দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশ রক্ষায় ইলেকট্রনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দাবী


দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশ রক্ষায় ইলেকট্রনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দাবী


গণবার্তা প্রতিবেদক : বেসরকারি গবেষণা সংগঠন ভয়েস-এর উদ্যোগে ‘ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা  ও টেকসই পরিবেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা ই-বর্জ্য বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি, যথার্থ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, জ্ঞান সমৃদ্ধকরণ এবং ই-বর্জ্য পূর্ণব্যবহারের আহ্বান জানান। আজ শনিবার ‘ভয়েস—এর সিভিক সেন্টারে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।আলোচনা সভায়  সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন ভয়েসের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ। সভায় মূল আলোচনাপত্র উপস্থাপন করেন ভয়েসের  আবতাব খান শাওন ও মেহের নিগার তুলি।

আবতাব খান শাওন বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত বিকাশ এবং দ্রুত অর্থনীতির বিকাশের কারণে মোবাইল, কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং ঘরের সরঞ্জামের পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বাজারে এইসব ই-পণ্যের ব্যবহার ও পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে এইসব পণ্যের বর্জ্যের পরিমানও। নিয়মিত হারে এই ই-বর্জ্য বৃদ্ধির ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ পড়ছে হুমকির মধ্যে। বর্তমানে এই ই-বর্জ্য বিশেষ করে, বৈদ্যুতিক বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা নতুন চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিয়েছে।  এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ২.৮মিলিয়ন মেট্রিক টনই-বর্জ্য উৎপাদিত হয় যার মধ্যে গত ২১বছরে ১০,৫০৪ মেট্রিক টন বিষাক্তই-বর্জ্য এককভাবে সেলফোন বা এর সাথে যুক্ত পণ্যগুলো থেকে উৎপাদিত  হয়। প্রতিবছরে প্রায় ২৯৬,৩০২টি টিভি সেট নষ্ট  হয় এবং প্রায় ০.১৭ মিলিয়ন মেট্রিক টনেরও বেশি  ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয় । শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড থেকেই প্রতিবছরে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রতিবছরই বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ফলে ও তার প্রভাবে ১৫% এরও বেশি শিশুশ্রমিক মারা যায় এবং ৮৩% এরও বেশি এসব ই-বর্জ্য থেকে নির্গত বিষাক্ত পদার্থ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছে। এই সেক্টরের প্রায় পঞ্চাশ হাজার শিশু  অনানুষ্ঠানিকভাবে  ই-বর্জ্য সংগ্রহ করে এবং এসব বর্জ্য পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত থাকে। এসব শিশুদের অধিকাংশই জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের সাথে জড়িত। এই সেক্টরের শ্রমিকদের ৪০% শিশু।

মেহের নিগার তুলি তার বক্তব্যে বলেন,  এইসব ই-বর্জ্যগুলো থেকে প্রচুর পরিমান বিষাক্ত রাসায়নিক গ্যাস ও এসব  রাসায়নিক পদার্থগুলি মাটি, ভূগর্ভস্থ জল এবং বায়ুর সাথে মিশে যাচ্ছে। যার ফলে এসব উপাদানগুলোর দূষণের হার মারাত্নকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া এর সাথে যুক্ত শ্রমিক ও অন্যান্য মানুষকে মারাত্নক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে। কেননা এসব সেক্টরগুলিতে কাজ করার জন্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে পারে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান ই-বর্জ্য অপসারণ সম্পর্কিত কোন আইন বা নীতিমালা বাংলাদেশে তৈরি হয়নি। যদি পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুসারে ‘ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়মকানুন’ সংক্রান্ত একটি খসড়া বিধিমালা প্রণয়ন করা হয় এবং  ২০১১ এবং ২০১৩ তে সেটি সংশোধন করা হয়েছে। তবে এই আইনের কার্যকর ব্যবস্থা ও বাস্তবায়নের কোনও অগ্রগতি আজ অবধি দেখা যায়নি।

মেহের নিগার তুলি আরো বলেন, এই সময়ে  ই-বর্জ্য ট্রিটমেন্ট পরিকল্পনা স্থাপনের জরুরি প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। এই প্রকল্প  সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে তৈরি করতে হবে। এই সমস্যা সমাধানে উৎপাদকদের পাশাপাশি পূর্ণব্যবহারকারীদের এসব ট্রিটমেন্ট পরিকল্পনাগুলোর সাথে সংযুক্ত করতে হবে। এই সেক্টরের শ্রমিকদের চিকিৎসা  ব্যয় উৎপাদনকারী ও  গ্রাহকদের ভাগ করে নিতে হবে। এটি অংশদারি বা লাভজনক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করা যেতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রে সরকারি নজরদারির  ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে মুনাফা অর্জনের সুযোগ না নিতে পারে উৎপাদনকারীরা।

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন আইইডি এর সমন্বয়ক জ্যোতি চট্টপাদ্ধ্যায়। তিনি বলেন, বেশিরভাগ ই-বর্জ্য মাটি, পানি ও বায়ুর সাথে মিশে যার ফলে সীসা, পারদ এবং আর্সেনিকের মতো বিষাক্ত রাসায়নিকগুলি আমাদের মাটি, পানি, বায়ুকে দৃষিত করছে এবং আমাদের বাস্তুসংস্থান ও  আমাদের স্বাস্থ্যকে ক্ষতি করছে।

আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ডিপুটি জেনারেল ম্যানেজার নূর কামরুন্নাহার। তিনি বলেন-  ই-বর্জ্য একটি বিশাল সমস্যা হয়ে উঠছে। সমস্যা এবং বর্তমান পরিচালনা পদ্ধতিগুলি যখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছিলো তখন বাংলাদেশের গভীরভাবে মনোযোগ দেয়ার  প্রয়োজন ছিল। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির সরকারের মধ্যে পারস্পারিক  সহযোগিতাই ই-বর্জ্য থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করবে।

ক্লিন সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মেহেদী বলেন, অতিদ্রুত আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে এবং নিম্নমানের পণ্য ও ব্যবহৃত দ্রব্যের আমদানী নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ এসব পণ্য ই-বর্জ্যের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন উন্নয়ন সংগঠক সিরাজুদ্দাহার খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইপ্সিতা বহ্নি, সংস্কৃতিকর্মী ওয়ালিদ আকরাম, ফিল্ম মেকার জায়েদ সিদ্দিকী প্রমুখ।

ই-বর্জ্য বিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধি, উন্নত গবেষণা ও অনুসন্ধান এবং সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ণের উপর জোর দেনবক্তারা।



>