আজ ৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। বিশ্বব্যাপী ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চিকিৎসাসেবায় সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিবছর এই দিনটি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব ক্যান্সার দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘আসুন ক্যান্সার সেবায় বৈষম্য দূর করি’, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবায় বিদ্যমান অসমতার দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর তথ্যমতে, ২০১৮ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯৬ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। উন্নত চিকিৎসা থাকা সত্ত্বেও ক্যান্সার এখনো বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি।
বিশ্ব ক্যান্সার দিবসের যাত্রা শুরু হয় ২০০০ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে, ক্যান্সারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে। সেখানে ক্যান্সার প্রতিরোধ, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ইউনিয়ন ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্যান্সার কন্ট্রোল (ইউআইসিসি) প্রথমবারের মতো এই দিনটিকে বিশ্বব্যাপী উদযাপনের উদ্যোগ নেয়।
ইউআইসিসি (Union for International Cancer Control) বিশ্ব ক্যান্সার দিবস উদযাপনের প্রধান সংগঠক। সংস্থাটির সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত। বর্তমানে ইউআইসিসি’র কার্যক্রম ১৭০টিরও বেশি দেশে বিস্তৃত এবং প্রায় ২ হাজার সদস্য সংস্থা এর সঙ্গে যুক্ত। ক্যান্সারের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত করাই সংস্থাটির মূল লক্ষ্য।
বিশ্ব ক্যান্সার দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ক্যান্সারের চিকিৎসা যেন কেবল ধনী বা উন্নত দেশের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। গ্রামাঞ্চল, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, নারী ও প্রান্তিক জনগণের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত ক্যান্সার সেবা নিশ্চিত করাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বিশ্ব ক্যান্সার দিবসে বিভিন্ন দেশে আয়োজন করা হয়—
সচেতনতামূলক সেমিনার ও আলোচনা সভা
বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা
ক্যান্সার স্ক্রিনিং ক্যাম্প
শিক্ষামূলক কর্মশালা
সামাজিক ও অনলাইন ক্যাম্পেইন
এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্যান্সারের ঝুঁকি, উপসর্গ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে ৩০–৪০ শতাংশ ক্যান্সার প্রতিরোধ সম্ভব।
প্রচুর শাকসবজি ও ফল (বিশেষত ব্রোকলি, বাঁধাকপি, গাজর, টমেটো)
লাল ও হলুদ ফল (পেঁপে, আম, কমলা)
আঁশযুক্ত খাবার (ওটস, লাল চাল, আটার রুটি)
রসুন ও হলুদ (প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ক্যান্সার উপাদান)
পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি
মাছ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য (সবচেয়ে বড় ঝুঁকি)
অতিরিক্ত লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
অতিরিক্ত তেল ও ভাজাপোড়া
চিনি ও সফট ড্রিংকস
অতিরিক্ত অ্যালকোহল
নিয়মিত শরীরচর্চা (প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট)
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
পর্যাপ্ত ঘুম
মানসিক চাপ কমানো (ধ্যান, নামাজ, যোগব্যায়াম)
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
নারীদের জন্য স্তন ও জরায়ু ক্যান্সার স্ক্রিনিং
পুরুষদের জন্য প্রোস্টেট ও ফুসফুস পরীক্ষা
বিশ্ব ক্যান্সার দিবস কেবল একটি দিবস নয়— এটি একটি বৈশ্বিক প্রতিজ্ঞা। ক্যান্সার প্রতিরোধ, সময়মতো শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাসেবায় সমতা নিশ্চিত করাই এই দিবসের মূল আহ্বান। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরকার, চিকিৎসক, গবেষক ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ করতে।
আজ বিশ্ব ক্যান্সার দিবসে আমাদের অঙ্গীকার— সচেতন হবো, প্রতিরোধ করবো এবং বৈষম্যহীন ক্যান্সার সেবার জন্য সোচ্চার থাকবো।

শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন