ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের মৃৎশিল্প বিলুপ্তির পথে


ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের মৃৎশিল্প বিলুপ্তির পথে


রিপন গোয়ালা অভি, ময়মনসিংহ ঃ

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় প্রাচীন সভ্যতার অপূর্ব নিদর্শন মৃত্তিকা শিল্প আজ বিলুপ্তি পথে। যাদের হাতের নিপুন ছোঁয়ায় মাটি হয়ে ওঠে বিভিন্ন ধরণের সৌখিন সামগ্রী, তাদের বলা হয় পাল সম্প্রদায়। এ শিল্পের প্রাণপুরুষ পালদের বর্তমানে চলছে চরম দুর্দিন।
বর্তমানে পালদের মাটির তৈরি সামগ্রীর বদলে আধুনিকতার ছোঁয়ায় মাটির তৈরি পণ্যসামগ্রীর পরিবর্তে কাঁচ, প্লাস্টিক, মেলামাইন, দস্তা, স্টেইনলেসষ্টিল, অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র সহজলভ্য, আরামদায়ক, রুচিশীল ও টেকসই হওয়ার কারণে মৃৎশিল্পের চাহিদা মারাত্মক ভাবে কমে গেছে। যার কারণে বহু মৃৎশিল্প পরিবার অভাব ও আর্থিক দৈন্যতায় পিষ্ট হয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে পৈত্রিক পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
জানা যায়, আগে পালরা মাটি ও বালুসহ খড়কুটো বিনামুল্যে সংগ্রহ করতো। বর্তমানে সেই মাটি ও খরকুটো টাকা দিয়ে কিনতে হয়। যার কারণে উৎপাদন খরচ আগের তুরনায় অনেক বেশি। কিন্তু বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে মৃৎশিল্পেদের তৈরি পণ্যেও চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে তারা আজ হতাশ হয়ে পৈত্রিক পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। জানা যায়, উপজেলার বেশ কয়েকটি এলাকায় শতাধিক পাল পরিবার মাটির পণ্য সামগ্রি তৈরি করে আসছিলেন। মৃৎশিল্পিরা নিজ হাতে সামান্য মাটিকে বিভিন্ন পণ্যে রুপ দেন। পণ্যেও ওপর নকঁশা ও বিভিন্ন ধরনের কারুকাজ মাটির পন্যকে আকর্ষনীয় কওে তোলে। তাদের তৈরি ফুলের টব, মাটির ব্যাংক, কলস, ফুলদানি, চাড়ি, ঢাকনা, হাঁড়ি-পাতিল, থালা, পটসহ মাটির তৈরি আরো বিভিন্ন ধরনের খেলনা সামগ্রি অন্যতম। যান্ত্রিক সভ্যতার এ আধুনিক যুগে মাটির তৈরী পন্য সামগ্রির চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে ভিষন ভাবে। অন্যদিকে প্লাস্টিক, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম ও স্টেইনলেসস্টিলের তৈরি সামগ্রী সহজলভ্য এবং দামে কম হওয়ায় মানুষ এর দিকেই ঝুকছেন বেশি।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার পুর্বে আঠারবাড়ির দিঘালিয়া গ্রামে গেলেই চোখে পড়ে পালপাড়া। সেখানেই পালরা শৈল্পিক ছোঁয়ায় তেরি করেন নয়নাভিরাম মৃৎশিল্পের জিনিসপত্র। ওই এলাকার কুমার সুনিল পাল (৫৬) জানান, বহু বছর ধরে তারা এ শিল্পের সাথে জড়িত। আগের মতো তাদেও তৈরি জিনিস পত্রের কদর এখন আর নেই। এ পেশায় থেকে বর্তমানে জীবন চালানো বড়ই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই অনেকই এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। ওই এলাকার স্বপন পাল (৫২) জানান, এ পেশার সাথে জড়িত অনেকেই মুলধন হারিয়ে নিঃস হয়ে পড়েছেন। তারাও মূল ধনের অভাব মেটানোর জন্য বিভিন্ন এনজিও সংস্থাথেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিচ্ছেন। কিন্তু পন্য বিক্রি কম হওয়ায় তারা সেই ঋণ ঠিক মতো মেটাতে পারেন না। ফলে ধীরে ধীরে পাল পাড়ার পালরা তাদেও পৈত্রিক পেশা ছেড়ে দিয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন।
পাথারিয়া গ্রামের শ্রী অজিত চন্দ্র পাল জানান, বর্তমান উচ্চ মুল্যেও বাজারে সব পন্যেও দাম বাড়রেও বাড়েনি মৃৎ শিল্পের দাম। বরং কমেছে এর চাহিদা। বর্তমান বাজাওে ২০০ টাকা মন লাকড়ি, ১২০ টাকা বস্তা কুড়া, এছাড়া চড়া মুল্যে বন ও মাটি কিনতে হয় তাদেরকে। কিন্তু ব্যায়ের তুলনায় তাদের আয় অনেক কম। অর্চনা রাণি পাল (৪৫) জানান, আগের মতো তাদেও পণ্য এখন আর বিক্রি হয় না। তবে কিছু নার্সারিতে তাদের মাটির তৈরি টব বিক্রি হয়ে থাকে। এছাড়াও কিছুর ঘর বাড়িতে এবং প্রতিষ্ঠানের শোভা বর্ধনের জন্য মাটির তৈরি ফুলদানি ও টব ব্যাবহার করা হয়। তাছাড়া মিষ্টির দোকানে দই করার জন্য পাতিল বিক্রি কওে কোনো রকমে বেঁচে আছি। তিনি আরো বলেন, আমাগো তো ফসলি জমি নাই। তাইতো অনেক কষ্ট কইরাই এইটা দিয়া আমাদেও সংসার চলে।
আঠারবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো.আলমগির হোসেন জানান, বর্তমান বাজারে অন্যান্য পণ্যেও সাথে টিকতে না পেরে এ পেশার সাথে জড়িত অনেক পরিবার তাদেও পৈত্রিক পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এ শিল্পের সাথে যারা জড়িত তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা আমাদেও সকলের উচিত।



>