অচেনা দেশের অচেনা মানুষ। আনা ফিরতে চান মাতৃভূমে


অচেনা দেশের অচেনা মানুষ। আনা ফিরতে চান মাতৃভূমে


উজ্জ্বল ধর, বালাগঞ্জ (সিলেট) থেকে : ১৯৩৯ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তখন পুড়ছে মালয়। শত্রুর আক্রমণে ছারখার হয়ে যায় কম্পোবারো নামের মালয়ের ছোট এক গ্রাম। প্রাণ বাঁচাতে ওই সময় মিত্র বাহিনীর সামরিক বহরে আশ্রয় নেয় এক শিশু। এক সময় যুদ্ধ থামে, কিন্তু সে অবুঝ শিশুটি হারিয়ে ফেলে তার স্বজনদের। বাঙালি এক ট্রাকচালকের হাত ধরে পাড়ি জমায় বাংলাদেশের (তৎকালিন ভারত) সিলেটে। সব হারানো শিশুটির নাম রাখা হয় শাহাদাত হোসেন আনা।
বৃদ্ধ আনার খাকি পোশাক পরা বাবার মুখ ভাসা ভাসা মনে পড়ে। সুদূর মালয় দেশের এক পাহাড়ঘেরা গ্রামে একসময় বাস ছিল তাঁর। সেখানকার পাহাড়, মেঘ আর শৈশবের টুকরো স্মৃতি ছাড়া আর কোনো সম্বল নেই তাঁর। ৮১বছরের আনা পেছনের কথা মনে করতে গিয়ে শুধু স্মৃতি হাতড়ান, সেখানে তাঁর জীবন আমূল পাল্টে দেওয়া যুদ্ধের স্মৃতি হানা দেয় বারবার। জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্কের সুতো কেটে দেওয়া সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা আওড়ান বিড়বিড় করে। আকাশে যুদ্ধবিমান আর বোমা ফাটার বিকট শব্দ এখনো তাঁর কানে বাজে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একদিন পুরো গ্রামটি আগুনে ঝলসে দেওয়া হয়। মা-বাবা কে কোথায় গেলেন, পাড়া-প্রতিবেশীদের কী অবস্থা কিছুই মনে নেই আনার। শুধু মনে আছে, প্রচনড গোলাগুলির মধ্যে চারপাশের সবাই যখন ছোটাছুটি করছে, তখন সাত বছরের আনা একটি সামরিক বহরের গাড়ির নিচে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মিত্রবাহিনীর ওই সামরিক বহরে আনাকে আবিষ্কারের পর তাঁর পরিবার-পরিজনের হদিস না পেয়ে তাঁকে তুলে দেওয়া হয় তখন মিত্রবাহিনীতে ট্রাকচালক হিসেবে কর্মরত আবদুল লতিফের জিম্মায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে মালয়ের বিভিন্ন জায়গায় কাটিয়ে ১৯৪৬ সালে আবদুল লতিফ আনাকে নিয়ে বালাগঞ্জ উপজেলার বোয়ালজুড় ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে তাঁর নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। এখানেই বড় হতে থাকেন আনা। তখন ভারতজুড়ে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন চলছে। ফলে কয়েক বছর পরই ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারত-পাকিস্তান নামে দুটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ইতিহাসের এই সুদীর্ঘ সময়ে প্রথমে ভারত, পরবর্তীতে পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশে কাটিয়ে এ অঞ্চলের সব প্রভাবই পড়েছে আনার জীবন যাপন, চেহারা ও আচরণে। মাতৃভাষায় কথা বললেও আনার সিলেটি ভাষা বুঝতে ও রপ্ত করতে অনেক বছর লেগে যায়। আনা এখন প্রায় তাঁর জীবন সায়াহ্নে। থুতনিতে সামান্য দাড়ি সমেত আনার চেহারায় পূর্ব এশিয়ার মঙ্গোলিয়ান ছাপ এখনো ভালো করে নজর করলে বোঝা যায়। এতোগুলো বছর অতিক্রম করে এসে আনার স্মৃতি থেকে অনেক কিছু বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেলেও, মালয় দেশের তাঁর গ্রামের কম্পোবারো নামটি এখনো ভুলে যাননি।
বাংলাদেশে জীবনের পুরোটাই কাটিয়ে দিলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি আনার। ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ওঠেনি। নেই পরিচয়পত্রও। আশ্রয়দাতা পরিবারে শুধু আশ্রয়ই মিলেছে, শিক্ষার কোনো আলো আনার জীবনে পৌঁছায়নি। জীবনপাত করেছেন আশ্রয়দাতা আবদুল লতিফের বাড়ির গৃহস্থালি কাজে। এই দেশে বেড়ে ওঠার এক পর্যায়ে আনা ভালোবেসে সিলেটের এক মেয়েকে বিয়ে করেন। তাঁর টানাপোড়েনের সংসারে রয়েছে দুই ছেলে ও ছয় কন্যা সন্তান।
পরভূমে পুরো জীবনটা কাটিয়ে দিয়েও জীবনের এই শেষ সময়ে একবারের জন্য হলেও আনা তাঁর ফেলে আসা মাতৃভূমিকে দেখতে চেয়ে ২০১০ সালে সিলেটের নাজিম উদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ীর কাছে তাঁর এই ব্যাকুলতার কথা প্রকাশ করেন। নাজিমউদ্দিন ই-মেইলের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি লিখে পাঠান রেডক্রস জেনেভা কার্যালয়ে। জেনেভা থেকে রেডক্রস বাংলাদেশ কার্যালয়ে আনাকে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অনুরোধ সংবলিত চিঠি আসে। বাংলাদেশে আনার ব্যাপারে খোঁজ নেওয়ার দায়িত্ব পান রেডক্রসের সে সময়ের ট্রেসিং কর্মকর্তা শিরিন সুলতানা। শিরিন সুলতানা আনার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে, আনার সঙ্গে কথা বলে শিরিন সুলতানাও নিশ্চিত হন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মালয়ে স্বজন হারানো আনাকে এ দেশে নিয়ে এসেছেন আবদুল লতিফ ।
কিন্তু প্রত্যাবর্তন-প্রক্রিয়ার প্রথম সমস্যা হয়ে দেখা দেয় আনার সঠিক মাতৃভূমি কোনটি এই প্রশ্নে। কারণ আনার পরিচয় অনুসন্ধান করতে গিয়ে রেডক্রস জানতে পারে ১৯৪৬ সালের ২২ জুলাই আবদুল লতিফ একটি জাহাজে করে আনাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। তাঁকে বাংলাদেশে আনার পর টিকাও দেওয়া হয়। আনার কাছে থাকা তাঁর ছোটবেলার ছবি সংগ্রহ করে বাংলাদেশ রেডক্রস মালয়েশিয়া রেডক্রসের কাছে পাঠায়। কিন্তু মালয়েশিয়া রেডক্রস কার্যালয় থেকে জানানো হয়, আলেক্সান্দ্রা এলাকাটি এখন সিঙ্গাপুরের অংশ। ঢাকা রেডক্রস তখন সিঙ্গাপুর রেডক্রসকে অনুরোধ করে আনার কোনো আত্মীয়স্বজন আছে কি না খুঁজে বের করার জন্য। আনার শৈশবের ওই একমাত্র ছবি ছাড়া আর কোনো তথ্য না থাকায় সিঙ্গাপুর রেডক্রসও জানিয়েছে, তারা আনার পরিবারের কারও হদিস করতে পারেনি। আনার ছবি সংবলিত পোস্টার বিলানো হয়েছিল মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর দু-দেশেই, কিন্তু ফল মেলেনি কোনো।
কিন্তু আবদুল লতিফের বাড়িতে প্রায় গৃহভৃত্যের মতো দিন কাটানো আনা তারপরও স্বপ্ন দেখেন ছেলেবেলার তাঁর সেই পাহাড়ঘেরা কম্পোবারো গ্রাম তিনি ফিরে পাবেন, ফিরে পাবেন স্বজনদের।



>