প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬
এক যুগেও সিরিয়াল কিলার ধর্ষক রসু খাঁর ফাঁসি হয়নি, রামিসার ধর্ষক-খুনির কি দ্রুত শাস্তি হবে?া
নিউজ ডেস্ক ||
রাজধানীর মিরপুরে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার নির্মম ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে সাধারণ মানুষ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই জঘন্য অপরাধের বিচারের দাবিতে রাজধানীজুড়ে চলছে নানা প্রতিবাদী কর্মসূচি ও বিক্ষোভ। এর মধ্যেই ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে দেখা করে দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে সরকারের এই সদিচ্ছার পরও সাধারণ মানুষের মনে কাটছে না শঙ্কা। বিগত দুই দশকের ইতিহাস পর্যালোচনা করে অনেকেই রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার প্রাপ্তি নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করছেন। কারণ, দেশে এমন বহু আলোচিত ও স্পর্শকাতর অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে ঝুলে রয়েছে।সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর নৃশংস অপরাধমিরপুরের সাম্প্রতিক ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে রসু খাঁর অপরাধের খতিয়ান ও বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা আবারও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, রসু খাঁ একাই ১১ জন নারীকে ধর্ষণের পর পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করেছিলেন। ২০১৫ সালে একটি মামলায় নিম্ন আদালতে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। এরপর দীর্ঘ ৯ বছর পেরিয়ে ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতেও তার সেই ফাঁসির আদেশ বহাল রাখা হয়। হাইকোর্ট তাদের রায়ের পর্যবেক্ষণে রসু খাঁকে একজন চরম নৃশংস ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আদালত স্পষ্ট জানান, এই অপরাধী কোনো ধরনের আইনি অনুকম্পা পাওয়ার যোগ্য নন এবং সর্বোচ্চ শাস্তিই তার একমাত্র প্রাপ্য।১৭ বছরেও চূড়ান্ত বিচার হয়নিঅথচ হাইকোর্টের এই যুগান্তকারী রায়ের পর আরও প্রায় দুই বছর সময় পার হয়ে গেলেও এখনো সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এর চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। থমকে আছে আইনি প্রক্রিয়া। কার্যকর করা সম্ভব হয়নি তার মৃত্যুদণ্ড। রসু খাঁর বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি মামলার রায় নিম্ন আদালতে সম্পন্ন হয়েছে এবং দুটিতেই তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। অর্থাৎ, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিচার প্রক্রিয়া চলার পরও বাকি ৯টি মামলার বিচার এখনো নিম্ন আদালতেই ঝুলে আছে।প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণসিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, হাইকোর্টের রায়ের পর মামলার যাবতীয় নথিপত্র সংবলিত ‘পেপারবুক’ প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত আপিল বিভাগে শুনানি শুরু করা যায় না। এই পেপারবুক তৈরির সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরকারের এবং এটি সরকারি প্রিন্টিং প্রেস বা বিজি প্রেস থেকে তৈরি হতে অনেক সময় দীর্ঘ ১০ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ফলে পুরো বিষয়টি অনেকাংশেই সরকারি সদিচ্ছা ও গতিশীলতার ওপর নির্ভর করে। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক জানান, উচ্চ আদালতের ৬৫টি বেঞ্চ থেকে আসা শত শত ডেথ রেফারেন্সের বিপরীতে আপিল বিভাগে শুনানির জন্য মাত্র এক বা দুটি বেঞ্চ কার্যকর থাকায় মামলার জট তৈরি হয় ও সময় ক্ষেপণ হয়।নারী ও শিশু মামলায় সাজা পাওয়ার হার মাত্র ৩%সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের সংবেদনশীল অপরাধের মামলায় সাজার হার মাত্র তিন শতাংশ। এর বিপরীতে তথ্য ও প্রমাণের অভাবে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলার আসামিরা শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়ে যাচ্ছে। যদিও আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে এই ধরনের মামলা নিষ্পত্তির সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে নিম্ন আদালতেই একটি মামলার প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষ হতে গড়ে প্রায় সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।রামিসার পরিবারের শঙ্কামানবাধিকারকর্মী এলিনা খান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, প্রায় দেড় যুগ ধরে একটি আলোচিত মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এমন হাজারো মামলা উচ্চ আদালতে থমকে আছে। যেমনটি গত বছরের মার্চ মাসে মাগুরায় আট বছরের শিশু আসিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেখা গেছে; নিম্ন আদালতে আসামির ফাঁসির রায় হলেও সেটিও এখন আপিলের বেড়াজালে আটকে রয়েছে।শিশু রামিসার নির্মম হত্যার দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর মামলার ১৭ বছরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া দেখে সাধারণ মানুষ সংশয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোতেই নিম্ন আদালতে দ্রুত রায় আসে, কিন্তু উচ্চ আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও পেপারবুক তৈরির ধীরগতির কারণে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার অধরাই থেকে যায়। রামিসা আক্তারের মতো অবুঝ শিশুদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বড় অন্তরায়। এখন সরকার যদি রসু খাঁর মামলার পেপারবুক তৈরিতে ত্বরান্বিত করে এবং নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার সাজার হার বাড়াতে উদ্যোগী হয়, তবেই মিরপুরের রামিসা ও মাগুরার আসিয়াদের ন্যায়বিচার সম্ভব।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা