বাংলাদেশে হালাল পণ্যের সম্ভাবনা বিপুল হলেও বাস্তব বাজারে এর প্রভাব এখনো সীমিত। বহুজাতিক থেকে শুরু করে দেশীয় বড় করপোরেটের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও হালাল ব্র্যান্ডিং ভোক্তা আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারেনি—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
২০১৭ সালে হিজাব ব্যবহারকারী নারীদের লক্ষ্য করে ইউনিলিভার বাংলাদেশ বাজারে আনে সানসিল্ক হিজাব রিফ্রেশ শ্যাম্পু। দীর্ঘ সময় আবৃত মাথার চুলের বিশেষ যত্নের ধারণা সামনে রেখে পণ্যটি আনা হলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউনিলিভারের মোট শ্যাম্পু বিক্রিতে এ পণ্য উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেনি। একইভাবে ‘অ্যারোমেটিক হালাল সাবান’সহ আরও কয়েকটি পণ্যও হালাল পরিচয় থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারে টেকেনি।
বিপণন বিশ্লেষকদের মতে, ভোক্তা আনুগত্য তৈরিতে হালাল সনদ এককভাবে কার্যকর নয়। পণ্যের গুণমান, দাম ও ব্যবহারের অভ্যাসই শেষ পর্যন্ত ক্রয় সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় ভোক্তাদের বড় অংশের মধ্যেই একটি সাধারণ ধারণা কাজ করে—দেশীয় পণ্য এমনিতেই হালাল।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, হালাল সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে কাজি অ্যান্ড কাজি টি এস্টেট, নেসলে বাংলাদেশ, ব্র্যাক চিকেন, এসিআই, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, প্যারাগন, প্রাণ ডেইরি, আকিজ, ইস্পাহানি, বম্বে সুইটস, ইউনিলিভার বাংলাদেশসহ আরও অনেক বড় করপোরেট। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের হালাল সনদপ্রাপ্ত পণ্যের বড় অংশই খাদ্যপণ্যকেন্দ্রিক।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালনাগাদ তালিকায় দেখা যায়—
ইউনিলিভার: নর স্যুপ
নেসলে: নুডলস ও সিরিয়াল
কাজি অ্যান্ড কাজি: চা
ব্র্যাক: ফ্রেশ ও হিমায়িত চিকেন
স্কয়ার: চানাচুর, হালিম মিক্সসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য
প্রাণ ডেইরি: পরোটা, সমুচা, শিঙাড়া
দেশের বড় করপোরেটগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খাদ্যপণ্য ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, প্রসাধনী কিংবা সেবা খাতে হালাল সনদের প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে খাদ্যনির্ভর কোম্পানি ছাড়া অন্যদের মোট টার্নওভারে হালাল সনদপ্রাপ্ত পণ্যের অংশ খুবই কম।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন,
“আমাদের ব্যর্থতা হলো হালাল পণ্যের ধারণাকে আমরা ক্যাপিটালাইজ করতে পারিনি। মুসলিম দেশ হওয়ায় ভোক্তারা ধরে নেন সবই হালাল। ফলে আলাদা করে এর প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করেন না।”
আন্তর্জাতিকভাবে হালাল পণ্যের বাজার দ্রুত বাড়লেও বাংলাদেশ সেখানে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। বিপণন সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের হালাল সনদপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে রফতানি বাজারে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
২০০৭ সাল থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন হালাল সনদ প্রদান শুরু করে। সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়—
২৫৬টি প্রতিষ্ঠান হালাল সনদপ্রাপ্ত
প্রায় ২ হাজার পণ্য সনদের আওতায়
৭৬টি কোম্পানি ৪৬টি দেশে ৬০০টির বেশি পণ্য রফতানি করেছে
বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পাশাপাশি বিএসটিআইও হালাল সনদ প্রদান করছে।
প্রিসিডেন্স রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক হালাল খাদ্যপণ্যের বাজার ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০৩৪ সালে বেড়ে ৯ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
দিনারস্ট্যান্ডার্ডের স্টেট অব গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমি রিপোর্ট ২০২৪-২৫ অনুযায়ী—
বাংলাদেশে হালাল খাদ্যের সম্ভাব্য বাজার: ১৩৮.৫ বিলিয়ন ডলার
হালাল পোশাক: ১৭.৫৭ বিলিয়ন ডলার
হালাল প্রসাধনী: ৪.২৪ বিলিয়ন ডলার
এনবিইআর চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম বলেন,
“বাংলাদেশে হালাল পণ্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পণ্য পার্থক্যকরণ ও ইউনিক সেলিং প্রপোজিশনের অভাব। হালাল সনদ এখনো বিশ্বাসযোগ্য ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করতে পারেনি। অনেক ভোক্তা এটাকে কেবল মার্কেটিং কৌশল হিসেবে দেখেন।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোক্তা সচেতনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং কার্যকর বিপণন কৌশল ছাড়া বাংলাদেশে হালাল পণ্যের বাজার শক্ত ভিত্তি পাবে না। নীতিগত সংস্কার ও সমন্বিত প্রচারণা ছাড়া এই খাত তার সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারবে না।

শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন