কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি


কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি


রিপন গোয়ালা অভি, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি ।।

তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তাল গাছ’ কবিতার সেই তাল গাছের সাথে কবি রজনীকান্ত সেনের ‘বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই, কালজয়ী সেই কবিতার বাবুই পাখি খুঁজে নিয়েছে নিরাপদে বেঁচে থাকার নিবিড় আশ্রয়। এ কবিতা গুলো মানুষের মুখে মুখে আজো ভেসে বেড়ায় অতৃপ্ত বাসনায়। কারণ রবিঠাকুরের ‘তাল গাছ’ ও রজনীকান্তের ‘বাবুই পাখি’ কোনটিই আজ তেমন ভাবে চোখে পড়ে না। যে সকল বৃক্ষের আশ্রয়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা ছিলো, ওই সব বৃক্ষ নিধনের ফলে বাবুই চলে যাচ্ছে দূর বহুদূরে।
বাবুই পাখির বাসা আজ স্মৃতির অন্তরালের পথে। কিন্তু আজ থেকে প্রায় পনেরো বিশ বছর আগেও গ্রাম গঞ্জের তাল, নারকেল, ও সুপারি গাছে ব্যাপকভাবে চোখে পড়তো বাবুই পাখির বাসা। খড় কুটো দিয়ে তৈরি ঝুলন্ত বাবুই পাখির বাসা শুধু শৈল্পিক-নান্দনিক নিদর্শনই ছিল না, মানুষের মনে চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন এবং মনের জড়তা ভেঙে নিজের শ্রমে স্বাবলম্বী হতেও উৎসাহিত করতো। তাইতো আজো তৃতীয় শ্রেণির পাঠ্য বইয়ে বাবুই পাখিকে নিয়ে লেখা রজনী কান্তের ‘স্বাধীনতার সুখ’ পাঠ্যসূচি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উপরের কথা গুলো এভাবেই বলেন, স্থানীয় বিশ্বশ্বরী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসর প্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক দিলীপ কুমার সরকার।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা সদর রেল স্টেশন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রেল লাইনের পাশের রেলের জমির ওপর একটি সুবিশাল তাল গাছ। সেখানেই চোখে পড়ে শৈল্পিক ছোঁয়ায় তৈরি নয়নাভিরাম বাবুই পাখির বাসা, দোল খাচ্ছে দখিনা হাওয়ায়। একটু দূর থেকেই শোনা যায় বাবুই পাখির কলকাকলি। কিছু পাখি আবার ওড়াউড়ি করছে আশপাশ জুড়ে। কালের বিবর্তনে ওই রকম মনভোলানো দৃশ্য এখন আর তেমন একটা চোখে পড়ে না বললেই চলে।
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জ্ঞান কোষের আলোকে জানা যায়, বাবুইয়ের ইংরেজি নাম ইধুধ আর বৈজ্ঞানিক নাম চষড়ঢ়বঁং ঢ়যরষরঢ়ঢ়রহঁং। বাংলাদেশে (ক) বাংলা বাবুই, (খ) দাগি বাবুই ও (গ) দেশী বাবুই নামে তিন প্রজাতির বাবুই পাখির দেখা মেলে। তবে অন্যদের তুলনায় দেশী বাবুই পাখিই বেশি চোখে পড়ে। বাংলা বাবুই ও দাগি বাবুই বাংলা দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি। বাংলা বাবুই বাংলাদেশে অপ্রতুল, তথ্য শ্রেণিতে রয়েছে। অপরদিকে দেশি বাবুই বিশ্বে এবং বাংলাদেশে বিপদ মুক্ত বলে পরিচিত। বাংলাদেশের বন্য প্রাণি আইনে এই প্রজাতি সংরক্ষিত।
ওটঈঘ পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠনের রিভিউ থেকে জানা যায়, বাবুই পাখি বিপন্ন পাখির অন্তর্ভূক্ত নয়।
পাখি পর্যবেক্ষক ও শিশু সাহিত্যিক রহীম শাহ্ জানান, বাবুই পাখি বিপন্ন পাখির অন্তর্ভুক্ত না হলেও প্রজনন স্থান কমে যাওয়ার ফলে এরা স্থানান্তরিত হচ্ছে। আশ্রয়ের খোঁজে চলে যাচ্ছে দূর থেকে বহুদূরে। তিনি আরো জানান, সারাবিশ্বে বাবুই পাখির প্রজাতির সংখ্যা শতাধিক। বাবুই অনেকটা চড়াই সদৃশ পাখি। তাদের শৈল্পিক নিদর্শন গাছে বাঁধা ঝুড়ির মতো চমৎকার বাসা। আর ওই বাসার জন্যই এ পাখির পরিচিতি জগৎ জোড়া। বাবুই পাখি রাতের বেলা অন্ধকারে থাকতে পারে না। ফলে রাতের বেলায় ঘর আলোকিত করার জন্য এরা জোনাকি ধরে নিয়ে বাসায় রাখে এবং ভোরে আবার জোনাকিদের ছেড়ে দেয় মুক্ত আকাশে। প্রজনন সময় ছাড়া অন্য সময় পুরুষ ও স্ত্রী পাখির গায়ে কালো কালো দাগসহ পিঠ হয় তামাটে বর্ণের। তবে প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখির রঙ হয় গাঢ় বাদামি। বুকের কালো ডোরা ততটা স্পষ্ট নয়। প্রকট ভ্রƒরেখা কানের পেছনে একটি ফোটা থাকে। বাবুই পাখি সাধারণত তাল, খেজুর, নারকেল, সুপারি ও আখ ক্ষেতে বাসা বাঁধে। ধান, চাল, গম ও পোকা-মাকড় প্রভৃতি খেয়েই এ পাখি জীবন ধারণ করে থাকে।
এলাকার প্রবীণ কৃষক মো. হোসেন আলী (৮৬) ও আবুল কাশেম (৯৬) জানান, বাড়ির আঙিনায় তাল সুপারি ও নারকেল গাছে আগে ঝাঁকে ঝাঁকে বাবুই পাখিরা এসে বাসা বাঁধত। একটি গাছেই দেখা যেতো প্রায় ৪০/৫০ টি বাসা। আর তাদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে থাকতো চারপাশ। কিন্তু এখন গাছ পালা কমে যাওয়ার সাথে সাথে আগের মতো বাবুই পাখির বাসা দেখা যায় না। কোনো কোনো গাছে সর্বোচ্চ ৮/১০ টি বাসা দেখা যায়।
ঈশ্বরগঞ্জ কলেজের প্রাণি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম জানান, বর্তমানে তাল, নারকেল ও সুপারি গাছ কমে যাওয়ার বাবুই আর বাসা বাঁধতে পারে না। তাই তো এরা নিরাপদ নিবিড় আশ্রয়ের খোঁজে চলে যাচ্ছে দূর থেকে দূরান্তরে। বাবুই পাখি ও এর শৈল্পিক-নান্দনিক নিদর্শনকে টিকিয়ে রাখার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।



>