করোনা ভাইরাস : পরিবেশের উপর প্রভাব


করোনা ভাইরাস : পরিবেশের উপর প্রভাব


মেহের নিগার তুলি: করোনা ভাইরাসের কারণে যখন  বেঁচে  থাকাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তখন একটু করে হলেও প্রাণ ফিরে পেয়েছিলো বিশ্বের পরিবেশ। যদিও বর্তমানে এর নেতিবাচক দিকই বেশি। ডিসেম্বর ২০১৯- এ  চীনের উহানে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কারণে বিভিন্ন দেশ নিজেরাই লকডাউন ঘোষণা করে এবং বাংলাদেশেও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয় ২৬শে মার্চ ২০২০। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং শহর লকডাউন থাকায় কারখানা এবং যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকাতে কমে এসেছে বায়ু দূষণের মাত্রা। পরিবেশের মৌলিক উপাদান বায়ু দূষণের জন্যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়।

বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে  ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান কারণ হিসেবে এ শহরের চারপাশে অবস্থিত ইট ভাটাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এই লকডাউনে ইটভাটা এবং যানবাহন চলাচল সীমিত করার কারণে বাংলাদেশে বায়ু দূষনের মাত্রা কমেএসেছে।

কোপারনিকাস অ্যাটমোস্ফিয়ার মনিটরিংসার্ভিস (সিএএমএস) ও কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস (সি৩এস) নিশ্চিত করেছে যে, লক ডাউনের কারণে কার্বন নিঃসরণ কমে আসায় ওজন স্তরের যে বিশাল ক্ষত বা গর্ত তৈরি হয়েছিল তা পৃথিবী নিজেই সারিয়ে তুলছে।

সেন্টার ফর রিসার্চ অনএনার্জি অ্যান্ডক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) দেখিয়েছে, বায়ুদূষণ ও কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যে শক্তিশালী যোগ সূত্র রয়েছে। বায়ুদূষণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই হাজার হাজার মানুষ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুসের ক্যানসারসহ নানা ধরনের শারীরিক অক্ষমতায় ভুগছে। সেজন্যে এই সমস্যার টেকসই সমাধান নির্ণয় ও বাস্তবায়ন করা জরুরি। উদাহারন সরূপ বলা যায়, বাংলাদেশের কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর দূষণ প্রতিরোধী ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া অত্যাবশ্যক।

তবে লকডাউন কিছু আশ্চর্যজনক পরিবর্তনএনেছে আমাদের প্রকৃতিতে। বাংলাদেশ ও এর ব্যতিক্রম নয়। যদিও বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু কক্সবাজারে এক নতুন রূপে সেজেছে। সম্প্রতি সাগর পাড়ে ডলফিন দেখা গিয়েছে যাকিনা এলাকার মানুষের ভাষ্য মতে প্রায় ৩০ বছর পড়ে এমন দৃশ্য দেখা গেলো। শুধু তাই নয়, লালকাকড়া দেখা গিয়েছে কুয়াকাটাবীচে । লালকাকড়া আমাদের পরিবেশের বাস্তুসংস্থানের জন্যে  খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । ( জাগোনিউজ ২৪ , ৭ এপ্রিল, ২০২০)

তবে কোভিড ১৯ সংক্রমণের প্রাক্কালে মাস্ক ও হ্যান্ডগ্লাভসের ব্যপক ব্যবহারের কারণে দ্রুতগতিতে মেডিকেলবর্জ্য বেড়েছে।  রাবারের মাস্ক ও গ্লাভস বায়োডিগ্রেডেবল নয়। সমুদ্রের আশেপাশের শহরগুলির ক্ষেত্রে মাস্ক সমুদ্রে ভাসতে থাকেএবংএই সবের রঙ সামুদ্রিক প্রাণীদের আকৃষ্ট করার কারণে যদি খাবার ভেবে সামুদ্রিক মাছএইসব খেয়ে ফেলে তবে তা পরিবেশের জন্যে বিপদজনক। পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে যুক্ত ‘ওশানএশিয়া’নামেএকটি সংস্থার গবেষকেরা গত দুমাসে এশিয়ার বিভিন্ন সৈকতে বিপুল পরিমাণে সার্জিক্যালমাস্ক পেয়েছেন।

এসব আবর্জনার দ্রুত ব্যবস্থাপণা এবং প্রক্রিয়াজাত করা উচিত। মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূলনীতি অনুসরণ করা যেতে পারে। কিন্তু উল্লেখ্য যে এই লকডাউনের কারণে পানি ও শব্দ দূষণ অনেক কমেছে। কয়েক মাস ধরে বিভাগীয় শহরে শব্দ দূষণ লক্ষণীয় হারে কমার কারণে প্রকৃতির নান্দনিক রূপ সবার নজর কেড়েছিল।

করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্যে মানুষের জীবন যাত্রা এখন  প্রযুক্তি নির্ভর। মানুষের জীবন যাপনের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও নতুন অভ্যাস গুলোকে গ্রহণ করার নাম হচ্ছে‘নিউনরমাল’। কিন্তু এই নিউনরমাল যেন সাফল্যের সাথে আয়ত্বে রাখা যায় তা নিয়ে ভাবা জরুরি। যেহেতু অর্থনীতি মোকাবিলায় সকল কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে তাই কার্বন নিঃসরণ বেড়ে গেলে পরিবেশের উপর মারাত্বক প্রভাব ফেলবে। তাই করোনা প্রণোদনা যেন জলবায়ু-সামঞ্জস্য পূর্ণ উন্নয়নকে সমর্থন করে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে যত দ্রুত সম্ভব।

যেমন কিছু শিল্পকারখানা আছে যারা জীবাশ্ম  জ্বালানি ব্যবহার করে ,এই সব কারখানাকে সহায়তা প্রদান করলে কার্বন নিঃসরণ হার কমানো যেতে পারে । এছাড়া, ১১তম পিটার্সবার্গ  জলবায়ু সংলাপে, জাতি সংজ্ঞের মহাসচিব এবং ইউএনএফসিসিসি-এর প্রেসিডেন্ট গ্রিনরিকোভারির ওপর জোর দিয়েছেন। গ্রিন রিকোভারি বলতে সেই অর্থনৈতিক উদ্ধারকে বোঝায়, যা জলবায়ুর কার্যকলাপএবং টেকসইউন্নয়নকে অঙ্গীভূত করে।

করোনাভাইরাস , এই মহামারীর ভয়াবহতা আমাদেরকেএইটাই বুঝিয়ে দিলো যে, আমরা চাইলেই আমাদের পরিবেশকে বসববাসের উপযুক্ত করে রাখতে পারি। আমরা নিজেরাই আমাদের এই পরিবেশ কে নষ্ট করছি শুধু তাই নয় সাথে আমাদের জীবনকে ও হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছি।

পরিবেশের উপর করোনার ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। করোনার পরবর্তী সময়ে লোকেরা অবশ্যই বুঝতে পারবে যে তাদের পূর্ববর্তী বেপরোয়া আচরণের কারণে মানব সভ্যতা হুমকির মধ্যে রয়েছে। সুতরাং, আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপটি পরিবেশবান্ধব হওয়া উচিত এবং পরিবেশকে তার নিজের নিরাময়ের সুযোগ দেওয়া উচিত। এই ভাবে মানবজাতি এবং পরিবেশ একটি সুন্দর সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে যা ভবিষ্যতে সভ্যতাকে এ জাতীয় মহামারী থেকে বাঁচাতে পারে, আমরা বিশ্বাস করি ”।

লেখক: ইন্টার্ন, ভয়েস।



>