বিড়ি কারখানার শ্রমিক জীবন, উপেক্ষিত স্বাস্থ্য, ঝূঁকিতে নারী-শিশু


বিড়ি কারখানার শ্রমিক জীবন, উপেক্ষিত স্বাস্থ্য, ঝূঁকিতে নারী-শিশু


ইশরাত জাহান তৃণা:

ব্রিটিশ আমল থেকেই এদেশে বিড়ি কারখানা চালু রয়েছে। বিশেষ করে কিছু কিছু অঞ্চলে  একসাথে গড়ে উঠেছে অনেকগুলো বিড়ি কারখানা। এসব কারখানাতে বেশিরভাগ শ্রমিক নারী।এনবিআর এর মতে বিড়ি কারকানায় প্রায় ৮০ শতাংশই নারী শ্রমিক। এদেশের অসংখ্য জনসমষ্টির কর্মস্থান নির্ভর করে এই বিড়ি কারখানা গুলোর উপর সময়ে বিড়ির উপর শুল্ক বৃদ্ধি ও করোনাকালে বিড়ি তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদন বন্ধের কথা সরকার জানালে প্রতিবাদ জানায় বিড়ি ও তামাকজাত দ্রব্যের শ্রমিক ও তাদের সংগঠনগুলো।

বাংলাদেশ বিড়ি শ্রমিক ফেডারেশন বলছে, রংপুর বিভাগে প্রায় ৩৫০টি, রাজশাহী বিভাগে প্রায়৫০টি, ঢাকা বিভাগে প্রায়৩০টি, খুলনা বিভাগে প্রায়৪০টি, ময়মনসিংহ  বিভাগে প্রায়২৫টি, চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায়১৫টি ও কুমিল্লা বিভাগে প্রায় ৩০টির মতো বিড়ির কারখানা আছে। রংপুর বিভাগে বিড়ি শ্রমিকের সংখ্যা ১১ লাখ, রাজশাহী বিভাগে ২লাখ, ঢাকা বিভাগে৮০হাজার, খুলনা বিভাগে ৭৫হাজার, ময়মনসিংহ বিভাগে ৫০হাজার, চট্টগ্রাম বিভাগে১০হাজার, কুমিল্লা বিভাগে৩৫হাজার ও বরিশাল বিভাগে৬০হাজারবিড়ি শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। বিড়ি শ্রমিকদের সঙ্গে তামাক চাষিরাও এ শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এছাড়া রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল ও জামালপুরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তামাক চাষ হয়। আর এসব জেলায় ১০লাখের বেশি মানুষ তামাক চাষের সঙ্গে জড়িত।  এ খাতে ব্যবসায়ী রয়েছেন প্রায় ২ লাখ। সবমিলিয়ে বর্তমানে বিড়ি শ্রমিক, তামাক চাষি ও ব্যবসায়ীর সংখ্যা২৮লাখ১০হাজারের বেশি।যদি বাংলাদেশ বিড়ি শ্রমিক ফেডারেশনের মতে বাংলাদেশে প্রকৃত বিড়ি শ্রমিক যারা কারখানায় কাজ করেন তাদের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। তবে এনবি আর বলছে ভিন্ন কথা তাদের মতে দেশে বিড়ি কারখানায় প্রকৃত বিড়ি শ্রমিকের সংখ্যা ৬৫ হাজারের মত।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিড়ি কারখানার সংখ্যা সাড়ে চার হাজার থাকলেও বর্তমানে তার সংখ্যা কমে দাড়িয়েছে সাড়ে পাঁচশতে।সাম্প্রতিক সময়ের বিড়ি শুল্ক ও করোনা প্রতিরোধের কারণে বিড়ি কারখানা বন্ধ করার উদ্যোগে প্রতিবাদ জানায় বিড়ি শ্রমিক ও তার সংগঠন গুলো। প্রতিটা জেলা ও অঞ্চল ভিত্তিক সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানায়।

বাংলাদেশের বিড়ি শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ বিড়ি শ্রমিক ফেডারেশন। বিড়ি শ্রমিকদের দাবি দাওয়া সরকারের কাছে জানানো,শুল্ক কমানো, তামাকের দাম নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সংগঠনটি কাজ করে।সারা দেশের বিড়ি শ্রমিকদের একত্রিত করে গড়ে উঠেছে এই সংগঠনটি।বর্তমানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন আমিন উদ্দিন বিএসসি।এছাড়া বৃহত্তর রংপুরে রয়েছে রংপুর বিড়ি শ্রমিক ফেডারেশন স্থানীয় পর্যায়ে বিড়ি শ্রমিকদের দাবী দাওয়া আদায়ে কাজ করে থাকে সংগঠনটি।সাতক্ষিরা, যশোর, খুলনা সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়াস্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠে বিড়ি শ্রমিকদের সংগঠন।যারা বিভিন্ন সময়ে বিড়ি শ্রমিকদের বিষয়ে সোচ্চার হয়।

বিড়ি শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (সংক্ষেপে বিএটিবি) হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানি, যা ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকো কর্তৃক বাংলাদেশে পরিচালিত হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সাথে তালিকাভুক্ত। প্রতিষ্ঠানটি এই অঞ্চলে ১০০ বছরেরও অধিক সময় ধরে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকার আরমানিটোলায় এর প্রধান কার্যালয় ছিল। ১৯৪৭-এর দেশ ভাগের পর, এটি ১৯৪৯-এ প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পাওয়ার পর, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি (ইঞঈ) হিসেবে নামকরণ করা হয়। তবে, ১৯৯৮ সালে এটিকে পুনরায় ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (ইঅঞই) নামে ফিরিয়ে আনা হয়।বাংলাদেশে, ব্রিটিশ অ্যামেবাংলাদেশের ১,২০০-এরো অধিক কর্মী প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছে, যেখানে ৫০,০০০-এর অধিক কর্মী পরোক্ষভাবে জড়িত (যাদের বেশীরভাগই কৃষক)।

 দেশের একটি নির্দিষ্ট জনসমষ্টির উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম এই বিড়ি কারখানাগুলো। তবে এই বিড়ি কারখানার শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। বিড়ি কারখানাগুলোতে গেলে দেখা যায় সেখানে নেই সুষ্টু কাজের পরিবেশ। নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা। যেসব কারখানা গুলোতে বিড়ি তৈরি করা হয় সেখানে নেই পর্যাপ্ত আলো বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা ফলে অন্ধকার ও আধো আলো বদ্ধ পরিবেশে শ্রমিকরা তৈরি  করছে বিড়ি। তাদেরকে দেয়া হয় না কোন ধরণের মাস্ক।অনেকেই কাজ করছে খালি গায়ে। ফলে তামাকের বিষ ঢুকছে তাদের মধ্যে। অধিকাংশ বিড়ি শ্রমিকরাই ভুগছে নানান রকম রোগে। কাশি, যক্ষা, হাপানি, পেটের পীড়া, ক্যানসারের মত রোগে ভুগছে। রংপুর অঞ্চলের অধিকাংশ বিড়ি শ্রমিকরাই এই ধরণের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এছাড়া পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে ঘটছে দুর্ঘটনা। সাম্প্রতি সময়ে কুষ্টিয়ায় বিড়ি কারখানায় দুর্ঘটনায় দুইজন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে।

শুধু পরিবেশ নয় বিড়ি শ্রমিকদের নেই আর্থিক নিশ্চয়তা। বিড়িকারখানায় শ্রমিকেরা সাধারণত কাজ করে খণ্ডকালীন।  সপ্তাহে কাজ করেন তিন থেকে চার দিন। বাকি দিনগুলোতে অনেকেই অন্যান্য কাজের সাথে জড়িত হয় অনেকেই বেকার বসে থাকে। অপরদিকে বিড়ি শিল্পের মালিকেরা আর্থিক লাভের ভাগ পেলেও শ্রমিকরা পাচ্ছে না ন্যায্য মজুরী। দৈনিক ১৫০-১৮০ টাকার মজুরী কাজ করতে হচ্ছে তাদের। ফলে মানবিক চাহিদার সামন্যই পূরণ হচ্ছে তাতে।

বিড়ি কারখানা গুলতে সবচেয়ে ভয়াবহ ও মারাতœক সমস্যা হচ্ছে এই শিল্পে নিয়োজিত নারী ও শিশু শ্রমিক।আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এক্ষেত্রে ৮৫ ভাগই হলো নারী ও শিশু শ্রমিক। কম মজুরী ও শ্রমিকের যোগানের কারণে এখানে বেড়েছে নারী ও শিশু শ্রমিকের আধিক্য। এছাড়া বিড়ি কারখানার মালিকেরা সুযোগ নিচ্চে দরিদ্র বাবা মার যারা তাদের সন্তানদের সামান্য মজুরীর বিনিময়ে এইসব কারখানায় কাজ করতে পাঠাচ্ছে।  শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও স্বাস্থ্যহানিকর কর্মখাতের তালিকায় বিড়ি ও তামাক ক্ষেত্রের নাম থাকলেও শিশুশ্রমের ওপর নির্ভর করেই চলছে বিড়ি বাণিজ্য।

