আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিতে এসে কেঁদেছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শহীদ শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের (১৯) বাবা মোহাম্মদ আব্দুল মতিন। ট্রাইব্যুনালকে শহীদ সন্তানের ছবি দেখিয়ে ৫০ বছর বয়সী আব্দুল মতিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে স্যার। আমি বেসরকারি চাকরি করি। আমাদের পরিবার ধ্বংস স্যার।’
জবানবন্দি দেওয়ার এক পর্যায়ে কান্নারত আব্দুল মতিন আরও বলেন, ‘এই দেশ স্বাধীন। আমার আফসোস হয়, স্বাধীন দেশে ছেলেকে নিরাপত্তা দিতে পারিনি। কেন এই দেশে ছেলেকে জন্ম দিলাম?’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি পেশ করেন আব্দুল মতিন। রোববার (৫ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এ জবানবন্দি ও জেরা অনুষ্ঠিত হয়।
জবানবন্দিতে আব্দুল মতিন জানান, তার ছেলে শাহরিয়ার ঈশ্বরগঞ্জ আইডিয়াল কলেজ থেকে ২০২৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল। পাঁচটি পরীক্ষা দেওয়ার পর কয়েক দিন পরীক্ষা না থাকায় ১০ জুলাই রাজধানীর ভাটারা এলাকায় তার ভাড়া বাসায় আসে। সেখান থেকে ১৬ জুলাই মিরপুর খালার বাসায় বেড়াতে যায়। সেখান থেকে খালাতো ভাইসহ আন্দোলনে যোগ দেয় শাহরিয়ার।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেয় সে এবং সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়। ২০ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জবানবন্দিতে আব্দুল মতিন অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা, আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানসহ অন্যদের কুপরামর্শে তার ছেলেসহ সারা দেশে প্রায় এক হাজার ৪০০ আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়। তিনি ছেলে হত্যার সঙ্গে জড়িত সবার সর্বোচ্চ শাস্তি চান।
আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে করা এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন সুমি আক্তার (৩৮)। তিনি জানান, তার স্বামী শহীদ আক্তারুজ্জামান খুচরা কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন।
২০২৪ সালের ২৮ জুলাই সকালে মিরপুর-২ নম্বরের ভাড়া বাসা থেকে আন্দোলনে অংশ নিতে বের হন আক্তারুজ্জামান। বিকেলে ফোন করে স্বামীর মোবাইল বন্ধ পান। সন্ধ্যা ৭টায় অপরিচিত একটি নম্বর থেকে কল এসে জানানো হয়, তার স্বামী ‘অ্যাকসিডেন্ট’ করেছেন। রাত ৮টায় ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে স্বামীর মরদেহ পান তিনি। তার স্বামী মাথায় গুলিবিদ্ধ ছিলেন।
সুমি আক্তারের সাত বছর বয়সী এক ছেলে সন্তান আছে। ছেলেকে নিয়ে তিনি জবানবন্দি দিতে আসেন। এইচএসসি পাস সুমি এখন ছাত্র পড়িয়ে সংসার চালান বলে জেরায় উল্লেখ করেন।
অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের বিরতির ফাঁকে দর্শক গ্যালারিতে থাকা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া পরিবারের সদস্য ও আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ অধিবেশনের গ্যালারির ‘মেঘনা হলে’ প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা আর দূরত্বের দেয়াল ভেঙে তৈরি হয় এক আন্তরিকতার পরিবেশ।
প্রধানমন্ত্রী একে একে কথা বলেন সবার সঙ্গে। ক্ষমতার আসন ছেড়ে মানুষের কাছে যাওয়ার এক অনন্য উদাহরণ রেখে তিনি কোনো প্রটোকলের দূরত্ব না রেখে একেবারে কাছাকাছি গিয়ে কথা বলেন। কারও সন্তানের কথা শুনে থমকে যান, কারও চিকিৎসার অগ্রগতি জানতে চান, আবার কারও কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, সারা দেশ থেকে আসা প্রায় ৬০ জন জুলাই গণ-আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিবারের সদস্য এ সময় সংসদের দর্শক গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ২৬ জন শহীদ পরিবারের সদস্য, অন্য সবাই আহত হয়েছিলেন। অনেকেই এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকতার সঙ্গে একে একে সবার কথা শোনেন। কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সামনে কয়েকজন কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রধানমন্ত্রী তখন মাথায় হাত বুলিয়ে তাঁদের সান্ত্বনা দেন।
আবেগঘন পরিবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার সব সময় জুলাই যোদ্ধাদের পাশে থাকবে।

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন