দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। কমবে লবণাক্ততা, প্রাণ ফিরে পাবে মৃতপ্রায় নদীগুলো। একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন।
শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করার জন্য ১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ করে ভারত। ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে পদ্মা নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমেছে।
ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী শুকিয়ে গেছে। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন কমেছে, নৌচলাচল ব্যাহত হচ্ছে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
ফারাক্কা ব্যারাজের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে প্রথম পর্যায়ে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। রাজবাড়ীর পাংশা পয়েন্টে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকছে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, নেভিগেশন লক ও ফিস পাস।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি সংরক্ষণ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থায় স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে পাঁচটি নদী ব্যবস্থায় পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনা যাবে।
প্রকল্প এলাকা বাংলাদেশের মোট এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ। চারটি বিভাগের ২৬টি জেলার ১৬৩টি উপজেলা এর আওতায় পড়বে। প্রথম পর্যায়ে ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা উপকৃত হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে। ধান উৎপাদন বাড়বে প্রায় ২৩ দশমিক ৯০ লাখ টন। মাছ উৎপাদন বাড়বে প্রায় ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন। এছাড়া ব্যারাজ থেকে বিনা জ্বালানিতে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ সংক্রান্ত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায়। ১৯৯৬ সালে হওয়া গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। এই চুক্তির ভবিষ্যৎ না জানা পর্যন্ত প্রকল্পটির পুরো সুবিধা পাওয়া নিয়ে শঙ্কা থাকছে।
বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তবে ব্যারাজের উজানে ক্ষয় এবং ভাটিতে পলি জমার মতো ঝুঁকি রয়েছে। উন্নত নকশা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলো মোকাবিলা করতে হবে।’
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য মো. মাহমুদুল হোসাইন খান জানান, প্রকল্পটি একনেকে তোলার জন্য পাঠানো হয়েছে। ফারাক্কা ব্যারাজের ফলে দেশের কিছু এলাকা মরুভূমি হয়ে গেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশ বাঁচবে।
প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। মার্চ ২০২৬ থেকে শুরু করে জুন ২০৩৩ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ মার্চ ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন