প্রিন্ট এর তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
যুদ্ধক্ষেত্রে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠছে হিজবুল্লাহ, বদলে গেছে কৌশল ও কমান্ড কাঠামোা
বিশ্ব ডেস্ক, গণবার্তাঃ ||
গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও লেবানন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে একটি চুক্তির ঘোষণা দেয়, যার লক্ষ্য ছিল বিদ্যমান ‘যুদ্ধবিরতি’ নবায়ন করা এবং একটি ‘সমন্বিত’ সমাধানের পথে এগোনো। তবে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত বোমাবর্ষণ ও সামরিক অভিযান চলতে থাকলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী শুধু হিজবুল্লাহকেই তাদের হামলা বন্ধ করতে হবে। লেবাননের প্রতিরোধ সংগঠনটি দ্রুতই এ আলোচনাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং একে ‘অযৌক্তিক, অপমানজনক ও অবমাননাকর’ বলে আখ্যা দেয়।১০ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে হিজবুল্লাহ দক্ষিণে ইসরায়েলের নতুন আক্রমণের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত কিন্তু কার্যকর ক্ষয়যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এ যুদ্ধে তারা ড্রোন ও ছোট বিশেষায়িত ইউনিটের ওপর নির্ভর করে ইসরায়েলি বাহিনীকে ক্রমাগত ক্ষয় করছে, একই সঙ্গে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোও অক্ষুণ্ন রাখছে।বদলে যাওয়া হিজবুল্লাহ২০২৬ সালের মার্চে শুরু হওয়া সর্বশেষ সংঘাতের প্রায় ৭০ দিন পর এখন সতর্কতার সঙ্গে হলেও বলা যায়, বর্তমান হিজবুল্লাহ ২০২৪ সালে যুদ্ধ করা হিজবুল্লাহ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। অন্তত তাদের সামরিক সংগঠন, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রস্তুতি এবং অভিযানের নমনীয়তার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন স্পষ্ট।এই পরিবর্তন শুধু অস্ত্র, সরঞ্জাম বা যুদ্ধকৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি কমান্ড কাঠামো, যুদ্ধনীতি, বাহিনী মোতায়েনের ধরন এবং এমনকি যুদ্ধের বিজয় ও পরাজয়ের সংজ্ঞা নিয়েও গভীর পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেয়।কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক পুনর্গঠনসম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায়। ৬৬ দিনের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রধান দুর্বলতা ছিল তাদের যোগাযোগব্যবস্থার ভঙ্গুরতা এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড ও মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করার জটিলতা। যুদ্ধের কিছু পর্যায়ে এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিঘ্ন, প্রতিক্রিয়ায় বিলম্ব এবং যুদ্ধক্ষমতার ক্ষয় দেখা দিয়েছিল।কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধে একই সময়ে একাধিক ফ্রন্টে অভিযান অব্যাহত রয়েছে, ইউনিটগুলোর কার্যকারিতা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়নি এবং যুদ্ধক্ষেত্র ও সদর দপ্তরের মধ্যে যোগাযোগও বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। তীব্র চাপ ও ভারী হামলার মধ্যেও তাদের সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি এবং কমান্ড চেইন তার সংহতি ধরে রাখতে পেরেছে।কেন্দ্রীয়কৃত কমান্ড, কিন্তু মাঠপর্যায়ে স্বাধীনতাএই পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে নতুন নেতৃত্বের অধিক কেন্দ্রীয়কৃত সামরিক কমান্ডনীতি। এতে বহুস্তরীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ কমানো হয়েছে, অপেক্ষাকৃত তরুণ ও উদ্যমী কমান্ডারদের ক্ষমতায়ন করা হয়েছে এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে।একই সময়ে, আপাতদৃষ্টে এর বিপরীতধর্মী হলেও হিজবুল্লাহ মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে এবং মধ্যম পর্যায়ের কমান্ডারদের আরও বেশি অপারেশনাল স্বাধীনতা দিয়েছে, যাতে তারা যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে অগ্রাধিকারপূর্ববর্তী যুদ্ধ থেকে হিজবুল্লাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো জনবল ও অস্ত্র ব্যবহারের পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন। প্রতিরোধ আন্দোলনটি সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা সমাবেশ, বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রজুড়ে উপস্থিতি বজায় রাখা এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যাপক অগ্নিশক্তি প্রয়োগের কৌশল শুধু অকার্যকরই নয়, বরং প্রাণহানির দিক থেকে অত্যন্ত ব্যয়বহুলও হতে পারে। ফলে এখন তারা সংখ্যার পরিবর্তে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে—অর্থাৎ সীমিত কিন্তু বিশেষায়িত বাহিনী, যাদের হাতে রয়েছে নির্ভুল ও কার্যকর অস্ত্র।এই যুক্তিতে প্রস্তুতি ও সক্ষমতা সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, সহনশীলতা ও অপারেশনাল কার্যকারিতা এখন নিছক সংখ্যাগত শক্তির চেয়ে বেশি মূল্য পাচ্ছে। এ কারণেই বর্তমান যুদ্ধে প্রধান দায়িত্ব বহন করছে ড্রোন ইউনিট, ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী, অ্যান্টি-আর্মার ইউনিট এবং দ্রুত বিকাশমান ফার্স্ট-পারসন-ভিউ (এফপিভি) ড্রোন ইউনিটগুলো।যুদ্ধনীতি বদলেছেহিজবুল্লাহর সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন সম্ভবত তাদের যুদ্ধনীতিতেই ঘটেছে। ২০২৪ সালের যুদ্ধে মূলনীতি ছিল যেকোনো মূল্যে ভূখণ্ড রক্ষা করা এবং শত্রুর অগ্রযাত্রা ঠেকানো, এমনকি এর জন্য ব্যাপক প্রাণহানিও মেনে নেওয়া। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন লক্ষণ থেকে বোঝা যায়, হিজবুল্লাহ ভিন্ন এক কৌশলের দিকে ঝুঁকেছে—যার লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য সব উপায়ে শত্রুর ওপর ধারাবাহিক ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়া।ক্রমাগত ক্ষয় সৃষ্টি এবং শত্রুপক্ষের হতাহতের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই কৌশল যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় ও পরাজয়ের ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এখন শত্রুকে কোনো এলাকায় স্থায়ীভাবে অবস্থান গড়ে তুলতে না দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।মনোবল পুনরুদ্ধারএই কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি চলমান যুদ্ধ মাঠপর্যায়ের যোদ্ধা এবং প্রতিরোধ আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তির মনোবলেও দৃশ্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ পুনরুদ্ধার ঘটিয়েছে। ৬৬ দিনের যুদ্ধ এবং বর্তমান সংঘাতের মধ্যবর্তী সময়ে হিজবুল্লাহর যোদ্ধা ও তাদের সমর্থকগোষ্ঠী নানা ধরনের মানসিক ও সুনামগত চাপের মুখে পড়ে।তবে এসব ঘটনাই এখন হিজবুল্লাহর সমর্থক ও কর্মীদের জন্য নতুন প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সংগঠনের পুনর্গঠনের দৃশ্যমান ফলাফল—বিশেষত হিজবুল্লাহ প্রকাশিত এফপিভি ড্রোনের ভিডিও চিত্র—সংগঠনের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছে এবং তাদের সামাজিক ভিত্তি ও সাংগঠনিক কাঠামোর মনোবল ও স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করেছে।সবচেয়ে বড় হুমকি যুদ্ধক্ষেত্র নয়, লেবাননের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতবে এসব সাফল্য সত্ত্বেও বর্তমানে হিজবুল্লাহর সামনে সবচেয়ে বড় হুমকি যুদ্ধক্ষেত্র নয়; বরং লেবাননের ভঙ্গুর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। শরণার্থী সংকট এবং এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব, পাশাপাশি বর্তমান লেবানন সরকারসহ কিছু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তির সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিজবুল্লাহর যুদ্ধক্ষেত্রের কার্যকারিতা এবং সফল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।অতএব যুদ্ধক্ষেত্রে হিজবুল্লাহর অভিযোজন ও পুনর্গঠনের লক্ষণগুলো স্পষ্ট হলেও এ পরিস্থিতি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের গতিশীলতার ওপর; এটা এমন একটি পরিবেশ, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধফ্রন্টের চেয়েও বেশি নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে।সূত্র: মিডলইস্ট আই
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা