ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর চলমান হামলায় অন্তত ১৩টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে অন্তত ১ হাজার ২৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে চারজন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো সবসময় সুরক্ষিত থাকা উচিত। বর্তমানে এই হামলার ফলে ইরানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং আহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংঘাতের ভয়াবহতা কেবল হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নেই, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোও হামলার শিকার হচ্ছে। উত্তর-পশ্চিম ইরানের জানজান শহরের গ্র্যান্ড হোসাইনিয়া নামক শিয়া মসজিদ ও ধর্মীয় সমাবেশ কেন্দ্রে হামলায় গম্বুজ ও মিনারের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। তেহরান সিটি কাউন্সিলের ঐতিহ্য কমিটির প্রধান আহমদ আলাভি জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সারা দেশে অন্তত ১২০টি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে তেহরানের গোলেস্তান প্যালেস, ইসফাহানের চেহেল সোতুন প্যালেস, মাসজেদ-ই জামে মসজিদ এবং খোররামাবাদ উপত্যকার প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান অন্যতম।
এদিকে ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু নিয়ে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এখনও ইরানের অবশিষ্ট অবকাঠামো ধ্বংস করা শুরু করেনি। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের সামরিক বাহিনী ইরানে যা কিছু বাকি আছে তা ধ্বংস করা শুরুও করেনি।’ তিনি হুমকির সুরে লেখেন, ‘ইরানে এবার লক্ষ্য সেতু, এরপর বিদ্যুৎকেন্দ্র!’
ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারির পরপরই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের কারাজের কাছে অবস্থিত ‘মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উঁচু’ বি-১ সেতুতে হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) এই হামলায় অন্তত আটজন নিহত ও ৯৫ জন আহত হয়েছে। আলব্রোজ প্রদেশের কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হামলায় সেতুর মধ্যভাগ ধ্বংস হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা সেতুটির বড় অংশ ধসে পড়তে দেখা যায়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে লিখেছেন, ‘বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা একটি অগোছালো শত্রুর পরাজয় এবং নৈতিক পতন। অসমাপ্ত সেতুসহ নাগরিক স্থাপনার ওপর হামলা ইরানিদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে না।’
যুদ্ধের এই ধ্বংসলীলায় সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত শনিবার দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে হামলায় কয়েক ডজন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে তেহরান থেকে প্রায় এক লাখ এবং লেবানন থেকে আরও ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে ডব্লিউএইচও নিশ্চিত করেছে। দুবাইয়ে অবস্থিত ডব্লিউএইচওর জরুরি লজিস্টিক হাব বন্ধ থাকায় প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার মূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম ইরানে পৌঁছাতে পারছে না। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, পারমাণবিক স্থাপনাগুলো যদি এই যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু হয়, তবে জনস্বাস্থ্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ডব্লিউএইচও।

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন