প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানাকে খালাস, বাদীপক্ষের আপিলের ঘোষণাা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মিকে ঘিরে আলোচিত বিয়ে-সংক্রান্ত মামলায় উভয় আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বুধবার ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন।অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানাকে বেকসুর খালাস দেন। রায় ঘোষণার পর আদালতপাড়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একদিকে আসামিপক্ষ এ রায়কে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন হিসেবে অভিহিত করেছে, অন্যদিকে বাদীপক্ষ এ রায়ে অসন্তোষ জানিয়ে উচ্চ আদালতে আপিলের ঘোষণা দিয়েছে।সকাল থেকেই গণমাধ্যমের উপস্থিতিরায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা আদালতে উপস্থিত হলে সেখানে বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যমকর্মীর উপস্থিতি দেখা যায়। সকাল থেকেই বিভিন্ন টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা আদালত চত্বরে অবস্থান নেন।আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায়, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একটি মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। পরে দুই পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে পৌঁছান। বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটে নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানা এজলাসে প্রবেশ করেন। রায় ঘোষণা শেষে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে তারা আদালত ভবন থেকে বের হয়ে যান।এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং আদালতের প্রবেশপথ সচল রাখতে গণমাধ্যমকর্মীদের সরিয়ে দিতে পুলিশকে বেশ কঠোর অবস্থানে দেখা যায়।রায়ের পর নীরব নাসির-তামিমাআদালতে উপস্থিতি ও রায় ঘোষণার পরও নাসির-তামিমা দম্পতি গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগের সময়ও তারা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান।তবে আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত কয়েকজনকে তাদের উদ্দেশে দুয়োধ্বনি দিতে দেখা যায়।কী ছিল অভিযোগমামলাটি করেছিলেন তামিমা সুলতানার সাবেক স্বামী দাবি করা রাকিব হোসেন। তার অভিযোগ ছিল, তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক আইনগতভাবে শেষ হওয়ার আগেই তামিমা ক্রিকেটার নাসির হোসেনকে বিয়ে করেন।মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তামিমা সুলতানার সঙ্গে রাকিব হোসেনের বিয়ে হয় এবং তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাসির ও তামিমার বিয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলা দায়ের করেন রাকিব।তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ামামলার তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে নাসির হোসেন, তামিমা সুলতানা এবং তামিমার মা সুমি আক্তারকে অভিযুক্ত করা হয়। পরে ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আদালত নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। তবে তামিমার মাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর চলতি বছরের মার্চে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। পরে তামিমা নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন। গত ৬ মে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত ১০ জুন রায়ের দিন ধার্য করেন।আসামিপক্ষের আইনজীবী যা বললেনরায় ঘোষণার পর নাসির হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু গণমাধ্যমকে বলেন, বাদীপক্ষ আদালতে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় নাসির ও তামিমা বেকসুর খালাস পেয়েছেন। আদালত মনে করেছেন তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।তার দাবি, আদালতের এ রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে তামিমা সুলতানা যথাযথভাবে তালাক প্রদান করেছিলেন এবং পরে ইসলামি শরিয়ত ও প্রচলিত আইন অনুসারে নাসির হোসেনকে বৈধভাবে বিয়ে করেন।রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “জাতীয় ক্রিকেটার হিসেবে নাসির হোসেনকে বিভিন্ন গণমাধ্যম যেভাবে উপস্থাপন করেছে, আজকের রায়ের পর বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়ন করা উচিত।”বাদীপক্ষের আপত্তি ও আপিলের ঘোষণাঅন্যদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন করেননি। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ ছয় মাস তদন্ত শেষে পিবিআই অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল।তিনি আরও বলেন, “নাসির হোসেন নিজেই বাদীকে ফোন করে সবকিছু জেনেশুনে বিয়ে করার কথা বলেছেন এবং তামিমাও জেরার সময় কিছু বিষয় স্বীকার করেছেন। এসব সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হলেও রায়ে সেগুলোর পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।” লিখিত রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে বলে জানান তিনি।বাদীর হতাশা ও আপিলের প্রতিশ্রুতিরায়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী রাকিব হাসান। আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দাবি করেন, মামলায় পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথি আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল।রাকিব বলেন, “নাসির আমাকে ফোন দিয়ে বলেছিল, সবকিছু জেনে-শুনেই সে বিয়ে করছে। আমরা যথাযথ প্রমাণ আদালতে জমা দিয়েছি। এরপরও যদি বাংলাদেশে ন্যায়বিচার না পাওয়া যায়, তাহলে আর কোথায় পাওয়া যাবে?”তিনি আরও বলেন, “টাকা যার আছে, ক্ষমতা যার আছে, পাওয়ার যার আছে তারই বিচার আছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনো বিচার নেই।” পরে তিনি জানান, রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।রায়ের আগে মানববন্ধনরায় ঘোষণার আগে বুধবার সকালে আদালত প্রাঙ্গণে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে ‘এইড ফর মেন ফাউন্ডেশন’। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম নাবিল বলেন, ডিভোর্স জালিয়াতি, পরকীয়া ও ব্যভিচার রোধে নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন ছিল।তিনি অপরাধের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমান শাস্তির বিধান রেখে লিঙ্গনিরপেক্ষ আইন প্রণয়নের দাবি জানান।দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে দেওয়া এ রায়ের মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত মামলার বিচারিক অধ্যায়ের একটি ধাপ শেষ হলেও, বাদীপক্ষের আপিলের ঘোষণার কারণে বিষয়টি উচ্চ আদালতে নতুন মোড় নিতে পারে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা