প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
বাজেটের লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয়, সুশাসন সংস্কার ছাড়া সুফল মিলবে না: সিপিডিা
নিউজ ডেস্ক ||
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মন্থর প্রবৃদ্ধি ও বড় লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে বেজলাইন (ভিত্তি) ধরা হয়েছে, তা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।শুক্রবার রাজধানীর হোটেল লেকশোরে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন সিপিডির গবেষক ও সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রাসংবাদ সম্মেলনে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের যে ভিত্তি ধরে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহের প্রাক্কলন করেছে, তা অত্যন্ত দুর্বল। চলতি অর্থবছরের চতুর্থ কোয়ার্টারে অর্থনীতিতে হঠাৎ করে এক জাদুকরী ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে—এমন একটি অবাস্তব অনুমান করে এই বাজেট সাজানো হয়েছে।’তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, গত ১০ মাসে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক—মাইনাস ১ দশমিক ২৮ শতাংশ, অথচ বাজেটে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বর্তমানে সাড়ে ৯ শতাংশের ওপরে থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ শতাংশের নিচে। একইভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রকৃত প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বর্তমান কর প্রশাসনের সক্ষমতায় অসম্ভব।বড়দের কর ছাড়, ছোটদের ওপর চাপবাজেটে করজাল বাড়াতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বা এসএমই উদ্যোক্তাদের ওপর টিআইএন ও বিআইএন বাধ্যতামূলক করার সমালোচনা করেন সাংবাদিকেরা। জবাবে সিপিডির গবেষকেরা বলেন, বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীকে প্রণোদনা দেওয়া হলেও প্রান্তিক ও রিটেইল ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছে।যেখানে দেশের ৪৫ শতাংশ মানুষ এখনও ব্যাংকিং সেবার বাইরে, সেখানে এ ধরনের কড়াকড়ি প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে উচ্চ সুদের হারের এই সময়ে কর ফাঁকি রোধের নামে ছোট ব্যবসায়ীদের টার্গেট করায় তারা চাপের মুখে পড়বে।তবে বাজেটে এসএমই খাতের জন্য বন্ড সুবিধা ও ব্যাংক গ্যারান্টির মতো কিছু ইতিবাচক প্রস্তাব রয়েছে উল্লেখ করে সিপিডি জানায়, এগুলোর সুবিধা পেতে হলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে বিশেষ নজর দিতে হবে।চাকরি ছাঁটাইয়ের হিড়িক ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তাদেশে প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ নতুন তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও বিনিয়োগের স্থবিরতায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। উপরন্তু তৈরি পোশাক বা আরএমজি খাতসহ বিভিন্ন বড় শিল্পে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর আসছে। এ প্রসঙ্গে সিপিডির সিনিয়র সহযোগী গবেষক তামিম আহমেদ বলেন, ‘ডোমেস্টিক ইনভেস্টমেন্ট এবং এফডিআই গত দুই বছর ধরে কমতির দিকে।’সিপিডি প্রস্তাব করে, বৈশ্বিক মন্দা বা অভ্যন্তরীণ সংকটে কোনো কোম্পানি দেউলিয়া হলে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি সুরক্ষায় একটি ‘ওয়েজ সিকিউরিটি ইন্সুরেন্স’ চালু করা প্রয়োজন ছিল, যার প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি। এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বাজেটে তা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে ফেলার পুরনো প্রবণতা এবারও লক্ষ করা গেছে।রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের ফাঁদড. মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বাজেটের ব্যয় পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি রাজস্ব আদায় না হয়, তবে সরকারকে ব্যাংক ও বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে হবে। ইতিমধ্যেই সুদ পরিশোধের জন্য ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। নতুন করে অতিরিক্ত ঋণ নিলে সুদ পরিশোধের চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘সুবিধাবাদী কর কাঠামো ও রাজস্ব খাতের ব্যাপক সংস্কার না হলে এই বাজেট ঘাটতি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে।’প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সুশাসনসংবাদ সম্মেলনে সিপিডি স্পষ্ট ভাষায় জানায়, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ালেও তা খরচের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর নেই। উদাহরণস্বরূপ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটও পুরোপুরি খরচ করতে পারে না।ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কাঠামোগত দিক থেকে বাজেটের শুল্ক ও রাজস্ব নীতিমালা ভালো হলেও, সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। এডিপি বাস্তবায়নকে সাশ্রয়ী, সময়োপযোগী এবং সুশাসনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় এই বাজেট কেবলই একটি কাগুজে দলিলে পরিণত হবে।’সিপিডি সরকারকে কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছে:রাজস্ব আহরণে স্বল্প ও মাঝারি মেয়াদি বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণকর ফাঁকি রোধে বিআইএন ও টিআইএন বাধ্যতামূলক না এনে প্রণোদনাভিত্তিক কর জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করাশ্রমিক বকেয়া মজুরি সুরক্ষায় ‘ওয়েজ সিকিউরিটি ইন্সুরেন্স’ চালু করাস্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধিএডিপি বাস্তবায়নে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাসিপিডি মনে করে, সরকার যদি দ্রুত এসব সংস্কার না করে, তবে এই বিশাল অঙ্কের বাজেট প্রকৃত অর্থনৈতিক মুক্তি না এনে বরং দেশকে ঋণের ফাঁদে আরও জড়াবে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা