উপকূলে বেড়েছে দুর্যোগ সচেতনতা পানির পরিত্যাক্ত বোতল দিয়ে হবে লাইফ জ্যাকেট


উপকূলে বেড়েছে দুর্যোগ সচেতনতা  পানির পরিত্যাক্ত বোতল দিয়ে হবে লাইফ জ্যাকেট


সোহেল হাফিজ, বরগুনাঃ

ঘূর্ণিঝড় মহাসেন চলে গেছে দেড় মাসেরও বেশী সময় হল। উপকূলে আবহাওয়ার কোন সিগন্যালও নেই। তবুও দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় জেলা বরগুনার তালতলী উপজেলার বড় অংকুজানপাড়া গ্রামের একটি আবাসন প্রকল্পের একচালা ঘরে চলছে দুর্যোগ বিষয়ক নিয়মিত মাসিক সভা। সভায় অংশগ্রহনকারী সদস্যদের সকলেই বেরিবাঁধের উপরে এবং বাইরে বসবাসকারী হতদরিদ্র পরিবারের নারী ও পুরুষ। সভার আলোচিত বিষয়গুলোও ভিন্ন রকম। আলোচনায় উঠে আসছে চলতি মাসের সম্ভাব্য আপদ বিপদসহ করনীয় নানা অনুষঙ্গ। অতিবৃষ্টির সময় কী কী উপায়ে ঘরের লাকড়িসহ (জ্বালানী), খাদ্য শস্য এবং অন্যান্য গৃহসামগ্রী সংরক্ষণ করতে হবে। হাঁসমুরগীসহ গবাদি পশুর কী কী রোগ বালাই হতে পারে এবং তা থেকে পরিত্রাণের উপায়গুলো কী। সারা বছরের মৌসুমী আপদগুলোর কথাও আসছে আলোচনায়। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় এবং ঘুর্ণিঝড় চলাকালীন জোয়ার জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলায় করনীয় নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা চলে এসব সভাগুলোতে।

বড় অংকুজান পাড়া গ্রামের একজন দরিদ্র গৃহবধু খাদিজা (৩৫) বলেন, ‘জন্মই আমাগো দুর্যোগের দ্যাশে, বাইচচা থাহনের উপায়ও আমাগোই বাইর করতে অইবে। আমরা এহন বোজদে (বুঝতে) পারছি, একটু সচেতন থাকলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি বেমালা (অনেক) কমাইয়া আনা যায়। এবারের মহাসেনে আমরা হ্যার প্রমাণ পাইছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এবারের মহাসেনের আগের দিন থেইককা আমরা সবাই মিইল্লা (সকলে মিলে) মিটিং করছি। সবাই সবার খোঁজ খবর লইছি। চাইর কিলোমিটার দূরের সাইক্লোন শেল্টারে গুড়াগ্যাড়াসহ সবাইরে লইয়া গেছি। বিশেষ কইরা বুড়া মানুষ, গর্ভবতী আর প্রতিবন্ধীগো সাইক্লোন শেল্টারে নিয়া আলাদা জাগায় (স্থানে) রাখছি।

স্থানীয় একাধিক অধিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের মহাসেনের সময় খাদিজা নারী-শিশু ও প্রতিবন্ধীসহ দুই হাজার স্থানীয় অধিবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন। খাদিজার এ উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে এখন বিশেষ ভাবে প্রসংশিত। শুধু খাদিজা নয়, খাদিজার মত সাগরতীরের তালতলী উপজেলার অনেক নারী-পুরুষ এখন যেকোন দুর্যোগের আগে ও পরে প্রস্তুতি ও প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

একই গ্রামের দরিদ্র কৃষক আবু জাফর (৪৫) বলেন, বিদেশী লাইফ জ্যাকেট কিইন্না (কিনে) আমাগো পোশাইবে (পুষবে) না। হ্যাইয়ার লইগগা (সে জন্য) আমরা আমাগো মিটিং-এ আলাপ কইররা ঠিক করছি এহন হালাইননা (ফেলে দেয়া) পানির বোতল দিয়া মোরা লাইফ জ্যাকেট বানামু। এ্যাতে খরচও কম পড়বে, টেকপেও বেশীদিন। ঝড়-বইন্নার (ঘূর্ণিঝড়) সময় পোলাপানসহ আমরা সবাই ওই লাইফজ্যাকেট পইরা সাইক্লোন শেল্টারে যামু।

স্থানীয় সচেতনমহল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকে আইলা ও মহাসেনসহ একাধিক শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের কারনে স্থানীয় অধিবাসীরা দুর্যোগ ইস্যুতে তুলনামূলকভাবে অনেক সচেতন হয়ে উঠছে। নিজেরাই এখন প্রতি মাসে নিয়মিত মাসিক সভা করে দুর্যোগ প্রস্তুতির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো আলোচনায় এনে দুর্যোগকালীণ সময়ে একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে।

শুধু অংকুজান পাড়ায়ই নয়, সাগরতীরের নবগঠিত তালতলী উপজেলার দশটি গ্রামের প্রায় ৫ হাজার পরিবারের ২৫ হাজার অধিবাসী এখন নিজেদের উদ্যোগে দুর্যোগ মোকালোয় প্রস্ততি ও প্রশমনে বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। নিজেদের প্রয়োজনে এসব গ্রামের স্থানীয় অধিবাসীরা ইতোমধ্যেই তৈরী করেছে গ্রাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি। এসব কমিটির মাধ্যমে দুঃস্থ ও অসহায় পরিবার বাছাই করে তাদের বাড়ির আঙ্গিনা ও ভিটি উচুকরনে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে স্থানীয়রা।

খাঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্পেন সরকারের অর্থায়নে স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন সংগ্রামের (সংগঠিত গ্রামোন্নয়ন কর্মসূচীর) সহযোগিতায় এসিএফ (অঈঋ) নামের একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন সিডরপরবর্তী সময়ে কমিউনিটি ম্যানেজড্্ ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন (ঈগউজজ) নামের একটি প্রকল্পের অধিনে বরগুনার তালতলী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে আসছে। এ প্রকল্পের অধিনে দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতি ও প্রশমন বিষয়ে এসিএফ স্থানীয় অধিবাসীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। পাশাপাশি বাছাইকৃত দরিদ্র পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা, গৃহপালিত হাঁসমুরগী, গবাদিপশু, মৎস্যপোনাসহ বিভিন্ন উপকরণ সহযোগিতা দিয়ে আসছে। সম্প্রতী গত ১৬ই মে উপকূলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় মহাসেন পরবর্তী সময়ে এসিএফ তালতলীর তিনটি ইউনিয়ন বড়বগী, সোনাকাটা এবং নিশানবাড়িয়ার ১৯৯৫টি পরিবারে ইমার্জেন্সী শেল্টার কিডস এবং হাইজিন কিডস্্ বিতরণ করে।

উন্নয়ন সংগঠন সংগ্রামের (সংগঠিত গ্রামোন্নয়ন কর্মসূচীর) উপ-নির্বাহী পরিচালক চৌধুরী মুনীর হোসেন জানান, একটি সময় ছিল যখন কমিউনিটি বেইজড্্ প্রোগ্রাম ডিজাইন করা হত। সেখানে কমিউনিটি মানুষের কথা বলা হত তবে তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকত কম। সিএমডিআরআর প্রকল্পটি কমিউনিটি বেইজড্্ নয়, বরং কমিউনিটি ম্যানেজড্। তিনি আরও বলেন, দুর্যোগ ইস্যুতে কী কী পরিকল্পনা কিভাবে গ্রহন করা উচিৎ তা স্থানীয় মানুষের চেয়ে কেউ ভাল জানতে পারে না। চৌধুরী মুনীর আরও জানান, সিএমডিআরআর প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের পর তালতলীর স্থানীয় অধিবাসীরা নিজেদের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে বুঝতে সক্ষম হয়েছে। সেই সক্ষমতার জায়গা থেকে পরিত্যাক্ত বোতল দিয়ে লাইফ জ্যাকেট বানানোর মত চিন্তা ভাবনা করছে স্থানীয় অধিবাসীরা। এই লাইফ জ্যাকেট প্রসঙ্গে মুনীর আরও বলেন, পানির পরিত্যাক্ত বোতল দিয়ে লাইফ জ্যাকেট বানানোর বিষয়টি সময়উপযোগী। ইতোমধ্যেই এসিএফ এবং সংগ্রাম উভয়েই বিষয়টি নিয়ে ভাবছে। শীঘ্রই এ বিষয়ে কাজ শুরু করা হবে।

তালতলীর একজন ইউপি চেয়ারম্যান দুলাল ফরাজী জানান, সাধারণ মানুষ এখন বুঝতে পেরেছে, জানমালসহ নিজেদের আত্মরক্ষায় নিজেদেরকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি এসিএফের সিএমডিআরআর প্রকল্পের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। বরগুনার ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচীর উপ-পরিচালক হাফিজুর রহমান জানান, তুলনামুলকভাবে বরগুনার তালতলীতে স্থানীয় অধিবাসীদের মাঝে দুর্যোগ ইস্যুতে সচেতনতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে এসিএফের সিএমডিআরআর প্রকল্পটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি জানান। তিনি আরও জানান, এবারের মহাসেনে ডিসএমডিআরআর প্রকল্পের গ্রাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির নারী ও পুরুষ সদস্যরা ঝুকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে সাধারণ জনগনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে প্রসংশনীয় দায়িত্ব পালন করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে সাধারদুর্যোগপ্রবন উপকূলে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় সরকারী-বেসরকারী সকল প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসার আহবান জানান।



>