গবেষণা বলছে,বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে বিশেষ করে রংপুর ও লালমনিরহাটের দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারগুলোর শিশুরা এসব বিড়ি কারখানায় কাজ করে থাকে। প্রতিটি বিড়িকারখানার ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ শ্রমিকই বয়সে শিশু। লালমনিরহাট জেলায় ২১ হাজার বিড়িশ্রমিকের মধ্যে ১৫ হাজারই শিশু, যাদের বয়স ৪ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। যদিও বাংলাদেশশ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, ১৪ বছরের আগে কোনও শিশুকে কাজে নিয়োগ দেওয়া অবৈধ। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, সরকার ২০১৩ সালে মোট ৩৮টি কর্মক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে, যেগুলো শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও স্বাস্থ্যহানিকর। এই কর্মক্ষেত্রগুলোয় শিশুদের নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে চতুর্থ স্থানে রয়েছে বিড়ি ও তামাক বাণিজ্য।অথচ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়ি কারকানায় এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

বিড়ি কারখানায় কাজ করা শিশুরা বেশিরভাগই প্রাথমিকশিক্ষাও শেষ করতে পারে না। টাকা উপার্জনের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে চাপ ওকোম্পানির পক্ষ থেকে বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্টসংখ্যক বিড়ি তৈরি করার ভার মাথায় থাকার কারণে বেশিরভাগ শিশু শ্রমিকই স্কুলে যাওয়া বা খেলাধূলার কোনও সময় পায় না। শুধু তাই নয়, বিড়ি কারখানায় কাজ করা শিশু শ্রমিকদের প্রায়শই ক্রনিক ব্রংকাইটিস,শ্বাসকষ্ট, ঘন ঘন জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা, তলপেটের প্রদাহ, ডায়রিয়া ও পেশির ব্যথায়ভুগতে দেখা যায়।একই ঘটনা ঘটছে নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও। গবেষণা বলছে দেশে নারী শ্রমিকদের সহজলভ্য যোগান ও কম মজুরীতে কাজ করার ইচ্ছেই এই শিল্লে নারী শ্রমিকদের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে। গবেষণার তথ্য আমাদের আতংকিত করে তোলে। গবেষণা বলছে বিড়ি কারখানা গুলোতে নারীদেরকে মজুরী দেওয়া হয় ৬৫ থেকে ৮৫ টাকা। সবচেয়ে মারাতœক ঝুঁকির বিষয় হলো এসব কারখানা গুলোতে নারীরা তাদের ছোট বাচ্চাদেরকে নিয়ে কাজ করতে আসে। অনেক সময় দেখা যায় ছোট বাচ্চারা তামাকের মধ্যে শুয়ে আছে বা খেলা করছে যা শিশুদের জন্যে মারাতœক হয়ে উঠতে পারে। নারী ও শিশুদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও বিড়ি কারখানাগুলোতে মৌলিক অধিকার যেন সদূর পরাহত।

বর্তমানে করনাকালীন সময়ে বিড়ি কারখানা ও বাণিজ্যের চিত্র বিকট রুপ ধারণ করেছে। কারখানাগুলোতে নেই কোন সুব্যবস্থা। করোনা প্রতিরোধে কারখানার মালিক কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বরং অসংখ্য মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে। এছাড়া করোনাকালীন সময়ে এসব তামাকজাতীয় পণ্য সেবন করা যে কত ক্ষতিকর তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তাই এখনি সময়ে এই মরণঘাতী বাণিজ্য বন্ধ করার। যা দেশ ও জাতীর জন্য কল্যান বয়ে আনেনা তা কখনই  আমাদের জন্য শিল্প হতে পারেনা।

বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে বিড়ি কারখানার মালিকেরা মুনাফা লুটছে। আর দরিদ্র মানুষেরা কিছুটা আর্থিক উপার্জনের আশায় পা দিচ্ছে মরণ ফাঁদে। যা তাদেরকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে তিলে তিলে। আবার বিড়ি কারখানাগুলো বন্ধ করে দিলে এসব শ্রমিকেরাই হয়ে পড়বে উপার্জনহীন। এইকাজেরসাথেজড়িতচাষীওব্যবসায়ীদেররাস্তায়ভিক্ষাকরতেহবেকেননাবিপুলসংখ্যকমানুষকেকোনকাজেলাগানোযাবেনাকারণঅন্যকোনকাজতারাপারেনা। এক্ষেত্রে সরকারের জোড়াল পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু সরকার নয় এদেশের জনগণের ও উচিত এই বিষয়ে সচেতন হওয়া। তামাকজাতীয় পণ্যকে ‘না’বলার প্রতিশ্রুতি নেওয়া। এসব মানুষদের জন্য কর্মসংস্থান করার পাশাপাশি তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সাথে তাদের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে কৃষিকাজ, হাঁস-মুরগীর খামার, বিভিন্ন গবাদী পশু পালন, সেলাই এর কাজ ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হবে। তবে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার আগ পর্যন্ত সরকারের উচিত নিয়ম কানুনের আওতায় এনে বিড়ি শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়ন ও তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। এবং তামাকের পরিবর্তে জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া।



>