যুদ্ধের চতুর্থ দিনে এসে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফুঁসছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তাদের 'অপারেশন সাদেক প্রমিজ ৪'-এর ১৬তম ধাপ সম্পন্ন করেছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা যাচ্ছে, এই ধাপে ইসরায়েলের উত্তর থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসি দাবি করেছে, ইসরায়েলের বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে প্রতিটি প্রজেক্টাইল সফলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
রাতের আকাশে আগুন
মাঝরাতে যখন গোটা শহর নিস্তব্ধ, তখন হঠাৎ নীল আকাশের বুক চিরে ধেয়ে আসে আগুনের গোলা। সেই আগুনের লেলিহান শিখা যখন মাটির কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন চারদিকের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে যায় প্রলয়ঙ্কারী শব্দে। এটি কোনো সাধারণ রাত ছিল না। এটি ছিল ইরানের প্রতিশোধ স্পৃহার এক অনন্য নিদর্শন।
ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান
তাসনিম নিউজ এজেন্সির ডিফেন্স গ্রুপের বরাতে জানা যাচ্ছে, গত চার দিনের লড়াইয়ে শত্রুপক্ষের ক্ষয়ক্ষতির পাল্লাটা বেশ ভারী হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা এবং আহতের সংখ্যা ৬৮০ ছাড়িয়ে গেছে। আইআরজিসি তাদের ১৭ নম্বর আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় অপারেশন সাদেক প্রমিজ ৪-এর যে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, তা রীতিমতো গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো।
হামলার লক্ষ্যবস্তু
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অ্যারোস্পেস ফোর্সের হাত ধরে এই বিধ্বংসী ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সূচনা হয়। অপারেশন প্রমিজ অফ ট্রুথ ৪-এর ১৬তম ধাপের এই আক্রমণের শুরুতেই নেওয়া হয়েছিল এক পবিত্র রণধ্বনি—আলি ইবনে আবি তালিব। সেই নাম নিয়ে যখন আকাশপথে হামলা শুরু হলো, তখন অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চল বা ইসরাইলের উত্তর থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত কোনো জায়গাই বাদ থাকেনি।
হামলা চালানো হয়েছে—
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স
হাকেরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একদম হৃদপিণ্ডে
বনেই বারাকের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো
তেল আবিবের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বেইত তেকফার সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলো
পশ্চিম গ্যালিলির সামরিক কেন্দ্রগুলো
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা
সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো ইসরাইলের গর্বের সেই বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা মাল্টিলেয়ার্ড ডিফেন্স সিস্টেমের করুণ দশা। আধুনিক বিজ্ঞানের এত বড়াই থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিগত ফাঁক এবং হিসাবের অদক্ষতার কারণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো খুব সহজেই বাতাসের করিডোর খুঁজে নিয়েছে।
আইআরজিসির ভাষায়, শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার হিসাব মেলানোর ক্ষমতা কমে গেছে। যার ফলে ইরানের ছোঁড়া প্রতিটি প্রজেক্টাইল আকাশচুম্বী বাধা পার করে সপাটে আছড়ে পড়েছে নির্দিষ্ট ঠিকানায়। আকাশে এখন শুধু কালো ধোঁয়া আর বাতাসের সাথে উড়ে আসা পোড়া গন্ধ। অধিকৃত অঞ্চলের বুকের ভেতর থেকে ওঠা এই অবিরাম ধোঁয়া প্রমাণ করে দিচ্ছে যে ইরানের সামরিক আঘাত কতটা শক্তিশালী ছিল।
ইরানের কৌশল
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে সোজাসাপ্টা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে তারা কোনো আবেগ নয়, বরং এক সুশৃঙ্খল যুদ্ধের ছক মেনে এগোচ্ছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো ধাপে ধাপে শত্রুর সামরিক অবকাঠামোকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেওয়া এবং তাদের মনোবল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া। এই অভিযানের মূল দর্শনই হলো ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে জায়নবাদী শাসকদের সামরিক শক্তিকে নিঃশেষ করা।
আইআরজিসির হুঁশিয়ারি
আইআরজিসি স্পষ্ট ভাষায় হুঙ্কার দিয়েছে যে যতক্ষণ না এই দখলদার শক্তি এবং অঞ্চলের বিষফোড়া সমূলে উৎপাটন হচ্ছে, ততক্ষণ তাদের এই লড়াই থামবে না। যে নাটকীয় আগুনের ফুলকি দিয়ে রাতের আকাশ রঙিন হয়েছিল, সেই আগুনের লেলিহান শিখা এখন গ্রাস করছে শত্রুর শেষ ভরসাটুকু। অঙ্গীকার রাখা এবং শত্রুর পতন নিশ্চিত করা পর্যন্ত এই মরণকামড় চলতেই থাকবে।
ইরানের এই হামলা শুধু সামরিক আক্রমণ নয়, বরং এটি তাদের মনোবল ও প্রতিশোধ স্পৃহার এক অনন্য নিদর্শন। ইসরায়েলের বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। অন্যদিকে আইআরজিসির হুঁশিয়ারি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই যুদ্ধ এখন আর থামার নয়। এখন দেখার বিষয়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার কী জবাব দেয় এবং এই সংকট কোথায় গিয়ে ঠেকে। আমরা এই বিষয়ে নিয়মিত খবর রাখছি।

রোববার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ মার্চ ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন