প্রিন্ট এর তারিখ : ০৪ মার্চ ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ মার্চ ২০২৬
খামেনি হত্যার নেপথ্যে ইসরায়েলের গুপ্তচর ও সিআইএর আড়িপাতা তথ্য, ৬০ সেকেন্ডে চূড়ান্ত অভিযানা
অনলাইন ডেস্ক ||
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনা ছিল এক বহুস্তরীয় গোয়েন্দা কার্যক্রমের ফসল। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কয়েক দশক ধরে এই লক্ষ্যে কাজ করলেও গত ছয় মাসে সিআইএসহ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের প্রযুক্তিগত ও জনবল সহায়তা দেয়। শনিবার সকালে তেহরানে চালানো মাত্র ৬০ সেকেন্ডের সেই চূড়ান্ত অভিযানে নিহত হন খামেনিসহ ইরানের শীর্ষস্থানীয় ৪০ জনের বেশি জ্যেষ্ঠ নেতা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা।ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ গোয়েন্দা এবং কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ইরানি শাসনব্যবস্থাকে নির্মূল করার লক্ষ্যেই এই অভিযান চালানো হয়। ইসরায়েলের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, তেহরানের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হওয়া ইরানের শীর্ষস্থানীয় সাতজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং খামেনির পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের প্রায় এক ডজন সদস্যও এই হামলায় নিহত হন। প্রায় একই সময়ে চালানো একাধিক হামলায় খামেনিসহ তাঁদের হত্যা করা হয়।ইরান নিয়ে কাজ করে আসা সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমানে ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির বিশ্লেষক রুয়েল গেরেখ্ত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানে বিশাল প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে এলেও মূলত ইসরায়েলই মাঠপর্যায়ে এমন এক গুপ্তচর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, যারা সরাসরি মানুষের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতে এবং ইরানের অভ্যন্তরে গোপন অভিযান পরিচালনায় সক্ষম ছিল।ইসরায়েলি গুপ্তচরেরা অনেক বছর ধরে খামেনির ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছিল। তারা তাঁর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, পরিবারের সদস্য, সহযোগী, মিত্র এবং তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে অত্যন্ত নিখুঁত ও বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে নথি তৈরি করেছিল।সিআইএর সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, 'এটি একটি বিশাল জিগস পাজলের মতো। আপনি তথ্যের এই ছোট ছোট টুকরোগুলো এক জায়গায় মেলাবেন। যেখানে আপনার কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকবে না, সেখানে আরও গভীরভাবে খুঁজবেন। এতে সবকিছুই থাকে: কীভাবে তারা খাবার সংগ্রহ করে, তাদের ফেলে দেওয়া আবর্জনার কী হয়।'হামলার সময় শনিবার সকাল বেছে নেওয়া হয়েছিল সিআই এজেন্টদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। সে সময় তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে নেতৃত্বস্থানীয় একজনের কার্যালয় চত্বরে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খামেনি ঠিক কখন ওই স্থানে থাকবেন এবং বৈঠকের সময় সম্পর্কে সিআইএ ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের জানিয়েছিল।গত সপ্তাহে ইরানের মাঠপর্যায়ে থাকা মোসাদের নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আড়ি পাতা থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় করা হয়েছিল। শেষমেশ, সব তথ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং একেবারে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে সেই সংক্ষিপ্ত, অথচ প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক এক মিনিটের অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হয়।মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে জেরুজালেম সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ফরেন অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ওদেদ আইলাম বলেন, 'মাত্র ৬০ সেকেন্ড। অভিযানে ঠিক এই সময়টুকুই লেগেছে। তবে এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছরের প্রস্তুতি।'তবে কিছু বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে সম্ভাব্য কৌশলগত একটি ভুল হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে আরও প্রবল প্রতিপক্ষের উত্থান ঘটতে পারে।গোয়েন্দা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ইসরায়েলি বিশ্লেষক ও লেখক ইয়োসি মেলম্যান বলেন, 'সমস্যা হলো, ইসরায়েল গুপ্তহত্যার প্রেমে মগ্ন...এবং আমরা কখনোই শিখিনি যে এটি কোনো সমাধান নয়। আমরা হামাসের সব নেতাকে হত্যা করেছি। কিন্তু তারা এখনো টিকে আছে। হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। নেতাদের শূন্যস্থান সব সময়ই পূরণ হয়ে যায়।'সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা রুয়েল গেরেখ্ত আরও বলেন, 'আমার মনে হয় কাজটি ঠিক হয়নি। নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি না—মানুষ হত্যায় আমার কোনো সমস্যা নেই, আমি অনেককেই হত্যা করেছি—কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ভুল ছিল। আমি জানি, আপনি যখন কারও নেতাকে সরিয়ে দেন, তখন আপনি মূলত সমস্যার সমাধান করেন না। বরং আপনি নতুন একটি সমস্যার জন্ম দেন।'খামেনি হত্যার ঘটনা শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি ছিল গোয়েন্দা তৎপরতা, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার এক অনন্য সমন্বয়। কিন্তু এই সাফল্যের পরও বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, এই হত্যাকাণ্ড কি ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাবে, নাকি এর মধ্য দিয়ে জন্ম নেবে আরও জটিল ও শক্তিশালী এক নতুন প্রতিপক্ষের? মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন সেদিকেই তাকিয়ে।
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা