প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬
যে বাঘ মানুষকে খুজে বের করে প্রতিশোধ নিয়েছিলোা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
১৯৯৭ সালের শীত। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের তুষারঢাকা অরণ্যে এক শিকারি এমন একটি কাজ করেছিলেন, যার পরিণতি আজও বন্যপ্রাণী গবেষকদের বিস্মিত করে। তার নাম ছিল ভ্লাদিমির মার্কভ। একদিন তিনি একটি আমুর (সাইবেরিয়ান) বাঘকে গুলি করে আহত করেন। শুধু তা-ই নয়, বাঘটির শিকার করা একটি বুনো শূকরও নিয়ে যান। কিন্তু গল্পটি সেখানেই শেষ হয়নি। আহত বাঘটি পালিয়ে যায়। এরপর যা ঘটেছিল, তা সাধারণ প্রাণীর আচরণ বলে মনে করেন না অনেক গবেষক। কয়েক দিন পর বাঘটি মার্কভের কেবিন খুঁজে বের করে। সেখানে গিয়ে তার গন্ধযুক্ত জিনিসপত্র ভেঙে ফেলে এবং কেবিনের আশপাশেই অপেক্ষা করতে থাকে। ধারণা করা হয়, বাঘটি ১২ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সেখানে ওত পেতে ছিল। অবশেষে মার্কভ ফিরে এলে, বাঘটি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে তাকে হত্যা করে, দেহ টেনে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে যায় এবং পরে আংশিকভাবে খায়।গবেষকদের মতে, এটি শুধু ক্ষুধার কারণে আক্রমণ ছিল না। আহত হওয়া এবং নিজের শিকার হারানোর পর বাঘটি যেন নির্দিষ্ট মানুষটিকেই খুঁজে বের করেছিল। অবশ্য বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেন, মানুষের মতো 'প্রতিশোধ' নেওয়ার মানসিকতা বাঘের আছে—এমনটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, আমুর বাঘ অত্যন্ত বুদ্ধিমান, অসাধারণ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন এবং নিজের এলাকা ও হুমকি সম্পর্কে দীর্ঘ সময় মনে রাখতে সক্ষম। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে বাঘ শুধু সহজাত প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত হয় না, তারা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে পারে। আমুর বাঘ বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঘ প্রজাতি। তাদের ওজন ৩০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে এবং তারা এক লাফে ১০ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। তাদের তীক্ষ্ম স্মৃতিশক্তি ও ঘ্রাণশক্তি তাদেরকে শিকার ও শত্রু শনাক্তে সহায়তা করে।গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, বাঘ সাধারণত মানুষকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু যদি কোনো বাঘ একবার মানুষের দ্বারা আঘাত পায় বা হুমকি অনুভব করে, তবে তারা সেই মানুষটিকে মনে রাখতে পারে এবং সুযোগ পেলে প্রতিশোধ নিতে পারে। রাশিয়ার এই ঘটনার পর থেকে আমুর বাঘের আচরণ নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদরা বলছেন, বাঘের এই বুদ্ধিমত্তা তাদের বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করলেও মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘাত বাড়াচ্ছে। বন উজাড় হওয়ায় বাঘের আবাসস্থল কমছে, ফলে তারা মানুষ ও গবাদি পশুর এলাকায় চলে আসছে। এতে সংঘাত বাড়ছে এবং উভয় পক্ষের জন্যই ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত যে বন্যপ্রাণীকে সম্মান করা এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষা করা কতটা জরুরি। প্রাণীদের প্রতি সহিংসতা বা অন্যায় আচরণ করলে তার পরিণতি মারাত্মক হতে পারে, যেমনটি ভ্লাদিমির মার্কভের ক্ষেত্রে হয়েছিল। এই ঘটনা আজও বন্যপ্রাণী গবেষকদের কাছে একটি ক্লাসিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা প্রমাণ করে যে প্রকৃতি ও তার বাসিন্দাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কতটা সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা