ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাট করে ব্যক্তি ও দলীয় ইমেজ নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে সদ্য প্রকাশিত শ্বেতপত্রে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগীরা ব্যক্তিপূজা ও রাজনৈতিক প্রচারণায় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের নামে সরাসরি আওয়ামী রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করা হয়েছে—এমন বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ৪৭২ পৃষ্ঠার এই শ্বেতপত্রে। এতে বলা হয়েছে, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন এবং সিআরআইয়ের মাধ্যমে ‘মুজিব ভাই’ চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ২১১ কোটি ২২ লাখ টাকা। একইভাবে ‘খোকা’ সিনেমা নির্মাণের নামে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি টাকা।
এই ব্যয় আদৌ তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোনো কাঠামোগত সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রেখেছে কিনা, নাকি রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার হয়েছে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইমেজ নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে শ্বেতপত্রে।
শ্বেতপত্রের ১৩টি অধ্যায়ে আইসিটি অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, এটুআইসহ রাষ্ট্রীয় একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, সিন্ডিকেশন এবং আর্থিক লুটপাটের দলিলভিত্তিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাস্তব চাহিদা ও সক্ষমতা বিশ্লেষণ ছাড়াই দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক ও আইটি ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। অনেক প্রকল্প কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলেও কোথাও প্রশিক্ষক নেই, কোথাও প্রশিক্ষণার্থী নেই—তবুও শতভাগ বিল উত্তোলন করা হয়েছে। ১২টি আইটি পার্ক, ডিইইআইডি, ইডিসি, আইডিয়া প্রকল্প ও ফোর-টায়ার ডাটা সেন্টারসহ একাধিক মেগা প্রকল্পে অযৌক্তিক ব্যয়, স্বজনপ্রীতি ও সিন্ডিকেশনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আইটি ট্রেনিং, ফ্রিল্যান্সিং ও ই-কমার্স খাতে বাস্তবায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোতেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও দলীয়করণের স্পষ্ট আলামত মিলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আওয়ামীবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত নন’—এমন নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্পের আওতায় ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়েছে।
লানিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলইডিপি)-এ জাল প্রশিক্ষক নিয়োগ, একই প্রশিক্ষণ একাধিকবার দেখিয়ে বিল উত্তোলন এবং বাস্তব দক্ষতা অর্জন ছাড়াই সনদ বিতরণের ঘটনাও উঠে এসেছে শ্বেতপত্রে।
শ্বেতপত্রের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে আইসিটি খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি সুবিধাভোগী চক্র নীতিনির্ধারণে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করেছে। এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং দেশীয় আইটি শিল্পের বড় একটি অংশ রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষক হিসেবে যাদের দেখানো হয়েছে, তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ছিল না। কোথাও একই ব্যক্তিকে একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইসিটি খাতের কিছু বাণিজ্যিক সংগঠনকেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের আলামত পাওয়া গেছে। এলইডিপি প্রকল্পের বড় অংশই ছিল সার্টিফিকেটনির্ভর। কার্যকর দক্ষতা মূল্যায়ন ছাড়াই সনদ বিতরণের ফলে কাগজে-কলমে হাজার হাজার ফ্রিল্যান্সার তৈরি হলেও বাস্তবে তাদের বড় অংশ বাজারে টেকেনি।
শ্বেতপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এটি কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক দলিল নয়। বরং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তি তৈরির উদ্দেশ্যেই এই তদন্ত। এতে আইসিটি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা জোরদার এবং কঠোর নজরদারি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা ছাড়া এই শ্বেতপত্রও অতীতের অনেক প্রতিবেদনের মতো ‘ফাইলবন্দি দলিল’ হয়ে থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইসিটি খাতের শ্বেতপত্র প্রকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এটি তখনই কার্যকর হবে, যখন সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
উল্লেখ্য, উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটিতে আরও ছিলেন পিজিসিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজওয়ান খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চৌধুরী মফিজুর রহমান, পারডু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মুহাম্মদ মুস্তাফা হোসেন, বুয়েটের অধ্যাপক রিফাত শাহরিয়ার, ব্যারিস্টার আফজাল জামি সৈয়দ আলী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আসিফ শাহরিয়ার সুস্মিত এবং সাংবাদিক মো. শরিয়ত উল্লাহ।

বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন