছিল, তবে জাত-পাত ধর্ম এসব নিয়ে তার ভাবনা থাকলেও চিন্তা ছিল না, তিনি গেয়েছেন
‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।
লালন বলে জাতের কি রূপ
দেখলাম না এই নজরে।’
লালনের সময়কালে যাবতীয় নিপীড়ন, মানুষের প্রতিবাদহীনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি-কুসংস্কার, লোভ, আত্মকেন্দ্রিকতা সেদিনের সমাজ ও সমাজ বিকাশের সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি গানের মাধ্যমে মানুষের মনের সেই কালিমালিপ্ত দিকগুলোর কথা তুলে ধরেছেন। ‘এসব দেখি কানার হাট বাজার’ লালন কানার হাটবাজার দেখেছেন, বর্তমান সময়ের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে কি দেখবো? কানার সেই ‘হাটবাজার’ এর পরিধি বিস্তৃত হয়েছে অনেক।
লালনের কথার গানগুলো মানুষের মুখে মুখে, গুনগুনিয়ে আমরা গেয়ে উঠি। ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর, হেথা এক পড়শী বসত করে, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’।
লালনের গানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও অনেক। বিবিসি বাংলা সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গান নির্বাচন করেছিল দর্শক জরিপে। সে তালিকায় লালনের “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়” এ গানটি ছিল। তালিকায় এর অবস্থান ছিল ১৪তে।
তার মৃত্যুদিবসে ছেউড়িয়ার আখড়ায় স্মরণ উৎসব হয়। দেশ-বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসংখ্য মানুষ লালন স্মরণোৎসব ও দোল পূর্ণিমায় এই আধ্যাত্মিক সাধকের দর্শন অনুস্মরণ করতে প্রতি বছর এখানে এসে থাকেন।
লালনকে নিয়ে আরও বৃহত্তর পরিসরে কাজ করা সম্ভব। লালনের গানকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়াটা আমাদের কর্তব্য, কেন না তিনি আমাদের, তবে তার গানগুলো বৈশ্বিক, তাই বিশ্বজনের কাছে তাকে তুলে ধরতে হবে। লালনকে যখন বিশ্ব আরও বেশি চিনবে, জানবে তখন জানবে বাংলা আর বাংলাদেশকেও।



>