বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনে আবারও নতুন করে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। আজ দুপুর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ক্রিকেটবিষয়ক আলোচনায় শোরগোল পড়ে গেছে—বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন সভাপতি হচ্ছেন বিএনপি নেতা বরকত উল্লাহ বুলু। সম্প্রতি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া এই প্রভাবশালী রাজনীতিকের নাম ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি শুধুই গুঞ্জন, না পর্দার আড়ালে কিছু ঘটছে?
ক্রিকেটপ্রেমী ও ক্রীড়া সাংবাদিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ছিল, বর্তমান বিসিবি পরিচালক পর্ষদ ভাঙলে ভবিষ্যৎ বোর্ড চেয়ারম্যান হতে পারেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল। কিন্তু হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন বরকত উল্লাহ বুলু। এর পেছনে মূল কারণ, গত অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বিসিবি নির্বাচন নিয়ে নানা অনিয়ম ও স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ। এর প্রেক্ষিতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যার প্রধান সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। এই তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বর্তমান পরিচালক পর্ষদের ভবিষ্যৎ।
তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে এবং আগামী ৯ এপ্রিলের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) কমিটির প্রধান জানিয়েছেন, নির্ধারিত ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে কোনো বাধা নেই এবং মেয়াদ বাড়ানোর প্রশ্নই ওঠে না। তারা ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রায় ২৫-২৬ জনের সঙ্গে কথা বলেছেন। বর্তমানে কমিটি দুটি কেন্দ্রীয় চরিত্রের দিকে এগোচ্ছেন—বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। বিসিবি সভাপতিকে ইতিমধ্যে সাক্ষাৎকারের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তবে বরকত উল্লাহ বুলুকে নিয়ে গুঞ্জন যতই জোরালো হোক না কেন, বাস্তবতা হলো গঠনতান্ত্রিক বাধা। বিসিবি ও এনএসসির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, বর্তমান বোর্ড ভাঙলে প্রথমে গঠিত হবে একটি আহ্বায়ক কমিটি। সেই আহ্বায়ক কমিটি পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ পরিচালক পর্ষদের নির্বাচন আয়োজন করবে। কাজেই এ মুহূর্তে কারও বোর্ড সভাপতি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বোর্ড ভাঙলে সর্বোচ্চ কাউকে আহ্বায়ক করা যেতে পারে, সরাসরি সভাপতি নয়। অর্থাৎ বরকত উল্লাহ বুলু যদি বোর্ডের দায়িত্ব পান, তাহলে সেটা হবে আহ্বায়ক হিসেবে, সভাপতি হিসেবে নয়।
বরকত উল্লাহ বুলু বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, নোয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং দীর্ঘদিনের রাজনীতিবিদ। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন। সম্প্রতি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এই ক্লাবটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে বিসিবি সভাপতি হওয়ার গুঞ্জনকে কেউ কেউ অতি উৎসাহের ফল বললেও, অনেকেই মনে করছেন এটি মোটেও অসার গল্প নয়।
এই গুঞ্জনের মাঝে ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হকের অবস্থানও পরিষ্কার। তিনি বলেছেন, “আমি এ সম্পর্কে কিছু জানি না।” তিনি বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিতে চাননি, যা স্বাভাবিকও বটে, কারণ তদন্ত কমিটি তাঁর অধীনেই গঠিত এবং তা এখনো কাজ করছে। তাঁর এই মন্তব্য কার্যত গুঞ্জনটিকে উড়িয়ে দিয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত তদন্ত কমিটি কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে এনএসসি বোর্ড ভাঙার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবেই আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। সেই আহ্বায়ক কমিটির প্রধান কে হবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। গুঞ্জনে বরকত উল্লাহ বুলুর নাম এলেও বাস্তবে তাঁর সভাপতি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি সর্বোচ্চ আহ্বায়ক হতে পারেন। তবে এটাও তখনই সম্ভব, যখন বর্তমান বোর্ড ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়।
তবে যারা বরকত উল্লাহ বুলুকে সরাসরি বিসিবি সভাপতি বলে অভিহিত করছেন, তারা গঠনতন্ত্রটি ঠিকমতো বুঝতে পারেননি। কারণ আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ড ভাঙলেই কেবমল আহ্বায়ক কমিটি আসার সুযোগ আছে। কাজেই যেই হোন না কেন, এখন পর্যন্ত কারও ‘বিসিবি সভাপতি’ হওয়ার প্রশ্নই আসে না। শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করছে তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ওপর। আগামী ৯ এপ্রিলের মধ্যে সেই রিপোর্ট জমা পড়বে। তারপরই বোর্ডের ভবিষ্যৎ স্পষ্ট হবে। ততদিন পর্যন্ত এই গুঞ্জনই গুঞ্জন হিসেবে থাকবে।

বুধবার, ২০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন