ইতিহাসের পাতায় নেই পশ্চিম তিলাপাড়ার নাম, অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে সুলতানী আমলের পুরাকীর্তি


ইতিহাসের পাতায় নেই পশ্চিম তিলাপাড়ার নাম,  অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে সুলতানী আমলের পুরাকীর্তি


উজ্জ্বল ধর:
সিলেটের বালাগঞ্জে প্রায় ৬শ বছরের পুরনো শিলালিপি ও পুরাকীর্তি সুলতানী আমলের স্মৃতি বহন করলেও ইতিহাসের পাতায় এর কোন স্থান নেই। উপজেলার বুরুঙ্গা ইউনিয়নের পশ্চিম তিলাপাড়ার সর্বত্র সুলতানী আমলেও কীর্তি ছড়িয়ে থাকলেও তা সংরক্ষনে প্রশাসন থেকে নেওয়া হচ্ছে না কোন উদ্যোগ। ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে ইলিয়াস শাহী বংশের অপূর্ব নির্দশনগুলো।
সরজমিনে দেখা যায়, পশ্চিম তিলা পাড়া গ্রামের প্রায় সর্বত্র জুড়ে রয়েছে সুলতানী আমলের কীর্তি। গ্রামের উত্তরাংশে জঙ্গলাবৃত্ত স্থানে শাহ আদম কাখী মোক্তার (রঃ)-নামে এক দরবেশের মাজার বিদ্যমান। (যার নামে মোক্তারপুর পরগণার নামকরণ হয়)। যদিও সে মাজারটি এখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম। এর দক্ষিনে বিশাল অংশ জুড়ে সুলতানী আমলের চিহ্ন রয়েছে। একাধিক স্থানে মাটির নীচে সারি সারি ইটের দেয়াল। প্রতিটি ইট দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে সাড়ে ৮ইঞ্চি। গ্রামের এক প্রবীণ জানান, এলাকার লোকজন জঙ্গল বেষ্টিত উঁচু জায়গা খুঁড়ে ইট নিয়ে যাওয়ার ফলে উক্ত জায়গা বর্তমানে সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে।
শাহ আদম কাখী মোক্তার (রঃ)-এঁর মাজারের উত্তরে রয়েছে তিলাপাড়া শাহী ঈদগাহ। কবে এ ঈদগাহ নির্মাণ হয়েছে তা কেউ বলতে পারে না। ১৯৫৪ সালে মাজারের দক্ষিন দিক থেকে উত্তরে এ ঈদগাহ স্থানান্তর করা হয়। মসজিদ এবং ঈদগাহের সামন জুড়ে থাকা সুলতানী আমলের বিশাল ৩টি দীঘির বৃহৎ অংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন অবস্থায় রয়েছে। পুরো গ্রাম জুড়ে থাকা সুলতানী আমলে নির্মিত ৫টি দীঘির সবগুলোর একই দশা।
শিলালিপির ব্যাপারে এলাকাবাসী জানান, এতদ অঞ্চলের লোকজন পশ্চিম তিলাপাড়ার বিশাল অংশ জুড়ে থাকা উঁচু জঙ্গলে একটি আয়তাকার পাথরের কাছে দুধ-কলা মানত করতো। ১৯৩৪ সালের দিকে এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তিরা সে পাথরটি সরাতে যান। ১৪ ইঞ্চি প্রস্থ, ৩২ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, ৭ ইঞ্চি পুরত্বের উক্ত পাথরটি উল্টিয়ে সেখানে ফার্সি ভাষায় ক্যালিওগ্রাফীর আদলে লেখা দেখতে পেয়ে পাথরটি জঙ্গল থেকে উঠিয়ে আনেন। সে সময় কেউই পাথরের গায়ে লেখার মর্ম উদ্ধার করতে না পারায় এর ছাপ প্রসিদ্ধ ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে (বর্তমান ভারতে) পাঠানো হয়। দারুল উলুম কর্তৃপক্ষ উক্ত ছাপ মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান। সেখান থেকে আরবীতে অনুবাদ হয়ে আসে। দারুল উলুম কর্তৃপক্ষ তা বাংলায় অনুবাদ করেন।
শিলালিপিতে উল্লেখ রয়েছে ‘খোদা পাক বলিতেছেন, মসজিদ সমূহ আল্লাহর জন্য। হজরত মোহাম্মদ (দঃ) বলিয়াছেন-যে ব্যক্তি খোদা পাকের জন্য একটি মসজিদ নিমার্ণ করিবে আল্লাহ তায়ালা তাহার জন্য বেহেশতের ভিতর একখানা ঘর তৈয়ার করিয়া রাখিবেন। সুবিচারক বাদশাহর মন্ত্রী মালিক সিকন্দর এই মসজিদ নিমার্ণ করিয়াছেন খিজিরপুর হইতে। মুরখান বাদশাহের পুত্র মাহমুদ শাহ তাহার পুত্র বারবাক শাহ, তাহারপুর ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে তাহার মন্ত্রী মালিক সিকন্দর এই মসজিদ নিমার্ণ করিয়াছেন ৮৮৪ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের ১০ তারিখ। এই মসজিদ মালিক সিকন্দর নির্মাণ করিয়াছেন, যে ব্যক্তি এই ওয়াকফ নষ্ট বা স্থানান্তরিত করিবে খোদার নিকট সে মরদুদ বা গাধার বাচ্চা হইয়া যাইবে।’
বাংলা অনুবাদ হয়ে আসার পর দীর্ঘদিন উক্ত শিলালিপি পশ্চিম তিলাপাড়া নিবাসী মোবারক আলী (কালাই মিয়া)র তত্বাবধানে ছিল। ১৯৩৬ সালে পাথর পাওয়ার স্থানে মুলি বাঁশ ও টিন দিয়ে একটি মসজিদ নির্মাণ করে এলাকাবাসী তাতে নিয়মিত নামায আদায় করেন। ১৯৫৯ সালে এলাকাবাসী মসজিদটি পাকা করণ করেন। পশ্চিম তিলাপাড়া মসজিদটি শিলালিপির উপর ভিত্তি করে নির্মিত এবং শিলালিপিতে সুলতানী আমলের কথা উল্লেখ থাকায় এ মসজিদের নাম হয় ‘পশ্চিম তিলাপাড়া শাহী মসজিদ’ (যা বর্তমানে বিদ্যমান)। মসজিদের মূল দ্বারের উপর ইটের গাঁথুনিতে রাখা হয় শিলালিপিটি। ২০০১সালে লোকজনের দেখা স্বার্থে উক্ত শিলালিপিটি শাহী মসজিদের প্রবেশ পথে রাখা হয়।
বাংলা, কামরুপ ও আসামের প্রাচীন ও মধ্য যুগের ইতিহাস থেকে জানা যায়, শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ রুকনুদ্দীন বাবরক শাহের পুত্র ও উত্তরাধীকারী। তিনি শামস উদ্দিন আবুল মুজাফফর ইউসুফ শাহ উপাধী ধারণ করে ৮৭৯ হিজরীতে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর রাজত্বকাল ছিল ১৪৭৪খ্রীঃ থেকে ১৪৮১খ্রীঃ পর্যন্ত। ইউসুফ শাহের রাজ্য পশ্চিমে উড়িষ্যা ও পূর্বে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত্ব ছিল। তিনি একজন আদর্শ, বিচক্ষণ ও দক্ষ শাসক ছিলেন। ইউসুফ শাহের রাজত্ব কালে অনেক মসজিদ নির্মাণ করা হয়। সিলেটে সুলতানী আমলে প্রশাসনিক ভবন ছিল বলেও ইতিহাস সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, পশ্চিম তিলা পাড়ায় অনুরুপ ভবন ছিল। শাহী কর্মচারীদের নামায আদায়ের জন্য মসজিদ ও ঈদগাহ্ নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শিলালিপিতে উল্লেখিত খিজিরপুর (সোনারগাঁ) হচ্ছে বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমলের রাজধানী। এই খিজিরপুর নগরী অতি প্রাচীনকাল থেকেই একটি ঐতিহাসিক জনপথ ও আর্ন্তজাতিক ভাবে প্রসিদ্ধ নদী বন্দর। বিশ্ববিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা তার ভ্রমন কাহিনীতে উল্লেখ করেন, খিজিরপুর ও শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড়ের কত্রাভূ সফরকালে ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও শীতলক্ষ্যার সঙ্গমস্থলে কয়েক মাইল বিস্তৃত জলরাশি দেখতে পান। এ অঞ্চল যখন প্রাচীন কামরুপ রাজ্যের অধীন ছিল তখন কামরুপ রাজ্যের দক্ষিন সীমানা ছিল ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যার সঙ্গমস্থল খিজিরপুর বর্তমান নারায়নগঞ্জ।
পশ্চিম তিলাপাড়ায় পাওয়া শিলালিপিতে উল্লেখিত মালিক সিকন্দর ছিলেন ইউসুফ শাহের উজির (শার ই লস্কর)। উজিরের পুরো নাম মালিক উদ্দিন ওরফে মালিক সিকন্দর। সে সময় এ অঞ্চলে প্রায়ই মালিক সিকন্দরের আগমন ঘটতো। তিনি উক্ত মসজিদ নির্মান করেন বলেও শিলালিপিতে লিখিত। হযরত শাহজালাল (রঃ) এঁর মাজারেও সুলতানী আমলের একটি শিলালিপির অস্তিত্ব বিদ্যমান। ধারণা করা হয়, উপমহাদেশের প্রখ্যাত দরবেশ শাহ আদম কাখী মোক্তার (রঃ)- সম্রাট আকবর (মোঘল সাম্রাজ্যের দীর্ঘ শাসক। ১৫৫৬ খ্রীঃ থেকে ১৬০৫ খ্রীঃ পর্যন্ত তিনি রাজত্ব করেন) এঁর আমলে এ অঞ্চলে আসার সময়ও এখানে সুলতানী আমলের কীর্তি বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীতে ভূমিকম্প বা অন্য কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যয় ঘটে।
ঐতিহাসিক তথ্যাবলী হতে জানা যায়, বিগত ১৮৬৯ খ্রীষ্টাব্দে সিলেটে সবচেয়ে বেশী মাত্রায় প্রলয়ংকারী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এ ভূমিকম্পে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন দালান-কোঠা ভেঙ্গে পড়ে ও নদীর তীর দেবে যায়। উঁচু ভূমি নিু ভূমিতে পরিণত হয়। এ ভূমিকম্পে পশ্চিম তিলাপাড়ার উক্ত কীর্তি সমূহ বিলিন হয়ে যায় বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। তারপর দীর্ঘদিন অবহেলায় থাকা এ অংশটা জঙ্গলে পরিণত হয়। ১৯০০ সাল থেকে এলাকাবাসী বিস্তির্ণ এ জঙ্গলকে কবরস্থান হিসাবে ব্যবহার করে আসলে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এলাকার কিছু ব্যক্তির বাধার কারণে ইদানিং এখানে কবর খনন বন্ধ রয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালে এখানে আট হাত লম্বা একটি কবরের সন্ধান পাওয়া যায়। ইটের গাথুনীতে তৈরী উক্ত কবরও সুলতানী আমলের চিহ্ন বহন করে।
১৯৫৪ থেকে একটানা ৪৮বছর তিলাপাড়া শাহী ঈদগাহ রক্ষণা-বেক্ষনের দায়িত্বে থাকা মরহুম হাজী মুহিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক লিখিত একটি স্মরণীকা থেকে জানা যায়, নবাবী আমলে উক্ত মসজিদ, ঈদগাহসহ এ এলাকার ৬ একর ভূমি নিস্কর ভূমি হিসাবে ওয়াকফ্ করা হয়েছিল। ভারত বর্ষে বৃটিশ শাসন শুরু হবার পর উক্ত ভূমিতে কর ধার্য্য করা হয়। শাহ আদম কাখী মোক্তার (রঃ) -এঁর উত্তরসূরী মেহেদী ফকির বাদী হয়ে ১৮৪৩ খ্রীষ্টাব্দে মামলা করে নিস্কর চেরাগী ভুমি বহাল রাখেন। ১৯৫৪ সালে শাহ আদম কাখী মোক্তার (রঃ) এঁর মাজারের উত্তরে এক কেদার ভূমিতে শাহী ঈদগাহটি স্থানান্তর করা হয়। ১৯৭০ সালে মসজিদ-ঈদগাহের সামনের দীঘির খনন করার সময় দীঘির প্রায় ৪ হাত নীচে নবাবী আমলে নির্মিত একটি ঘাট পাওয়া যায়। (তবে অনেকেই এতে ভিন্নমত পোষন করে বলেন, এ ঘাটের নিমার্ণ শৈলী সুলতানী আমলের বলে প্রতিয়মান হয়)। পাকিস্তান আমলে উক্ত ভূমি জনৈক ব্যক্তি নিজ নামে রেকর্ড করিয়ে নেন। বার বার দেন দরবার করেও ঈদগাহ কমিটি এ ভূমি দখল মুক্ত করতে পারেনি।
বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহঃ প্রধান শিক্ষক মোঃ নূরুল হক জানান, এখানে মাটির নীচে ধ্বংসপ্রাপ্ত কীর্তির অনেক কিছুই থাকতে পারে। এ ব্যাপারে প্রত্মতত্ব বিভাগের উদ্যোগী হওয়া উচিত। পশ্চিম তিলাপাড়া শাহী মসজিদের বর্তমান সেক্রেটারী শেখ আছকর আলী জানান, ইতিহাস সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয় এখানে সুলতানী আমলে প্রশাসনিক ভবন ছিল। মসজিদ, ঈদগাহ ও দৃষ্টিনন্দন দীঘি সে সময়ের তৈরী। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এ কীর্তি ধ্বসে থাকতে পারে। তিনি পুরাকীর্তি ধরে রাখতে প্রশাসনের সহায়তা কামনা করেন।



>