বিয়ে শুধু দুটি মানুষের সামাজিক বন্ধন নয়; এটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা–র কাছে এক পবিত্র ইবাদত ও আমানত। এই সম্পর্ককে সম্মানিত ও নিরাপদ করতে ইসলাম নারীর জন্য যে মৌলিক অধিকারটি নিশ্চিত করেছে, তা হলো মোহর। মোহর কোনো সৌজন্য উপহার বা লৌকিক রীতি নয়—এটি স্ত্রীর ন্যায্য, বাধ্যতামূলক প্রাপ্য। অথচ সমসাময়িক সমাজে মোহর নিয়ে যেমন অতিরঞ্জন দেখা যায়, তেমনি অবহেলাও কম নয়। এই বাস্তবতায় মোহরে ফাতেমি আমাদের সামনে ভারসাম্যপূর্ণ, বরকতময় ও নববি আদর্শ হিসেবে উদ্ভাসিত হয়।
ইসলামে মোহরের কোনো সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত হয়নি। তবে নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা মানা সুন্নত ও বাস্তবসম্মত—
মোহর এমন হওয়া উচিত, যা স্বামী সহজে পরিশোধ করতে সক্ষম হন। সামর্থ্যের বাইরে মোহর ধার্য করা ইসলামের শিক্ষা নয়; বরং তা ভবিষ্যতে জুলুমের কারণ হতে পারে।
কনের পারিবারিক অবস্থা, সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা ও তার সমমানের নারীদের বিয়েতে যে মোহর নির্ধারিত হয়েছে—এসবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা উত্তম।
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ ১০ দিরহাম—অর্থাৎ প্রায় ৩০.৬১৮ গ্রাম বা ২.৬২৫ তোলা রুপা। এর কম মোহর নির্ধারণ করা জায়েজ নয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা কুরআনে ইরশাদ করেন—
“আর তোমরা নারীদের খুশিমনে তাদের মোহর প্রদান করো।” (সূরা নিসা: আয়াত ৪)
রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর প্রিয় কন্যা হজরত ফাতিমা (রা.)–এর বিয়েতে হজরত আলী (রা.)–এর ওপর যে মোহর নির্ধারণ করেছিলেন, সেটিই মোহরে ফাতেমি নামে পরিচিত। এটি মুসলিম সমাজে আদর্শ ও বরকতময় মোহর হিসেবে সুপরিচিত।
তৎকালীন সময়ে হজরত আলী (রা.)–এর কাছে উল্লেখযোগ্য সম্পদ ছিল না। নবিজি ﷺ–এর নির্দেশে তিনি নিজের যুদ্ধের বর্ম বিক্রি করে মোহরের অর্থ সংগ্রহ করেন—যা সরলতা, দায়িত্ববোধ ও তাকওয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত।
বিশ্বস্ত হাদিস ও ইতিহাসভিত্তিক বর্ণনা অনুযায়ী—
মূল পরিমাণ: ৫০০ দিরহাম (রুপার মুদ্রা)
ওজনের হিসাবে:
১ দিরহাম ≈ ৩.০৬১৮ গ্রাম
৫০০ দিরহাম ≈ ১,৫৩০.৯ গ্রাম (প্রায় ১.৫৩ কেজি রুপা)
তোলা/ভরি হিসেবে: প্রায় ১৩১.২৫ তোলা (ভরি)
রুপার দাম পরিবর্তনশীল। যদি প্রতি তোলা রুপার গড় মূল্য ১,৫০০ টাকা ধরা হয়, তবে—
১৩১.২৫ × ১,৫০০ ≈ ১,৯৬,৮৭৫ টাকা (প্রায়)
নোট: বিয়ের সময় স্থানীয় জুয়েলারি দোকান থেকে রুপার হালনাগাদ দর জেনে হিসাব করা উত্তম।
না—মোহরে ফাতেমি নির্ধারণ করা ফরজ নয়। এটি মোস্তাহাব (উত্তম) আমল। কেউ চাইলে এর চেয়ে কম (তবে ১০ দিরহামের কম নয়) বা বেশি মোহর নির্ধারণ করতে পারেন। তবে রাসুলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর পরিবারের আদর্শ অনুসরণের নিয়তে অনেকেই মোহরে ফাতেমি বেছে নেন।
মোহর পরিশোধের নিয়ত না রেখে বিয়ে করা, কিংবা স্ত্রীকে প্রাপ্য মোহর না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা—এটি মারাত্মক জুলুম। মোহর আদায় করা স্বামীর জন্য ওয়াজিব; এর জন্য তাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা–র কাছে জবাবদিহি করতে হবে
মোহর ইসলামে নারীর সম্মান, নিরাপত্তা ও অধিকার-এর প্রতীক। মোহরে ফাতেমি আমাদের শেখায়—বিয়ের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সরলতা, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতির মধ্যে; অতিরঞ্জনে নয়। আসুন, বিয়েকে বোঝা নয় বরং ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করি, মোহরকে সম্মানের সঙ্গে আদায় করি এবং নববি আদর্শে নিজেদের পারিবারিক জীবন গড়ে তুলি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহভিত্তিক ও বরকতময় দাম্পত্য জীবনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন