খুলনায় একাত্তরের গণহত্যা


খুলনায় একাত্তরের গণহত্যা


গৌরাঙ্গ নন্দী
লুটেরাদের অত্যাচারে ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রাণ ছুটে পালাচ্ছিলেন তাঁরা। লক্ষ্য ছিল সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশটিতে ঠাঁই নেয়া। পলায়নরত ভীতসন্ত্রস্ত সেই মানুষগুলোকে পাকিস্তানী হানাদাররা নির্বিচারে হত্যা করেছিল চুকনগরে। মর্মান্তিক এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে একাত্তরের ২০মে। এর আগেরদিন বটিয়াঘাটার ফুলতলায় ঘটে এমনি এক হত্যাকান্ড। পরদিন ২১ মে এবং ২৩ মে ঘটে সাতক্ষীরার ঝাউডাঙ্গায় একই ধরণের নারকীয় হত্যাকান্ড।
শুধুমাত্র এই গণহত্যাগুলোই নয়, খুলনা শহর ও জেলার বিভিন্ন জনপদ এবং সংলগ্ন বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার জনপদেও (একাত্তরে বর্তমানের সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা খুলনা জেলার অধীন মহকুমা ছিল) গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এই গণহত্যাস্থলগুলোর অন্যতম হচ্ছে খুলনা শহরের খালিশপুরের মুন্সিবাড়ি, ডুমুরিয়ার রংপুর, দিঘলিয়া, দাকোপের বাজুয়া ও চালনা, কয়রার হড্ডা; বাগেরহাট জেলাধীন রামপালের ডাকরা, কঢ়ুয়ার শাঁখারীকাঠি প্রভৃতি এলাকা। আবার এই খুলনার কপিলমুনিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়। বিচারে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীদের চরমতম শাস্তি দেয়া হয়।
একাত্তরের ২০ মে চুকনগরের গণহত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী সেই সময়ের কিশোর এরশাদ আলী মোড়ল আজও বেঁচে আছেন। স্বজন হারানোর ব্যথা তাঁকে ক্রমাগত কুরে খায়। এই দিনটি এলে তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। ঘৃণায় বুক বেঁকে ওঠে। পাকি হায়েনাদের গালি দেন। পাকি সেনাদের ওপর তেড়ে যাওয়া চিকন আলী মোড়লকে হত্যা করে চুকনগর হত্যাযজ্ঞ শুরু। শহীদ চিকন আলী মোড়লের ছেলে এরশাদ আলী মোড়ল বলেন, ‘ওরা (পাকি সেনারা) মানুষ না, মানুষ কোনদিন মানুষরি এইভাবে মারতি পারে! জানের (প্রাণের) মায়ায় যারা পালায় যাচ্ছিল, সেই সব মানুষরি ওরা পাখির মত গুলি কইরে মারলো। গাছে চইড়ে (উঠে) , পানিতি নাইমে মানুষ বাঁচতি পারিনি।’
১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধকালে খুলনা শহরে আজকের মত (২০১০) জনবসতি ছিলোনা। ছিলোনা গল্ল¬ামারী নদীর ওপর ব্রিজ। ছিলো না খুলনা-সাতক্ষীরা রোড। শহর থেকে অদূরবর্তী এই গল্ল¬ামারী জায়গাটি ছিল বেশ নির্জন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনিক ভবনটি (যেটিতে ভিসি বসেন) ছিল তখন একতলা। এই ভবন থেকে বেতার কার্যক্রম সম্প্রচার করা হতো। বেতার কেন্দ্র দখলের নামে শুরুতেই পাক সেনারা এ ভবনটির দখল নিয়ে নেয়। ভবনের অবস্থান ও আশেপাশের নির্জন এলাকা হয়ে ওঠে বধ্যভূমি। বঙ্গ সন্তানদের ধরে এনে এখানেই গুলি করে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জবাই করে হত্যা করা হতো। শেষে নিথর দেহ ভাসিয়ে দেয়া হতো গল্ল¬ামারীর স্রোতে।
১৯৭২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সংখ্যা দৈনিক বাংলায় (এই পত্রিকাটি এখন প্রকাশিত হয়না) এ প্রসঙ্গে লেখে ’সারাদিন ধরে শহর ও গ্রাম থেকে বাঙ্গালীদের ধরে এনে হেলিপোর্ট (এখন সেখানে নতুন সার্কিট হাউস ভবন) ও ইউএফডি ক্লাবে জমা করা হতো। তারপর মধ্যরাত হলেই সেইসব হতভাগ্য নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের পেছনে হাত বেঁধে বেতার কেন্দ্রের সামনে দাঁড় করিয়ে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দ্বারা ব্রাশ ফায়ার করা হতো। রক্তাপ্লুত দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়তো হতভাগ্যরা। হত্যার আগে ট্রাকে ভরে যখন সেইসব নিরুপায় মানুষদের নিয়ে যাওয়া হতো, তখন সেসব মানুষের আর্তনাদ রাস্তায় আশেপাশের মানুষ শুনতো। কিন্তু তাদের কিছু করার ছিলোনা। কারণ বাইরে কারফিউ। সেই আর্তনাদ সইতে না পেরে একদিন শেরে বাংলা রোডের এক ব্যক্তি জানালা খুলে মুখ বের করেছিল মাত্র, আর অমনি হানাদারদের গুলিতে তিনি লুটিয়ে পড়েন।’
দৈনিক বাংলা লিখেছে হানাদার বাহিনী প্রতিরাতে কম করে হলেও শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করতো। দিনের বেলায় তাদের লাশ জোয়ারের পানিতে ভেসে আসতো। কিন্তু কারও সাহস হতো না তাদের দাফন করার। অনেকে তাদের আপনজনের লাশ সনাক্ত করতে পারলেও সেখান থেকে তুলে আনার সাহস পায়নি। কিছুদিন পর জল্ল¬াদরা ঠিক করে, গুলি করে আর নয়। অন্য পন্থা। শুরু হলো জবাই করে হত্যা করা। আগে এসব হত্যাকান্ড রাতে ঘটানো হতো। পরে দিনেই হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। খুলনা শহর মুক্ত হওয়ার পর এখান থেকে অগুণতি মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়।
দৈনিক বাংলায় নিজস্ব প্রতিনিধি প্রেরিত একই দিন (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২) ’খুলনায় পাক বাহিনীর নরমেধযজ্ঞ’ শীর্ষক সংবাদে বলা হয়, ’ছবি তুলবার জন্যে গল্লামারীর অভ্যন্তরের ধানক্ষেতে ঢুকে দেখলাম এক নৃশংস দৃশ্য। একাধিক লাশ পড়ে আছে, সেদিকে একটি কুকুর খাচ্ছে আর দূরে অপর একটি লাশের পাশে আর একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে। মনে হয়, মানুষ খেয়ে তার পেট অতিমাত্রায় পরিপূর্ণ।’

খালিশপুর নয়াবাটির মুন্সিবাড়ি
একাত্তরে খালিশপুর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন মুন্সি সিদ্দকুর রহমান। তাঁর বাড়িটি ছিল খুলনা-যশোর রোড ও রেল লাইনের গাঁ ঘেষে। ওই বাড়িটি প্রতিরোধ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় একাত্তরের ৭ এপ্রিল ওই বাড়িতে সেনারা হামলে পড়ে। সাথে ছিল বিহারি জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। তারা বাড়িতে এসে মুন্সি সাহেবকে খুঁজতে থাকে। তাঁকে না পেয়ে তারা সেদিন ওই বাড়িটির মোট বারোজন পুরুষ সদস্যকে হত্যা করে। এরা হচ্ছেন এস এম শহিদুর রহমান (রুনু), এসএম লতিফুর রহমান (মোহন), মুন্সি মিজানুর রহমান (তপন), মুন্সি মনিরুল ইসলাম স্বপন, মুন্সি আলতাফ হোসেন, হাবিবুর রহমান, কাজী শহিদুল ইসলাম (মুকুল), লিয়াকত হোসেন, হারেজ শরীফ, এনায়েত শরীফ, সম্ভু ও আব্দুল আজিজ।

রঙপুরের হত্যাকান্ড
দিনটি ছিল বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। ওইদিন পাকসেনাদের একটি বহর প্রবেশ করে ডুমুরিয়ার রঙপুর গ্রামে। ওইদিনে রঙপুর, শলুয়া, ঘোণা, রামকৃষ্ণপুর, বটবেড়া, কৃষ্ণনগর, লতা প্রভৃতি গ্রামগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালিকে হত্যা করা হয়। এর প্রথম শিকার হন ভোম্বল মন্ডল নামের সত্তর বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। রঙপুর কালীবাটি এলাকায় মারা পড়েন ইন্দুভূষণ বিশ্বাস, লালচাঁদ বিশ্বাস এবং সকলের প্রিয় অভিভাবকতুল্য প্রফুল¬কুমার বিশ্বাস। স্বনামে খ্যাত প্রফুল¬ কুমার বিশ্বাস ১৯৩৩ সালে ম্যাট্রিক, ১৯৩৫ সালে বর্তমানের বিএল কলেজ থেকে আইএ, ১৯৩৭ সালে বিএ পাশ করে ১৯৪৬ সালে কলকাতা ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ থেকে বিটি পাশ করেন। গ্রামে এসে শুরু করেন শিক্ষকতা। একাধারে দশ বছর রঙপুর ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। সকলে তাঁকে গুরু বলতো। এই বৃদ্ধকেও তাঁর বাড়ি থেকে ধরে পাশের বিলে নিয়ে হত্যা করা হয়। এই গ্রামের রতন বিশ্বাস ও নীহার বিশ্বাসকেও শলুয়া বাজার থেকে ধরে নিয়ে তাদেরকে হত্যা করা হয়। ওইদিন পাকি সেনাদের হাতে আরও হত্যার শিকার হন অমূল্য মন্ডল, নির্মল ঢালী, অমূল্য জোদ্দার, মথুর ঢালী, মহেন্দ্রনাথ ঢালী।

দেয়াড়া (দিঘলিয়া)
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার দেয়াড়া গ্রামে একই পরিবারে ৬ জনসহ ৬০ জনকে তিনটি পৃথক স্থানে হত্যা করা হয়।  মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুর রহমান তাঁর দলবল নিয়ে দেয়াড়া গ্রামে অবস্থান করছে, এমন সংবাদের ভিত্তিতে ১৯৭১ সালের ২৭ আগস্ট ভোররাতে কয়েক’শ রাজাকার, বিহারী ও পাকি সেনারা সম্মিলিতভাবে দেয়াড়া গ্রামটি ঘিরে ফেলে। তারা একই পরিবারের ৬ সদস্য ডাঃ মতিয়ার রহমান, তার চাচাতো ভাই পিরু ও আলী, ভাগ্নে ছোট খোকা, জামাই আব্দুল জলিল, সহোদর আব্দুল বারিকসহ ঐ গ্রামের ৬১ জনকে ধরে নিয়ে যায়। সকাল ৯ টার দিকে এদেরকে প্রকাশ্যে দেয়াড়া গ্রামের পৃথক তিনটি স্থানে গুলি ও জবাই করে হত্যা করে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে শত আঘাতের পরেও সৈয়দ আবুল বাসার নামে এক ব্যক্তি প্রাণে বেঁচে যান। আবুল বাসার এখনো ধারালো অস্ত্রের ১৯টি ক্ষত চিহ্ন নিয়ে বেঁচে আছেন। এই লোমহর্ষক ঘটনা এলাকার শত শত মানুষ প্রত্যক্ষ করে। রাজাকাররা ২২ জনের লাশ পৃথক তিনটি স্থানে গণকবর দেয় এবং বাকী লাশগুলো পার্শ্ববর্তী ভৈরব নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
দেয়াড়া গণহত্যাস্থল থেকে একমাত্র জীবিত মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবুল বাসার আজ বয়সের ভারে নুব্জ। তিনি একটি মুদি দোকান দিয়ে কোন রকমে জীবিকা নির্বাহ করে চেলেছেন। তাঁর শরীরে রাজাকারদের ১৯টি আঘাতের চিহ্ন। অথচ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তাঁর নাম নেই।

বাজুয়া, চালনা ও হড্ডায় গণহত্যা
বাজুয়া বাজার স্কুল ও স্কুলমাঠে তখন শরনার্থীদের ভীর। দিনটি ১২ মে বুধবার। বেলা তিনটার দিকে পাকি সেনারা বাজুয়া বাজারে আক্রমণ চালায়। তারা গুলি করতে করতেই বাজারে নামে। এতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যারা ছুটে পালাতে গিয়েছে, আর তারাই মারা পড়েছে। সেখানে তখন বাগেরহাটের রামপাল এলাকার পিপুলবুনিয়া, জয়নগর, ভাগা, ভেকটমারী, নাদেরহুলা প্রভৃতি গ্রামের লোক ছিল। পাকিদের হাতে জীবিত অবস্থায় ধরা পড়ে পিপুলবুনিয়া গ্রামের হরিপদ মুখার্জী। তাকে পাকিরা নানা কথা জিজ্ঞাসা করে সারা শরীর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। মৃতদের নিথর দেহগুলো পাশের পশুর নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
বাজুয়া থেকে তাড়া খাওয়া শরণার্থী দলটির বিশাল বহর নৌক যোগে সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে ভারতে যাওয়ার পথে শিবসা নদীর পাড়ে হড্ডা (বর্তমানে কয়রা উপজেলাধীন) নামের এক জায়গায় খাবারের জন্যে জড়ো হন।  গ্রামটির দক্ষিণ পাড়েই সুন্দরবন। এখানে এই বাহিনীর ওপর আবু সাত্তার নামের এক লুটেরা বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হন। সাত্তারের বাহিনীর গুলিবর্ষণে এখানে বিশের অধিক সদস্য মারা যায়। এই শরণার্থী দলের কাছে একটি বন্দুক ছিল, তারা তাই দিয়ে আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। এতে আক্রমণকারীদের হোতা সাত্তারও সেখানে মারা যায়। তবে শরণার্থী দলটির স্বেচ্ছাসেবক ক্ষিতীশ ঢালী মারা যান। একইভাবে চালনা বাজারে পলায়নপর শরণার্থীদের ওপর ১৮ মে হামলা চালানো হয়। সেখানে বেছে বেছে দশজন পুরুষ সদস্যকে হত্যা করা হয়।

ডাকরার গণহত্যা
প্রতিদিনের ন্যায় স্বাভাবিকভাবেই ২১ মে‘র দিনটি শুরু হয়েছিল। তবে ডাকরাবাসীর মনে এক অজানা ভীতি বাসা বেঁধেছিল। আগের দিন ২০ মে বৃহষ্পতিবার শান্তি বাহিনীর সদস্যরা পাশের গ্রামে সভা করে নানা উত্তেজক কথাবার্তা বলে। তাদের লক্ষ্য ছিল হিন্দু জনগোষ্ঠী।
পশুর নদী থেকে উঠে আসা মংলা নদীটি রামপাল সদরের কাছে পূর্ব-পশ্চিমমুখো হয়ে বয়ে গেছে; যার উত্তরে বাঁশতলী আর দক্ষিণে ডাকরা গ্রাম। এই ডাকরা গ্রামের পূব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কুমারখালী খাল, পশ্চিমে মংলার শাখা নদী মাদরতলী। মংলা নদীর যেখান থেকে মাদারতলী উঠেছে সেই সঙ্গমস্থলে ডাকরা বাজার। তখন বাগেরহাটের নানা অঞ্চলে হিন্দু নিপীড়ন শুরু হয়েছে। সহায়-সম্পদ হারিয়ে শুধুমাত্র জীবনটাকে সম্বল করে অনেক মানুষ তাদের প্রিয় ভিটে-মাটি ছেড়ে অজানা নিরাপদ স্থানের দিকে পাড়ি জমিয়েছিল। এমনি কয়েকশ’ ঘরছাড়া পরিবার বৃহষ্পতিবার রাতে ডাকরা বাজারের মন্দির ও আশেপাশের জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।
২১ মে তারিখে সকাল দিকেই নৌকায় করে কিছু মানুষ নিরাপদ জায়গার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। বেশীরবাগ মানুষই রয়ে যায়। সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী ডাকরার বাসিন্দা পরিতোষ কুমার ব্যানার্জীর মতে, প্রায় চার থেকে পাঁচশো নৌকার যাত্রী বাজার ও মন্দির এলাকার ঘাটে অপেক্ষা করছিল। যারা এসেছিল ষায়েড়া, খানপুর, বাঁশবাড়িয়া, সাড়ে চারআনি, বেতকাটা, ভোজপাতিয়া, মহিষঘাটা প্রভৃতি এলাকা থেকে। অনকেগুলো নৌকা ছিল মাখা নদীতে। নৌকাবাসীরা খাওয়ার জন্যে নদীতীরের ফাঁকা জায়গায় রান্না করছিল। অনেকে কাপড়-চোপড় শুকোতে দিয়েছিল। বেলা দুটোর দিকে হবে। বেশ কয়েকটি বড় নৌকা আসতে দেখা গেল। সকলেই ধরে নিয়েছিল এগুলোও কোন শরণার্থীদের নৌকা। নৌকার বহরটি ডাকরার পূব পাশের খালের কাছে সামান্য সময়ের জন্যে অপেক্ষা করে। পরে কয়েকটি নৌকা কালিবাড়ির সোজাসুজি নদীর উত্তরপাড়ে কালিগঞ্জ বাজারের ঘাটের কাছে বেড়ে। বড় তিনটি নৌকা আরও এগিয়ে এসে কালিবাড়ি পিছনে রেখে মাদারতলী শাখা নদীতে গিয়ে ভেড়ে। এলাকাটিকে প্রায় ঘিরে এভাবে নৌকাগুলোর অবস্থান নেওয়ায়ও মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হয়নি। সকলেরই ভাবনা বিপদগ্রস্ত মানুষগুলো যেভাবে পারে একটু স্বস্তিতে থাকুক।
কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই এর রহস্য স্পষ্ট হলো। শুরু হলো গোলাগুলি, ধারালো অস্ত্রের আক্রমণ। মানুষকে একের পর এক হত্যা। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মানুষকে কেটে টুকরো করে সেকি উল¬াস! আক্রমণের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে যে যেদিকে পেরেছে ছুটে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কোথায় যাবে? তবুও কেউ কেউ ঝোঁপের আড়ালে, গাছে চড়ে, নৌকার খোলের মধ্যে গিয়ে, নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিজেদের আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। লুকিয়ে তাকা মানুষগুলোকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে হত্যা করেছে। নদীতে ডুবে যে বাঁচতে চেয়েছে, তার রক্তে নদীর রং লাল হয়েছে। যে নৌকাকে আশ্রয় করে মানুষ বাঁচতে চেয়েছিল, সেই নৌকার মালামাল লুটে নিয়ে নারী-শিশুসহ ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে। মায়ের কাছ থেকে সন্তানকে, স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামীকে, বোনের কাছ থেকে ভাইকে কেড়ে নিয়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। আক্রান্ত মানুষের আর্তচিৎকার, হামলাকারীদের অট্টহাসি, লুটেরাদের বিজয়োল¬াস -সবকিছু মিলিয়ে সে এক বিভৎস দৃশ্য। প্রাণভিক্ষা চেয়ে কেউই তাদেও কাছ থেকে রেহাই পায়নি। অনেককে বলা হয়েছে টাকা-পয়সা, সোনাদানা এনে দে; এনে দিয়েছে, তারপর হত্যা করা হয়েছে।
একাত্তরে পিস কমিটির বাগেরহাট শাখা প্রধান রজব আলি ফকিরের নেতৃত্বে ডাকরার এই গণহত্যা পরিচালিত হয়। সেদিন প্রধানতঃ কিশোর থেকে শুরু করে বয়সী পুরুষদের হত্যা করা হয়েছিল। লুটে নেয়া হয়েছিল অস্থাবর সম্পদ। মেয়েদের ওপর বেপরোয়া নির্যাতন করা হয়। বেশ কয়েকজন নারীকে তারা তুলে নিয়ে যায়। যাদেরকে আর কোনদিন ফিরে পাওয়া যায়নি। সেদিন পাকি দোসররা কত মানুষকে হত্যা করেছিল, তার হিসেব কেউ বলতে পারেনি। কেউ বলেন দুশো, কেউ বলেন তিনশো; আবার কেউ বলেন কমপক্ষে পাঁচশো হবে। কারণ, সেদিন ঘটনাস্থলে শুধুমাত্র ডাকরাবাসী নিহত হয়নি, হত্যার শিকার হযেছিল দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষেরাও। যাদেও প্রকৃত হিসাব কেউ কোনদিন বলতে পারেনি। অনেক লাশ পড়েছিল, অনকে লাশ নদীর শ্রোতে ভেসে যায়। অনেক লাশ পেট ফেড়ে নদেিত ডুবিয়ে দেয়া হয়। পেড়িখালি ইউনিয়নের একসময়ের চেয়ারম্যান শেখ নজরুল ইসলাম ৪৬৪টি লাশ দেখেছিলেন বলে এক বক্তব্যে বলেছেন। তাঁর মতে,  অনেক দিন লাশ পড়ে তাকায় এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়ায়। ডাঃ দেলোয়ার হোসেন নামের এক সহৃদয় ব্যক্তি বেশ কিছু লাশের দাফন করেন।

শাঁখারীকাঠির গণহত্যা
বাগেরহাট জেলাধীন কচুয়া-মোড়েলগঞ্জের সীমান্তবর্তী শাঁখারিকাঠিতেও একটি গণহত্যার ঘটনা ঘটে। একাত্তরের শেষ অথবা নবেম্বরের শুরুর দিককার কোন এক শুক্রবার হবে। দিনটি ছিল শাঁখারীকাঠির সাপ্তাহিক বাজারের দিন। স্থানীয় লোকদের কথায় হাটবার। যুদ্ধাবস্থা হলেও দিনটিতে সেখানে অনেক লোক জড়ো হয়। তখন সেখানে ছিল রাজাকার রজব আলী বাহিনীর দাপট। হঠাৎ করেই বাজারে বারো-চৌদ্দ জনের একদল রাজাকার আসে। তারা বাজারটির উত্তর-দক্ষিণ বরাবর দাঁড়ায়। তারা বেছে বেছে হিন্দু ধর্মালম্বীদের এক জায়গায় জড়ো করে। তাঁদের পরণের ধূতি খুলে একসঙ্গে দু’জন করে বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়।
শাখারীকাঠি বাজারটির পাশ দিয়ে একটি খাল বয়ে গেছে। এই খালটি কচুয়া এবং মোড়েলগঞ্জের মধ্যে সীমান্তরেখা। খালের ওপর একটি সেতু। যা দুই এলাকার মানুষের মধ্যে বজায় রাখে। খালের একপাশে শাঁখারীকাঠি, এটি কচুয়া উপজেলার সীমানায়; অপর পাড়ে দৈবজ্ঞহাটি, মোড়েলগঞ্জের সীমানায়। দৈবজ্ঞহাটিতে ছিল রাজাকারের আস্তানা। সেখান থেকে তারা এসে হাটে আসা মানুষদের একত্রিত করে। হাত বাঁধা মানুষগুলোকে খালপাড়ে দাঁড় করায়। এদেরকে মেরে ফেলার প্রস্তুতি দেখে নরুল্ল¬পুরের হোসেন জমাদ্দার ও কালো মুন্সি রাজাকারদের বেশ অনুনয়-বিনয় করে। মানুষগুলোর প্রাণভিক্ষা চায়। তারা বয়স্ক এই মানুষগুলোর কথায় কর্ণপাত না করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো মানুষগুলোকে পাখির মত গুলি করে হত্যা করে। গুলি খেয়ে সকলে খালের মধ্যে পড়ে যান। মনোহর দাশ নামের এক তরুণও ওই দলে ছিলেন। তিনিও খালের মধ্যে পড়ে যান। তবে কোন কারণে তার শরীর গুলিতে বিদ্ধ হয়নি। তিনি কোনরকমে নাকটি পানির ওপরে  তুলে ভেসেছিলেন। ঘন্টা দুয়েক এভাবে থাকার পর সবকিছু থেমে গেলে, চারিদিকে আঁধার হয়ে গেলে তিনি ডুব দিয়ে মোড়েলগঞ্জের পাড়ে গিয়ে ঝোপের মধ্যে লুকিয়েছিলেন। পরে এপারে আসেন।
এলাকাবাসীর মেতে, সেদিন সেখানে মোট ৩৩ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। এরমধ্যে শাখারীকাঠির ছিল দশজন। এরা হচ্ছেন অজিত দাম, নকুল চন্দ্র দাশ, গণেশ চন্দ্র দাশ, হরিপদ দাশ, সুভাষ চন্দ্র দাশ, কালিচরণ দাশ, বাসুদেব দাশ, রামকৃষ্ণ দাশ, অধির দাশ ও মহাদেব দাশ। এছাড়া রামচন্দ্রপুর গ্রামের নিরঞ্জন নামের এক ব্যক্তির পরিচয় পওয়া যায়। ৩৩টি মৃতদেহ চিহ্ণিত করতে পারলেও বাকী ২২ জনের নাম-পরিচয় এলাকাবাসী উদ্ধার করতে পারেনি। জানা যাযনি তারা কোন পরিবারের সদস্য। স্বাভাবিক ভীতির কারণে হিন্দু সদস্যরা আর খুব তাড়াতাড়ি সেই এলাকায় যায়নি। কয়েকজন সহৃদয় মুসলিম সদস্যরাই খালের মাথায় বড় গর্ত করে মৃতদের মাটিচাপা দেয়।
আশ্চর্যজনক হচ্ছে, এই গ্রামে কখনও পাকি সেনারা আসেনি। এই অঞ্চলের মধ্যে যশোরদি গ্রাম ছিল রাজাকারদের ঘাঁটি। বলা হতো গ্রামটির আশিভাগ মানুষই রাজাকার। যেহেতু এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠির মধ্যে হৃদ্যতা ছিল, সেকারণে অধিকাংশ হিন্দু ধর্মীয় জনগোষ্ঠিকে মুক্তিসেনাদের আশ্রয়দাতা চিহ্ণিত করে পাখির মত গুলি করে হত্যা করা হয়।

গৌরাঙ্গ নন্দী
খুলনা



>