ঢাকা    শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
ঢাকা    শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
গণবার্তা

বিভিন্ন দেশের বৈচিত্রময় ইফতার

তুরস্কে ইফতার মানেই ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং ধর্মীয় উৎসবের আবহ

তুরস্কে ইফতার মানেই ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং ধর্মীয় উৎসবের আবহ
Source: Getty Images

রমজান মুসলিম বিশ্বের জন্য আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আধ্যাত্মিকতার মাস হলেও প্রতিটি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এই মাসকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। তুরস্কে রমজান শুধু রোজা রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং উৎসবের আবহ মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।

বিশেষ করে সেহরির আগে ঢোল বাজিয়ে মানুষ জাগানোর শতাব্দীপ্রাচীন প্রথা আজও এই দেশের পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে, যা আধুনিকতার মধ্যেও ঐতিহ্যের শক্ত উপস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ প্রতিবছর রমজানজুড়ে ‘দাভুল’ নামে বড় ঢোল বাজিয়ে ভোরের আগে মহল্লা ঘুরে মানুষকে জাগিয়ে তোলেন। ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে তারা বাড়ির সামনে এসে তাল মিলিয়ে ঢোল বাজান, কখনো গান বা ছড়া শোনান।

এই প্রথার সূচনা হয়েছিল অটোমান সাম্রাজ্য আমলে, যখন বিদ্যুৎ বা অ্যালার্ম ঘড়ি ছিল না। তখন মানুষকে সেহরির সময় জানানোর জন্য এই ঢোলবাদকদের ওপর নির্ভর করতে হতো। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলালেও ঐতিহ্যটি হারিয়ে যায়নি; বরং এটি আজ তুর্কি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমজান শেষে বাসিন্দারা এই ঢোলবাদকদের বখশিশ দেন, যা তাদের কাজের স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হয়।

বর্তমানে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসনও ভূমিকা রাখছে। অনেক জায়গায় ঢোলবাদকদের জন্য বিশেষ পরিচয়পত্র বা সদস্যতা কার্ড চালু করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত শিল্পীদের চিহ্নিত করা যায় এবং ঐতিহ্যটি সুষ্ঠুভাবে বজায় থাকে। এর ফলে এই পেশা এখন শুধু লোকাচার নয়, বরং আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মও এই কাজে যুক্ত হচ্ছে, যা ঐতিহ্যকে প্রজন্মান্তরে বহমান রাখছে।

তুরস্কে সেহরি পারিবারিক উষ্ণতার একটি মুহূর্ত। ভোরের আগে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খায়। সাধারণত টেবিলে থাকে চিজ, জলপাই, ডিম, দই, মধু, রুটি এবং গরম চা। অনেক পরিবার আবার বিশেষভাবে ‘রমাজান পিদেসি’ নামের ঐতিহ্যবাহী রুটি বানায়, যা রমজানের অন্যতম পরিচিত খাবার।

ইফতার তুরস্কে যেন আরেকটি উৎসব। আজানের সঙ্গে সঙ্গে খেজুর বা পানি দিয়ে রোজা ভাঙা হয়, তারপর একে একে পরিবেশন করা হয় নানা পদ—মসুর ডালের স্যুপ, কাবাব, পিলাফ, স্টাফড সবজি, বোরেক এবং মিষ্টান্ন হিসেবে বাকলাভা বা গুল্লাচ। বড় শহরগুলোতে রেস্তোরাঁগুলো বিশেষ ইফতার মেনু চালু করে, আর অনেক পৌরসভা উন্মুক্ত স্থানে বড় ইফতার আয়োজন করে যেখানে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে বসে খায়। এই সমবেত ইফতার তুর্কি সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক সংহতির প্রতীক।

রমজান মাসে শহরজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। বিশেষ করে ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর মাঝখানে ঝুলানো আলোকবার্তা বা ‘মাহিয়া’ রাতের আকাশে আলাদা সৌন্দর্য যোগ করে। একইভাবে আঙ্কারা-সহ বিভিন্ন শহরে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত পরিবেশনা ও শিশুদের বিনোদনের আয়োজন করা হয়। ফলে পুরো মাসজুড়েই দেশজুড়ে এক আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করে।

দানশীলতা তুরস্কে রমজানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মানুষ জাকাত ও সদকা দেয়, দরিদ্রদের খাবার বিতরণ করে এবং অসহায়দের সহায়তা করে। বিভিন্ন সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী দল রাস্তার পাশে ইফতার টেবিল বসায় যাতে যে কেউ এসে খাবার খেতে পারে। পরিবারগুলো আত্মীয়স্বজনদের ইফতারে আমন্ত্রণ জানায়—এটি সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।

তুরস্কের মতোই আলবেনিয়ার রোমা মুসলিমদের মধ্যেও রমজান উপলক্ষে ঢোল বাজানোর একটি ঐতিহ্য রয়েছে। তারা ‘লোদ্রা’ নামের চামড়ার ঢোল বাজিয়ে বিশেষ সংগীত পরিবেশন করে দিনের শুরু ও শেষ ঘোষণা করে। সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য একই—মানুষকে একত্র করা এবং রমজানের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।

আধুনিক তুরস্কে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও রাজনৈতিক গুরুত্ব

আজকের প্রযুক্তিনির্ভর যুগে মোবাইল অ্যালার্ম বা অ্যাপ দিয়ে সহজেই সেহরির সময় জানা যায়। তবুও তুরস্কে ঢোলবাদকদের প্রথা টিকে আছে, কারণ এটি শুধু সময় জানানোর উপায় নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কমিউনিটির বন্ধনের প্রতীক। স্থানীয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং তরুণদের অংশগ্রহণ এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে।

রমজান মাসে সমবেত ইফতার আয়োজন ও মাহিয়া আলোকসজ্জা প্রায়ই রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে হয়। এটি জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক দৃঢ় করার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। রাজনৈতিক দলগুলোও রমজানকে সামাজিক সংহতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে, যা জাতীয় পরিচয় ও ঐক্যের বার্তা বহন করে।

ফলে স্পষ্ট হয় যে, আধুনিক তুরস্কে রমজান শুধু ধর্মীয় আচার নয়; বরং এটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সামাজিক সংহতি জোরদার এবং রাজনৈতিক বার্তা প্রেরণের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


তুরস্কে ইফতার মানেই ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং ধর্মীয় উৎসবের আবহ

প্রকাশের তারিখ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image
রমজান মুসলিম বিশ্বের জন্য আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আধ্যাত্মিকতার মাস হলেও প্রতিটি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এই মাসকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। তুরস্কে রমজান শুধু রোজা রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং উৎসবের আবহ মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।বিশেষ করে সেহরির আগে ঢোল বাজিয়ে মানুষ জাগানোর শতাব্দীপ্রাচীন প্রথা আজও এই দেশের পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে, যা আধুনিকতার মধ্যেও ঐতিহ্যের শক্ত উপস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ প্রতিবছর রমজানজুড়ে ‘দাভুল’ নামে বড় ঢোল বাজিয়ে ভোরের আগে মহল্লা ঘুরে মানুষকে জাগিয়ে তোলেন। ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে তারা বাড়ির সামনে এসে তাল মিলিয়ে ঢোল বাজান, কখনো গান বা ছড়া শোনান।এই প্রথার সূচনা হয়েছিল অটোমান সাম্রাজ্য আমলে, যখন বিদ্যুৎ বা অ্যালার্ম ঘড়ি ছিল না। তখন মানুষকে সেহরির সময় জানানোর জন্য এই ঢোলবাদকদের ওপর নির্ভর করতে হতো। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলালেও ঐতিহ্যটি হারিয়ে যায়নি; বরং এটি আজ তুর্কি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমজান শেষে বাসিন্দারা এই ঢোলবাদকদের বখশিশ দেন, যা তাদের কাজের স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হয়।বর্তমানে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসনও ভূমিকা রাখছে। অনেক জায়গায় ঢোলবাদকদের জন্য বিশেষ পরিচয়পত্র বা সদস্যতা কার্ড চালু করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত শিল্পীদের চিহ্নিত করা যায় এবং ঐতিহ্যটি সুষ্ঠুভাবে বজায় থাকে। এর ফলে এই পেশা এখন শুধু লোকাচার নয়, বরং আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মও এই কাজে যুক্ত হচ্ছে, যা ঐতিহ্যকে প্রজন্মান্তরে বহমান রাখছে।তুরস্কে সেহরি পারিবারিক উষ্ণতার একটি মুহূর্ত। ভোরের আগে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খায়। সাধারণত টেবিলে থাকে চিজ, জলপাই, ডিম, দই, মধু, রুটি এবং গরম চা। অনেক পরিবার আবার বিশেষভাবে ‘রমাজান পিদেসি’ নামের ঐতিহ্যবাহী রুটি বানায়, যা রমজানের অন্যতম পরিচিত খাবার।ইফতার তুরস্কে যেন আরেকটি উৎসব। আজানের সঙ্গে সঙ্গে খেজুর বা পানি দিয়ে রোজা ভাঙা হয়, তারপর একে একে পরিবেশন করা হয় নানা পদ—মসুর ডালের স্যুপ, কাবাব, পিলাফ, স্টাফড সবজি, বোরেক এবং মিষ্টান্ন হিসেবে বাকলাভা বা গুল্লাচ। বড় শহরগুলোতে রেস্তোরাঁগুলো বিশেষ ইফতার মেনু চালু করে, আর অনেক পৌরসভা উন্মুক্ত স্থানে বড় ইফতার আয়োজন করে যেখানে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে বসে খায়। এই সমবেত ইফতার তুর্কি সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক সংহতির প্রতীক।রমজান মাসে শহরজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। বিশেষ করে ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর মাঝখানে ঝুলানো আলোকবার্তা বা ‘মাহিয়া’ রাতের আকাশে আলাদা সৌন্দর্য যোগ করে। একইভাবে আঙ্কারা-সহ বিভিন্ন শহরে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত পরিবেশনা ও শিশুদের বিনোদনের আয়োজন করা হয়। ফলে পুরো মাসজুড়েই দেশজুড়ে এক আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করে।দানশীলতা তুরস্কে রমজানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মানুষ জাকাত ও সদকা দেয়, দরিদ্রদের খাবার বিতরণ করে এবং অসহায়দের সহায়তা করে। বিভিন্ন সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী দল রাস্তার পাশে ইফতার টেবিল বসায় যাতে যে কেউ এসে খাবার খেতে পারে। পরিবারগুলো আত্মীয়স্বজনদের ইফতারে আমন্ত্রণ জানায়—এটি সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।তুরস্কের মতোই আলবেনিয়ার রোমা মুসলিমদের মধ্যেও রমজান উপলক্ষে ঢোল বাজানোর একটি ঐতিহ্য রয়েছে। তারা ‘লোদ্রা’ নামের চামড়ার ঢোল বাজিয়ে বিশেষ সংগীত পরিবেশন করে দিনের শুরু ও শেষ ঘোষণা করে। সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য একই—মানুষকে একত্র করা এবং রমজানের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।আধুনিক তুরস্কে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও রাজনৈতিক গুরুত্বআজকের প্রযুক্তিনির্ভর যুগে মোবাইল অ্যালার্ম বা অ্যাপ দিয়ে সহজেই সেহরির সময় জানা যায়। তবুও তুরস্কে ঢোলবাদকদের প্রথা টিকে আছে, কারণ এটি শুধু সময় জানানোর উপায় নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কমিউনিটির বন্ধনের প্রতীক। স্থানীয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং তরুণদের অংশগ্রহণ এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে।রমজান মাসে সমবেত ইফতার আয়োজন ও মাহিয়া আলোকসজ্জা প্রায়ই রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে হয়। এটি জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক দৃঢ় করার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। রাজনৈতিক দলগুলোও রমজানকে সামাজিক সংহতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে, যা জাতীয় পরিচয় ও ঐক্যের বার্তা বহন করে।ফলে স্পষ্ট হয় যে, আধুনিক তুরস্কে রমজান শুধু ধর্মীয় আচার নয়; বরং এটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সামাজিক সংহতি জোরদার এবং রাজনৈতিক বার্তা প্রেরণের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা