বাংলাদেশকে আকারের দিক থেকে বিশ্বের ৩৫তম অর্থনীতি থেকে ২০তম স্থানে উন্নীত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার দাঁড়াবে ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মাথাপিছু আয় হবে ১০ হাজার ডলার।
এই লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, আইসিটি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে দলটি। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত ‘জনতার ইশতেহার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতের ৪১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়।
ইশতেহার উন্মোচন করেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ে ঘোষিত এই ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ২৬টি বিষয়কে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ইশতেহারটি প্রণয়নে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন খাতের ২৫০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ জনগণের মতামত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক দলের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ইশতেহার ঘোষণাকালে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন,
“আমরা কোনো দলীয় সরকার গঠন করতে চাই না। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই যা হবে জনতার, জনগণের।”
তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে একটি জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, শান্তি ও শৃঙ্খলাবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন,
“আমরা বেকার ভাতা দিতে চাই না। এটা যুবকদের জন্য অপমান। আমরা তাদের হাতে কাজ তুলে দেব। যুবকরাই আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।”
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, চা শ্রমিকের সন্তানও একদিন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পাবে।
জামায়াতের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র
বৈষম্যহীন ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ
যুবকদের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অগ্রাধিকার
নারীদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র
মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ
দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট সমাজ
কৃষিতে প্রযুক্তি বিপ্লব
২০৩০ সালের মধ্যে ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা
সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন
ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কার
কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন
স্বল্পমূল্যে আবাসন
সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা
সুশাসনের মাধ্যমে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
ইশতেহারের তৃতীয় অধ্যায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়—
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত করা
রাজস্ব আহরণ জিডিপির ১৪ শতাংশে নেওয়া
সরকারি ব্যয় জিডিপির ২০ শতাংশে উন্নীত করা
বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের নিচে রাখা
করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা
করপোরেট ট্যাক্স ২০ শতাংশের নিচে নামানো
বিনিয়োগ বন্ড মার্কেট চালু
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন
খেলাপি ঋণ দ্রুত সহনীয় পর্যায়ে নামানো
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা
শেয়ারবাজারে কারসাজি বন্ধ
শিল্প খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াত আমির বলেন,
“শিল্পকে শিশুর মতো লালন-পালন করা হবে।”
এসএমই খাতকে কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রবাসী কর্মীদের জন্য সামাজিক অন্তর্ভুক্তিমূলক তহবিল গঠনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারে বলা হয়েছে—
গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা
মাতৃত্বকালীন সময়ে সম্মতি সাপেক্ষে কর্মঘণ্টা ৫ ঘণ্টায় নামানো
ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন
খণ্ডকালীন চাকরির ব্যবস্থা
উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী মন্ত্রী নিয়োগ
ডা. শফিকুর রহমান বলেন,
“আমরা নারীদের চাকরি ছাড়াতে চাই না, বরং তাদের সম্মান দিতে চাই।”
ইশতেহারে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, মুসলিম বিশ্বসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাতে ‘ডিফেন্স ভিশন ২০৪০’, জাতীয় সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় অস্ত্র উৎপাদনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
জামায়াতের ইশতেহারে আটটি অধ্যায়ে ৪১টি খাত ও উপখাতে রাষ্ট্র সংস্কার ও উন্নয়নের বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। দলটির দাবি, সুশাসন, ইনসাফ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি সুখী, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্রে রূপান্তর করা সম্ভব।

শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন