বাংলাদেশে জমির খতিয়ানে ভুল পাওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। অনেক সময় মালিকের নামের বানান ভুল, দাগ বা অংশ নম্বরে গরমিল, এমনকি প্রতারণার মাধ্যমে অন্যের নামে জমির রেকর্ড চলে যাওয়ার ঘটনাও দেখা যায়। কোথাও আবার নামজারি খতিয়ানের মূল কপিই হারিয়ে যায়। এসব সমস্যার আইনগত সমাধান থাকলেও প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হন।
এই বাস্তবতায় ভূমি মন্ত্রণালয় ২০২১ সালের ২৯ জুলাই জারি করা একটি গেজেটের মাধ্যমে খতিয়ান সংশোধনের সহজ ও নির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে। রেকর্ড সংশোধন পরিপত্র (নং–৩৪৩) অনুযায়ী, নামজারি বা মিউটেশন খতিয়ানে ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে ‘মিস কেস’ দায়ের করে সংশোধনের আবেদন করা যায়।
ভূমি জরিপের সময় মৌজা ভিত্তিক যে নথিতে জমির মালিকানা, দাগ নম্বর, পরিমাণ, শ্রেণি ও খাজনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়, সেটিই খতিয়ান। এক বা একাধিক মালিকের জমির তথ্য এতে সংরক্ষিত থাকে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী একাধিক ধরনের খতিয়ানের প্রচলন রয়েছে।
ব্রিটিশ আমলে ১৯১০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে মাঠপর্যায়ে জমি মেপে প্রস্তুত করা খতিয়ান সিএস খতিয়ান নামে পরিচিত। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর সিএস খতিয়ান সংশোধনের মাধ্যমে এসএ খতিয়ান তৈরি করা হয়, যা অনেক এলাকায় ‘৬২-এর খতিয়ান’ নামেও পরিচিত।
এসএ জরিপে মাঠপর্যায়ে সরেজমিন তদন্ত না হওয়ায় বহু ক্ষেত্রে ত্রুটি থেকে যায়। এসব ত্রুটি সংশোধনের জন্য পরবর্তীতে সরেজমিনে জমি মাপঝোঁক করে যে খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়, সেটিই আরএস খতিয়ান। অনেক এলাকায় এটিকে বিএস খতিয়ান হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়।
সর্বশেষ জরিপ হিসেবে ১৯৯০ সালে পরিচালিত এই খতিয়ান ঢাকা মহানগর এলাকায় মহানগর জরিপ নামেও পরিচিত।
খতিয়ান সংশোধনের জন্য সাধারণ সাদা কাগজে আবেদন লিখে ২০ টাকার কোর্ট ফি সংযুক্ত করতে হয়। সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, খতিয়ান ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক জমির কাগজ জমা দিতে হয়। আবেদন যাচাই শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
যদি কেউ জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের জমি নিজের নামে নামজারি করে নেয়, সেক্ষেত্রেও ‘মিস কেস’ দায়ের করে তা বাতিলের আবেদন করা যায়। শুনানি ও প্রমাণ যাচাই শেষে যথাযথ কাগজপত্র থাকলে আগের মালিকের নামে রেকর্ড পুনর্বহালের সুযোগ রয়েছে।
নামজারি বা খারিজ খতিয়ানের মূল কপি হারিয়ে গেলে প্রথমে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হবে। এরপর জিডির কপি ও ২০ টাকার কোর্ট ফি সংযুক্ত করে এসিল্যান্ড বরাবর আবেদন জমা দিতে হয়। যাচাই শেষে সন্তোষজনক প্রমাণ মিললে নতুন খতিয়ান প্রদানের আদেশ দেওয়া হয়।
এই আদেশ অনুযায়ী ১০০ টাকা ফি পরিশোধ করলে নতুন খতিয়ান সংগ্রহ করা যায়, যার বিপরীতে ‘ডিসিআর’ রশিদ প্রদান করা হয়।
নামজারি ছাড়াও সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস খতিয়ান হারিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট মৌজা ও খতিয়ান নম্বর উল্লেখ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড রুমে আবেদন করলেই তা সংগ্রহ করা সম্ভব।
নামজারি খতিয়ান সংশোধনে সাধারণত ৩০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে। ইউনিয়ন ভূমি অফিসের প্রতিবেদন ও শুনানি শেষে কোনো আপত্তি না থাকলে সংশোধিত খতিয়ান অনুমোদন করা হয়।
State Acquisition and Tenancy Act, 1950-এর ১৪৩ ধারা ও প্রজাস্বত্ব বিধিমালা ১৯৫৫-এর ২৩(৩) ধারা অনুযায়ী করণিক ভুল সংশোধনের ক্ষমতা এসিল্যান্ডের রয়েছে। জালিয়াতির অভিযোগ থাকলে ২৩(৪) ধারায় তদন্ত ও শুনানির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে মাঠপর্যায়ে অনেক সময় ভূমি অফিসের অনীহার কারণে আবেদনকারীদের আদালতের শরণাপন্ন হতে বলা হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
খতিয়ানের ভুল সংশোধন এখন আইনগতভাবে সহজ হলেও সচেতনতা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা বাড়ানো না গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি পুরোপুরি কমবে না।

শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন