কৃষি খাতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকি, ঋণ ও প্রণোদনার মতো সুবিধা কৃষকের কাছে সহজলভ্য করতে কৃষকদের কার্ডের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ৪ বছরে ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কৃষক কার্ড বিতরণ করবে সরকার। মৎস্যচাষি ও দুগ্ধখামিরাও এ কার্ডের সুবিধা পাবেন। এর মাধ্যমে কৃষকদের কাঠামোগত বঞ্চনার অবসান ঘটাতে চায় বিএনপি সরকার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ কার্ডের আওতায় একজন কৃষক প্রাথমিকভাবে ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন—
ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ
সরকারি ভর্তুকি
সরকারি প্রণোদনা
ন্যায্যমূল্যে সেচসুবিধা
সহজ শর্তে কৃষিঋণ
কৃষি বিমাসুবিধা
ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা
কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ
আবহাওয়ার তথ্য
রোগবালাই দমনে পরামর্শ
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো কৃষককে স্বীকৃতি দেওয়া ও তাঁর মর্যাদা নিশ্চিত করা। এ জন্য সোনালী ব্যাংকে প্রত্যেক কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করা হবে। প্রথম ধাপে ২১ হাজার ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
কৃষক শ্রেণিবিভাগ—
ভূমিহীন: ৫ শতাংশের কম জমির মালিক
প্রান্তিক: ৫ থেকে ৪৯ শতাংশ জমির মালিক
ক্ষুদ্র: ৫০ থেকে ২৪৯ শতাংশ জমির মালিক
কার্ডে কৃষকের ৪৫ ধরনের তথ্য থাকবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। আর্থিক প্রণোদনার টাকা যেন কৃষিতেই ব্যয় হয়, সেটা নিশ্চিত করা হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃষক কার্ড দেওয়ার অংশ হিসেবে দেশের ১০টি উপজেলার ১০টি কৃষি ব্লকে পরীক্ষামূলকভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলছে। এপ্রিলের মধ্যে উপাত্ত সংগ্রহের কাজ শেষ হবে। এরপর ১৫টি উপজেলার সব কৃষককে নিয়ে কৃষক কার্ডের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে। এ ছাড়া কৃষকের আয়, জমির মালিকানা ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ক্ষুদ্র, ভূমিহীন, প্রান্তিক, মাঝারি ও সচ্ছল—এই ৫ শ্রেণিতে কৃষকদের অন্তর্ভুক্ত করার কাজও চলমান আছে।
কৃষি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানান, সরকারি প্রণোদনা, ভাতা, ভর্তুকি কৃষকের জন্য সহজতর করতে কার্ড ভূমিকা রাখবে। কৃষিসংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে আগামী পয়লা বৈশাখে (১৪ এপ্রিল) কৃষক কার্ডের উদ্বোধন করা হবে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে অন্যতম অঙ্গীকার ছিল কৃষক কার্ড। কৃষি খাতে মৌলিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে এ কার্ড চালুর অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে বিএনপি সরকার। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে এ ঋণ মওকুফ করে সরকার। মওকুফ করা ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। এতে উপকৃত হবেন কমপক্ষে ১২ লাখ কৃষক।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, দেশে মোট কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৬৫ লাখ। প্রাথমিকভাবে কৃষক কার্ডের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ বছরে ৬৮১ কোটি টাকা। তবে সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার পর ব্যয় কমবেশি হতে পারে।
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরকার কৃষি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, কৃষকের সামগ্রিক আয় বৃদ্ধি, প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা, কৃষকের চাষাবাদের খরচ কমানো, কৃষিপণ্যের বিপণন প্রক্রিয়া উন্নত করা ও সব ধরনের ভর্তুকি (আর্থিক ও কৃষি উপকরণ) বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চায়।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে কৃষক কার্ড বিতরণের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এটি বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।
প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো—
সঠিক কৃষক শনাক্ত করা
অ-কৃষক বা মধ্যস্বত্বভোগীদের সুবিধা আটকানো
বাজারে কৃত্রিম সংকট ও দুর্নীতি প্রতিরোধ
স্থানীয় পর্যায়ে তদারকির অভাব
প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও তথ্য ব্যবস্থাপনা
বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়
এ উদ্যোগ সফল করতে হলে সরকারকে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সেলিম রায়হান—
কৃষকদের একটি নির্ভুল ও ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি
প্রকৃত কৃষকদের শনাক্তকরণ
ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালু
সার-ডিজেল ও অন্যান্য ভর্তুকি বিতরণে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ
কৃষক কার্ডের এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের কৃষি খাতে আমূল পরিবর্তন আসবে এবং কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার।

সোমবার, ১১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মার্চ ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন