প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ১৪ দফায় যা যা থাকছো
বিশ্ব ডেস্ক ||
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তির ঘোষণা এসেছে। প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে ১৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। চুক্তিতে সম্ভাব্য শর্তগুলো প্রকাশ করেছে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ। তবে প্রকাশিত এসব তথ্য এখনো ওয়াশিংটন বা তেহরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর থাকা বাধা সরিয়ে নেওয়া হবে এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।১৪ দফা চুক্তির খসড়ায় যা থাকছেমেহের নিউজের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে নিচের ১৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে:১. লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি। এটি চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দফা বলে মনে করা হচ্ছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে সীমান্তে সংঘর্ষ চলছিল। এই দফার মাধ্যমে ইরান সমর্থিত সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের আশ্বাস দিচ্ছে।২. ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার মার্কিন প্রতিশ্রুতি। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাদের গার্ডিয়ান কাউন্সিল ও পরমাণু কর্মসূচিতে নাক গলাচ্ছে। এই দফা ইরানের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি বহন করছে।৩. ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে থাকা মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার। চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে অবরোধ উঠে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি ইরানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অবরোধের কারণে তাদের তেল রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।৪. ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার। সিরিয়া ও ইরাকের মার্কিন ঘাঁটি থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিও এতে থাকতে পারে। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই এই দাবি জানিয়ে আসছিল।৫. ইরানের ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। চুক্তি অনুযায়ী ইরান নিজ দায়িত্বে ও ব্যবস্থাপনায় এটি চালুর দায়িত্ব পাবে। প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়।৬. ইরানের তেল ও জ্বালানি পণ্যের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। এটি ইরানের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে স্বস্তির খবর। তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হলে তাদের বৈদেশিক মুদ্রা আবারও চাঙ্গা হবে।৭. নিষেধাজ্ঞার আওতায় জব্দ করা ইরানের তহবিল ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরু। দক্ষিণ কোরিয়া, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে ইরানের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে। এই দফা অনুযায়ী ধাপে ধাপে সেই অর্থ ছাড় করা হবে।৮. ইরানের পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পরিকল্পনা। এটি চুক্তির সবচেয়ে বড় ও চমকপ্রদ দফা। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠনে এই বিশাল অঙ্কের সহায়তার কথা বলা হয়েছে।৯. পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত। ইরান আবারও ঘোষণা দেবে যে তারা কখনো পারমাণবিক বোমা বানাবে না। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার তাদের থাকবে।১০. মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি না করার প্রতিশ্রুতি। দুই পক্ষই সম্মত হবে যে তারা অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন বা নতুন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে না।১১. ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার অঙ্গীকার। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইরান চায় একবার নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে ভবিষ্যতে আবার যেন নতুন করে কোনো নিষেধাজ্ঞা না আসে।১২. আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে পারস্পরিক সহযোগিতা। ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক ও লেবাননের স্থিতিশীলতা নিয়ে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।১৩. চূড়ান্ত চুক্তির আগে নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ প্রত্যাহারে অগ্রগতি নিশ্চিত করা। চূড়ান্ত স্বাক্ষরের আগেই কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অগ্রগতি দেখাতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।১৪. চূড়ান্ত সমঝোতাকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া। চুক্তিটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈধতা দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেওয়া হবে। এতে ভেটো ক্ষমতাধর দেশগুলো (রাশিয়া, চীন) সায় দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।বার্তা সংস্থা মেহেরের খবরে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় জব্দ করা ইরানের তহবিলের একটি বড় অংশ মুক্ত, ইরানের তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার পরেই চূড়ান্ত সমঝোতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে। অর্থাৎ আগে কিছু শর্ত বাস্তবায়িত হবে, তারপর পুরো চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরবর্তী সময়ে যে চূড়ান্ত চুক্তি হবে, সেটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে। এতে চুক্তির আন্তর্জাতিক বৈধতা নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতে নতুন মার্কিন প্রশাসন চাইলেও একতরফাভাবে এটি বাতিল করতে পারবে না।এদিকে, এই চুক্তির ঘোষণার পর থেকেই বিশ্ববাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮৩ ডলারের নিচে নেমেছে। এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে ৫ শতাংশের মতো উত্থান হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে তেলের ঘাটতি কমে যাবে এবং জ্বালানি স্বাভাবিক সরবরাহ শুরু হবে। তাতে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন করে শক্তি পাবে।আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে মেহর নিউজে প্রকাশিত শর্তগুলোই আপাতত সম্ভাব্য সমঝোতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর ও দুই পক্ষের চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই চুক্তির প্রকৃত কাঠামো ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি স্পষ্ট হবে।পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘চার মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে এই শান্তিচুক্তি পুরো অঞ্চলের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে।’ কাতার, তুরস্ক ও সৌদি আরবও চুক্তির প্রশংসা করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘এটি কূটনীতির বড় জয়।’যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি ইতিহাস গড়েছি। কেউ ভাবেনি যে আমি এটা পারব। কিন্তু আমি পেরেছি। এখন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরবে।’অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘এটি ইরানি জনগণের ধৈর্য ও প্রতিরোধের বড় অর্জন। যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে যে অবরোধ ও হুমকি দিয়ে ইরানকে নতজানু করা যায় না।’তবে এখনও অনেক জটিলতা বাকি। চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়নে কতটা সফল হবে দুই পক্ষ, তা দেখার বিষয়। বিশেষ করে, ইরানের তেল রপ্তানি ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নানা জটিলতা রয়েছে। তারপরও আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, বহু বছরের টানাপড়েনের অবসান ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ঐতিহাসিক চুক্তির দিকে এগোচ্ছে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা