প্রায় এক যুগ ধরে ‘কোন শৃঙ্গটি বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু’ – এই প্রশ্ন ঘিরে রহস্য কাটেনি। তাজিংডং, কেওক্রাডং নাকি সাকা হাফং? এবার সেই বিতর্কের ইতি টানতে মাঠে নেমেছে সরকার। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও উন্নত জিওডেটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৪ থেকে ১২ এপ্রিল বান্দরবানের রুমা ও থানচি উপজেলার পাহাড়গুলো পরিমাপ করে দেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের শীর্ষবিন্দু নির্ণয় করবে।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কোনটি – এই প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্ক চলছে। একসময় কেওক্রাডংকে সরকারিভাবে দেশের সর্বোচ্চ পাহাড় হিসেবে গণ্য করা হতো, কিন্তু বর্তমানে তাজিংডংকে সেই মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। তবে পর্বতারোহী ও অভিযাত্রীদের একটি বড় অংশ দাবি করে আসছেন, প্রকৃত সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আসলে সাকা হাফং (মদক তং)। এই বিতর্ক নিরসনের জন্যই ২০২২ সালের মে মাসে জরিপ অধিদপ্তর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নির্ণয়ের উদ্যোগ নেয় এবং অবশেষে ২০২৬ সালের এপ্রিলে সেই জরিপের কাজ শুরু হয়।
জরিপ কার্যক্রমটি পরিচালনা করছেন সার্ভেয়ার জেনারেল অব বাংলাদেশ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুর-এ-আলম মোহাম্মদ যোবায়ের সারোয়ার। তত্ত্বাবধানে আছেন জিওডেটিক ডিটাচমেন্টের ইনচার্জ ও উপ-পরিচালক দেবাশীষ সরকার। অভিজ্ঞ জরিপ দলটি বান্দরবান জেলার থানচি, রেমাক্রি, রুমা ও তিন্দুসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় অবস্থান করে পাহাড়গুলোর চূড়ার উচ্চতা নির্ণয় করবে।
জরিপে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যাধুনিক জিওডেটিক পদ্ধতি ও গ্লোবাল ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (GNSS) প্রযুক্তি। সদ্য প্রস্তুতকৃত জিওড মডেলের মাধ্যমে জিএনএসএস রিসিভার থেকে প্রাপ্ত ‘এলিপসয়েড হাইট’ ব্যবহার করে পর্বতশৃঙ্গের গড় সমুদ্রতল হতে উচ্চতা (এমএসএল) নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া ডুয়াল ফ্রিকোয়েন্সি জিএনএসএস রিসিভার, আরটিকে রিসিভার, টোটাল স্টেশন, লেভেল মেশিন ও অন্যান্য আধুনিক সরঞ্জামের সাহায্যে পরিমাপ করা হবে। জরিপের মাধ্যমে শৃঙ্গের অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ এবং উচ্চতা নির্ধারণে সেন্টিমিটার স্তরের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা হবে।
এই জরিপের মাধ্যমে বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তর দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ – তাজিংডং, কেওক্রাডং নাকি সাকা হাফং – তা নির্ণয় করবে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের এই বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের মানচিত্রে প্রকৃত সর্বোচ্চ শৃঙ্গ চিহ্নিত করার এই উদ্যোগ শুধু একটি ভৌগোলিক তথ্য নির্ধারণই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও ভূ-বৈচিত্র্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আগামী দিনে এটি পর্যটন, অভিযান ও গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন