প্রিন্ট এর তারিখ : ০১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মার্চ ২০২৬
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি, আইআরজিসি-সেনাবাহিনীর আনুগত্য ঘোষণাা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, গণবার্তা: ||
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) হিসেবে মুজতবা খামেনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মুজতবা খামেনিকে রোববার (৮ মার্চ) অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের জরুরি বৈঠকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে ইরানের নতুন নেতা কে হবেন তা নিয়ে নানা জল্পনা চলছিল।সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচনঅ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্যরা মুজতবা খামেনির নামে সর্বসম্মতিক্রমে সিলমোহর দেন। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিপ্লবী গার্ড আইআরজিসি ও সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে নতুন সুপ্রিম লিডারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে মুজতবা খামেনিকে অভিনন্দন জানিয়ে তাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে আইআরজিসি খামেনির প্রতি তাদের ‘একনিষ্ঠ ও আজীবন আনুগত্য’ ঘোষণা করে জোর দিয়ে বলেছে, তারা তার সব আদেশ পালন করতে এবং তা বাস্তবায়নে প্রস্তুত থাকবে।আইআরজিসি আরও যোগ করেছে যে, ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ কর্তৃক খামেনির এই নির্বাচন ‘সবার কাছে প্রমাণ করেছে যে ইসলামিক ব্যবস্থার গতিশীলতা থেমে থাকে না এবং বিপ্লব ও ইসলামিক ব্যবস্থা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।’ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির প্রতি তাদের সমর্থন ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সামরিক বাহিনী খামেনিকে ‘ন্যায়পরায়ণ, জ্ঞানী, ধর্মপ্রাণ এবং বিচক্ষণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।মুজতবা খামেনি কেমুজতবা খামেনি ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তাকে খুবই সাদামাটা জীবনযাপনকারী হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। আলভি স্কুলে প্রাথমিক পাঠ শেষে তিনি কোম সেমিনারিতে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বড় বড় আলেমদের কাছে ধর্মীয় বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।১৯৮৭ সালে উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে বিপ্লবী গার্ড আইআরজিসিতে যোগ দেন তিনি। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি আইআরজিসির ‘হাবিব ব্যাটালিয়ন’-এ যুক্ত থেকে একাধিক অভিযানে অংশ নেন। তার সেই সময়কার অনেক সহযোদ্ধা বর্তমানে ইরানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিভাগে শীর্ষ পদে রয়েছেন। ১৯৯৯ সালে ধর্মীয় পন্ডিত হওয়ার জন্য কোম শহরে ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে পড়ালেখা শুরু করেন তিনি।মুজতবা খামেনি কখনও কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি বা গণভোটের মুখোমুখি হননি। তবুও কয়েক দশক ধরে তিনি পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ মহলে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে ইরানের আধাসামরিক বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে তিনি অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।বিতর্ক ও অভিযোগমুজতবার বিরুদ্ধে দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশে ও বিদেশের বিরোধীরা বিক্ষোভকারীদের দমনের সঙ্গে যুক্ত করে আসছেন। ২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’র সময় মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর আইআরজিসি-র বাসিজ বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রথম তুলেছিল সংস্কারপন্থী শিবির।ধর্মীয় যোগ্যতা নিয়েও কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। তিনি বর্তমানে একজন ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ (মধ্যম স্তরের ধর্মগুরু), যেখানে সর্বোচ্চ নেতা হতে ‘আয়াতুল্লাহ’ পদমর্যাদার প্রয়োজন হয়। তবে তার বাবা ১৯৮৯ সালে যখন নেতা নির্বাচিত হন, তখন তিনিও আয়াতুল্লাহ ছিলেন না এবং তার জন্য আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। মুজতবার ক্ষেত্রেও একই ধরণের আপস হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা মুজতবা খামেনি বিভিন্ন দেশে বিপুল সম্পদের মালিক বলে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে। যদিও তার নামে সরাসরি কোনো লেনদেনের প্রমাণ নেই, তবে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তিনি বছরের পর বছর বিলিয়ন ডলার লেনদেন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।প্রথম দিনেই সামরিক পদক্ষেপনতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইসরায়েল-মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অবস্থানের ইঙ্গিত দিলেন মুজতবা খামেনি। তার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।সোমবার (৯ মার্চ) প্রথম দফায় ইরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ছবি প্রকাশ করেছে। এর গায়ে লেখা, ‘আপনার সেবায় প্রস্তুত, সাইয়্যিদ মুজতবা।’বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নেতার এই পদক্ষেপ তেহরানের পূর্ববর্তী পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক কৌশলে কিছুটা হলেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে মুজতবার এই ক্ষমতা গ্রহণ ইরানের শাসনব্যবস্থায় কট্টরপন্থী অংশটির শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।ট্রাম্পের নাখোশিএদিকে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়ে এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের উপস্থাপক ব্রিয়ান কিলমিয়াদে জানিয়েছেন, মুজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ায় নাখোশ ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে তাকে এ কথা জানিয়েছেন বলে দাবি করেছেন কিলমিয়াদে।এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা তার ‘অনুমোদন’ ছাড়া বেশিদিন টিকতে পারবেন না। বিমান হামলায় নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তেহরানকে আগে তার সম্মতি নিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তিনি।
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা